kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

গোলাপি চাদর সরিয়ে মাঠের ক্রিকেটেই নজর

সামীউর রহমান, কলকাতা থেকে

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গোলাপি চাদর সরিয়ে মাঠের ক্রিকেটেই নজর

ইডেন যেন বিয়েবাড়ি! গ্যালারি সাজানো হয়েছে গোলাপি বাতিতে। স্কোরবোর্ড থেকে শুরু করে বিশাল  বড় সব থাম, সব কিছুতেই গোলাপি রঙের প্রলেপ। মাঠের মাঝখানে ডিসপ্লে আর ব্যান্ড দলের অনুশীলনের জন্যই কি দ্রুত শেষ করে ফেলতে হলো বাংলাদেশের অনুশীলন? ইডেন টেস্টের মুখ্য চরিত্র গোলাপি বল, বিয়েবাড়ির কর্তার ভূমিকায় সৌরভ গাঙ্গুলি। বাংলাদেশ দল যেন পরিবারের চাপে বিয়ের পিঁড়িতে বসা সেই বধূ, যার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দাম নেই। মুখ্যমন্ত্রী আসবেন নাকি প্যারাট্রুপার নামবে, এই নিয়েই যত কৌতূহল। বাংলাদেশ কেমন খেলবে, তা নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমের খুব একটা আগ্রহই নেই!

অথচ ইডেনে, দ্বিতীয় টেস্টের আগে অধিনায়ক মমিনুল হকের সংবাদ সম্মেলনটা হতে পারত সবচেয়ে প্রাণবন্ত। বেশির ভাগ প্রশ্নই যে করা হবে বাংলায়। অথচ এখানে এসে মমিনুলকে উত্তর দিতে হয়েছে টেস্ট ক্রিকেট দুনিয়ার বৈষম্যসহ আরো নানা রকম নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের, যার উত্তর আসলে মমিনুলের কাছে নেই। সব কিছু দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, ইডেনে দুটি দলের খেলার আবহে আসলে চলছে সৌরভ গাঙ্গুলির ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান হওয়ার উদ্যাপন! কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, ১০ হাজার টিকিট নাকি সৌরভই নিজের কাছে রেখেছেন, কাছের মানুষদের জন্য। ওদিকে বাংলাদেশ অধিনায়ক, যাঁর ডাকনামটিও সৌরভ, তাঁর ভাগ্য পুরোই বিপরীত। কে আসছেন, কে যাচ্ছেন; এসবের তোড়ে যে তাঁর মনঃসংযোগটাই নড়ে যাচ্ছে!

তবু মমিনুল মনোযোগটা রাখতে চাইছেন মাঠেই, যতটা পারছেন! কাল বললেন, ‘আমার কাছে মনে হয় না এসব কোনো প্রভাব ফেলবে। কারণ পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে চিন্তা করলে এসব চিন্তা আসাই উচিত না। আপনার কাজ ঠিকমতো করবেন, আমি আমার কাজ ঠিকমতো করব। আমার কাছে মনে হয় পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে বিষয়গুলো (মাথায়) ঢোকার সুযোগ নেই।’ কিন্তু পেশাদার ক্রিকেটাররাও তো মানুষ! মমিনুলের মনের জোর আর জেদের পরিচয় জানা আছে। অসুস্থ মায়ের পাশে সারা রাত জেগে থাকার পরদিনও তাঁর ব্যাটে রানের দেখা মেলে। কিন্তু সবাই তো আর মমিনুলের মতো নন! তাই আয়োজকদের অতিথিপরায়ণতার এমন নজির দেখে কারো কারো খারাপ লাগতেই পারে। কারণ টেস্ট ম্যাচে যত যা-ই হোক; ‘উদ্দেশ্য’ তো ক্রিকেটাররাই, ‘বিধেয়’ নন।

ভারতীয় দল আগের দিন নির্বিঘ্নে অনুশীলন করে গেল ফ্লাডলাইটের আলোয়। দিনের আলো মরে আসা আর ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠে তাতে চোখ সইয়ে নেওয়া, দুপুর ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত যে সেশনটা খেলা হবে, যখন গোলাপি বলটা হয়ে উঠবে অদৃশ্য শত্রু, সেই সময়ে অনুশীলন যে মাত্র এক দিন করতে পারল বাংলাদেশ। তাও শেষটা হলো তাড়াহুড়ায়, কারণ পরদিন নানা আয়োজনের কুশীলবরা যে এসে পড়েছেন ড্রেস রিহার্সেলে।

প্রতিপক্ষের পেসার মোহাম্মদ সামি, উমেশ যাদব আর ইশান্ত শর্মাকে নিয়েই বেশি ভয় নাকি গোলাপি বল; এমন প্রশ্নে মমিনুলের উত্তর, ‘আমার মনে হয় পেস বোলারদের খেলাও চ্যালেঞ্জিং, গোলাপি বলে খেলাও চ্যালেঞ্জিং।’ তবে সেই চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি কি আছে মমিনুলদের? স্পষ্ট উত্তর, ‘না, আমরা ওরকম কোনো সুযোগ পাইনি। আমরা ওই সময়ে কিছু করতে পারিনি। অনুশীলন ম্যাচ হয়নি গোলাপি বল দিয়ে।’ একই চেয়ারে বসে বিরাট কোহলি মমিনুলের ঘণ্টাদুয়েক আগে বসে কী বলেছেন গোলাপি বলে টেস্ট খেলার প্রস্তুতি নিয়ে এবার সেটা শোনা যাক, ‘একটা টেস্ট সিরিজে কখন আমরা গোলাপি বলে টেস্টটা খেলছি তার ওপর নির্ভর করে, লাল বলের ম্যাচের আগে একটা প্রস্তুতি ম্যাচ আর গোলাপি বলের ম্যাচের আগে একটা গোলাপি বলে প্রস্তুতি ম্যাচ অবশ্যই খেলা উচিত। সিরিজের দ্বিতীয় বা তৃতীয় টেস্টটা যদি গোলাপি বলে হয়, তাহলে লাল বলের ম্যাচের পর গোলাপি বলের ম্যাচের আগে বড় বিরতি চাইব। অনুশীলন ম্যাচ খেলতে চাইব, অবশ্যই সেটা যেন ফ্লাডলাইটে হয়। এ রকম যদি হয়, সফর শুরুর আগে গোলাপি বলে প্রস্তুতি ম্যাচ খেললাম আর সিরিজের শেষ টেস্টটা গোলাপি বলে তাহলে কিছুই হবে না। তাই আমার মনে হয় যখনই হোক তার আগে একটা অনুশীলন ম্যাচ রাখা উচিত আর দুটো ম্যাচের মাঝে পর্যাপ্ত বিরতি রাখা উচিত।’

পাঠকের অবগতির জন্য জানানো যেতে পারে, দুটি টেস্টের মাঝে অফিশিয়াল (তিন দিনে খেলা শেষ যাওয়ার কথা নিশ্চয়ই মাথায় রাখা হয়নি!) বিরতি হচ্ছে তিন দিন, যার ভেতর একটা দিন হচ্ছে ইন্দোর থেকে কলকাতা যাত্রা! এবং কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ নেই। অস্ট্রেলিয়া সফরে গোলাপি বলে টেস্ট খেলতে ভারতকে প্রস্তাব দেওয়া হলে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এবং প্রস্তুতি নেওয়ার মতো সময়ের অভাব ছিল বলেই ভারত রাজি হয়নি, সেটাও কাল জানিয়েছেন কোহলি। এবারে ‘ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে’র মতো দিন-রাতের টেস্টে যে রাজি হয়ে গেলেন, সেটা কি প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ বলেই!

দুই অধিনায়কের কাছেই একজন প্রশ্ন রেখেছিলেন, টেস্ট ক্রিকেটের দুনিয়ায় কি বৈষম্য চলছে? ভালো দলগুলো আরো ভালো হচ্ছে আর নিচের দিকেরগুলো আরো দুর্বল, ঠিক যেমন উন্নত আর অনুন্নত দেশের অর্থনীতি? কোহলি অনেক বড় উত্তরের মাঝে বললেন, ‘বোর্ড আর খেলোয়াড়দের একই দিকে চলতে হবে। যেসব দেশেই বোর্ড আর খেলোয়াড়দের ছন্দটা এক হয়েছে, তারাই টেস্ট ক্রিকেটে শক্তিশালী দল হয়েছে। তাদের মন ও হৃদয় সব কিছুই টেস্ট ক্রিকেটকে সবার ওপরে রাখার জন্য ভাবছে।  কোন ক্রিকেটারকে বলা যায় বললাম, যে তুমি টেস্ট খেলো অথচ তার সঙ্গে চুক্তিটা করলাম না, এটা হতে পারে না।’ আফগানিস্তান ও ভারতের কাছে ইন্দোরে হারের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অনেক সমালোচনা করেছেন বোর্ড সভাপতি। কোহলির কথার সূত্র ধরেই তাঁর কাছে জানতে ইচ্ছা করে, টেস্ট ক্রিকেটকে সবার ওপরে রাখার স্বপ্নটাকে তিনিও দেখেন?

যতক্ষণ পর্যন্ত কর্তারা আর ক্রিকেটাররা মিলে টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করার স্বপ্নটা না দেখছেন, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে একসঙ্গে না হাঁটছেন, তত দিন এই গোলাপি চাদরের নিচেই লুকিয়ে থাকতে হবে। তিন দিনের টিকিট বিকিয়ে গেছে বলে অনেকেই বাহবা নিচ্ছেন, গোলাপি উত্তেজনায় চাপা পড়ে যাওয়া কথাটা হচ্ছে চতুর্থ আর পঞ্চম দিনের টিকিট কেনার ঝুঁকি কেউ নিচ্ছে না!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা