kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

বন্ড প্রতারণায় আমদানি করা কাপড় ও সুতা খোলাবাজারে বিক্রি

মামলার আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

প্রধান আসামি মাতিন গ্রেপ্তারের ১০ দিনের মাথায় জামিন

আশরাফ-উল-আলম   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মামলার আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা নিয়ে বন্ড লাইসেন্সের অপব্যবহার করে সুতা ও কাপড় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ পুরনো। এটি বন্ধে সম্প্রতি বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা হয়। মামলাও হয়। কিন্তু এসব মামলার আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। দু-একজন ধরা পড়লেও সহজে জামিন পেয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

সম্প্রতি পুরান ঢাকায় চারটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। বন্ড চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় চারটি মামলাও হয়। কিন্তু ওই সব মামলার বেশির ভাগ আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইসলামপুরের অন্যতম বন্ড চোরাকারবারি দেলোয়ার হোসেন মাতিনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ১০ দিনের মাথায় জামিন পেয়ে যান তিনি।

চারটি মামলায় দেখা গেছে, একটির এজাহারে কোনো আসামির নাম নেই। কিন্তু এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে। অন্য তিনটি মামলায় ২৭ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে মাত্র দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, যাঁরা পলাতক, তাঁদের অনেকে তদবিরের মাধ্যমে ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে ছোটাছুটি করছেন।

বন্ড চোরাকারবারের ব্যাপক অভিযোগের ভিত্তিতে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট পুরান ঢাকার বিভিন্ন কাপড়ের দোকানে গত ১২ সেপ্টেম্বর অভিযান চালানোর চিঠি সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠায়। পরে বন্ড উপকমিশনারদের নেতৃত্বে রাজস্ব বিভাগের একাধিক প্রিভেন্টিভ টিম কোতোয়ালি থানার পুলিশ নিয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর অভিযান শুরু করে।

ওই দিন ইসলামপুরের আল ইসলাম কমপ্লেক্সের চতুর্থ তলার সততা প্যাকিং সেন্টার, কালার টেক্স (নিউ ফাহিম ইন্টারন্যাশনাল) এবং ওয়াইজঘাট ইসলামপুরের শুভরাজ দোকানের গুদামঘরে অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে ১০ কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের শুল্কমুক্ত কাপড় উদ্ধার করা হয়। এসব কাপড় বন্ড লাইসেন্সের অপব্যবহার করে খোলাবাজারে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করা হয়। এ ঘটনায় কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুছ কলি বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় ওই দিনই মামলা করেন। মামলার এজাহারে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় এজাহারে তাঁদের নাম দেওয়া হয়নি। তবে ঘটনার পর মো. মোরসালিন ও সাজ্জাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মো. রনি নামে ইসলামপুরের এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রনি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। সহযোগীদের নামও বলেন।

গত ৫ অক্টোবর দুপুর ১২টা থেকে পরদিন ভোর ৪টা পর্যন্ত কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একাধিক টিম থানা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামপুরের হাজি আহমেদ কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলার একটি গুদামে এবং আইটিসি টাওয়ারের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার দুটি গুদামে অভিযান চালায়। এই অভিযানে ৯১ হাজার ৫০৯ দশমিক ৫২ কেজি বিভিন্ন ধরনের সুতা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা এই সুতার বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। সুতাগুলো জব্দ করা হয়েছে।

অভিযানের খবর পেয়ে গুদাম মালিক সটকে পড়েন। অভিযানকারী টিমের সদস্যরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গুদামগুলোর মালিক ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি আলহাজ দেলোয়ার হোসেন (মাতিন)। তাঁর সহযোগীরা হলেন—গুলশান-২-এর ব্যবসায়ী গোলাপ খান খোকন, ইসলামপুরের লায়ন টাওয়ারের ব্যবসায়ী আব্দুর রউফ খোকা, ইসলামপুর গুলশান আরা সিটির আওলাদ চেয়ারম্যান, ইসলামপুরের সিটি ব্যাংকের ওপরের বকুল, ইসলামপুর শুভরাজ টাওয়ারের রনি ও আয়নাল। এই অভিযানের পর বন্ড চোরাকারবারিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে গত ১৬ অক্টোবর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।

ওই দিনই দেলোয়ার হোসেন মাতিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু গ্রেপ্তারের মাত্র ১০ দিনের মাথায় জামিন পেয়ে যান তিনি।

গত ২৩ অক্টোবর ইসলামপুরের বিভিন্ন গুদামে অভিযান চালান বন্ড কমিশনারেটের রাজস্ব কর্মকর্তাদের একাধিক টিম। ওই দিনের অভিযানে বিভিন্ন ধরনের কাপড় এবং ৪৩ হাজার ২৫৩ কেজি সুতা উদ্ধার করা হয়। এগুলোর আনুমানিক মূল্য তিন কোটি টাকা। এ ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইসমে আজম কোতোয়ালি থানায় আরেকটি মামলা করেন। মামলায় ইসলামপুরের ফারজানা ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম, মোহাম্মদ আলী দেওয়ান, বায়েজিদ ফেব্রিক্সের মালিক আবদুল কুদ্দুস, অতিথি এন্টারপ্রাইজের মালিক শামীম, ফারুক এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. ফারুক, আশরাফ ট্রেডিংয়ের মালিক মো. আশরাফ, বিসমিল্লাহ ডেনিম কালেকশনের মালিক জহিরকে আসামি করা হয়। এই মামলায় মোহাম্মদ আলী দেওয়ানকে গ্রেপ্তারের দুই দিন পরই তিনি জামিন পেয়ে যান। অন্য আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।

গত ২৪ অক্টোবর দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ইসলামপুরের তৃপ্তি মেরিন মার্কেটে অভিযান চালানো হয়। ওই মার্কেটের চতুর্থ তলার একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে দুই হাজার ৭৯০ কেজি বিভিন্ন ধরনের সুতা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আল মনছুর বাদী হয়ে গত ৪ নভেম্বর কোতোয়ালি থানায় আরেকটি মামলা করেন। মামলায় ইসলামপুরের গুলশান আরা সিটির ব্যবসায়ী আওলাদ চেয়ারম্যান, বিক্রমপুর গার্ডেন সিটির বাবুল হোসেন ওরফে বাবু, বোরকা বাজারের আজিজ মোল্লা, যৌথ ফেব্রিক্সের মালিক নোমান, যৌথ ফেব্রিক্সের আরেক মালিক রেজাউল, দাদা ভাই এন্টারপ্রাইজের মালিক ইসমাইল হোসেন খান (দাদা ভাই), শুভরাজ টাওয়ার ও আল ইসলাম কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী মো. রনি ও আয়নাল, গুলশান আরা সিটির সাকিব এন্টারপ্রাইজের মালিক নুরুন্নবী মোল্লা, সায়েম সেন্টারের মালিক মোফাজ্জল হোসেন খান, জাহাঙ্গীর টাওয়ারের মমিন আলী এবং গুলশান আরা সিটি মার্কেটের ব্যবসায়ী জামালকে আসামি করা হয়।

আসামিদের সম্পর্কে ইসলামপুরের বিভিন্ন মার্কেটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাঝে মাঝে তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে।

সাধারণ কাপড় ও সুতা ব্যবসায়ীরা অভিযানের প্রশংসা করে বলেন, শুল্কমুক্ত সুতা ও কাপড় অবৈধভাবে বাজারজাত করায় তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় তাঁরা হতাশ।

কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আবদুল আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামি গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। বন্ড চোরাকারবারির কয়েকটি মামলা সিআইডি তদন্ত করছে। আসামিরা গাঢাকা দিয়েছে। এদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

মামলার এজাহারে যা আছে 

আটক সুতা ও কাপড়ের নমুনা, বর্ণনা, মার্কস, স্টিকার প্রভৃতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব পণ্য বন্ডেড ওয়ারহাউস সুবিধায় আমদানি করা। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা এসব সুতা ও কাপড় দিয়ে রপ্তানি পণ্য উৎপাদন না করে চোরাইপথে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। আসামিরা এসব পণ্যের আমদানিকারক। তাঁরা পারস্পরিক যোগসাজশে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা এসব পণ্য প্রতারণা, জালিয়াতি ও কালোবাজারির মাধ্যমে খোলাবাজারে বিক্রি করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, দেশীয় শিল্পের ক্ষতিসাধন এবং দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন।

বস্ত্র কল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাজারের জন্য উৎপাদিত সুতা-কাপড় অবিক্রীত অবস্থায় গুদামে পড়ে আছে। এর প্রতিকার চেয়ে এনবিআর এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে চিঠি দিয়েছে বিটিএমএ। এর পরই অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু অভিযান চালিয়ে কিছু পণ্য আটক করা হলেও আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় এবং গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জামিন পেয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা