kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

সাবেক এমপি আউয়ালের অঢেল অবৈধ সম্পদ

তৈমুর ফারুক তুষার   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাবেক এমপি আউয়ালের অঢেল অবৈধ সম্পদ

পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েও দুদক আউয়ালের নামে-বেনামে থাকা অন্তত অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের হদিস পেয়েছে। বেনামে থাকা চারটি কার্গোরও সন্ধান পেয়েছে দুদক। স্ত্রীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগেরও সত্যতা মিলেছে। আউয়ালের দুর্নীতির তদন্তের সঙ্গে যুক্ত দুদকের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ২৪ অক্টোবর পিরোজপুরের কর সার্কেল-৬-এর উপকমিশনারকে এক চিঠিতে আউয়ালের আয়কর নথির যাবতীয় তথ্য জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর অনুরোধ জানান দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) মো. আলী আকবর। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, আউয়ালের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং অবৈধভাবে সেতু, ফেরিঘাট ইজারা নেওয়াসহ টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে জানা আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আয়কর নথির তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আউয়ালের শুরু থেকে হালনাগাদ আয়কর রিটার্নের সত্যায়িত ফটোকপি ১১ নভেম্বরের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে দুদকে পাঠাতে অনুরোধ করা হয় চিঠিতে। এর আগেও পিরোজপুর সার্কেল-৬-এর উপকর কমিশনারকে একই ধরনের চিঠি দিয়েছিল দুদক। তবে গতকাল সোমবার পর্যন্ত উপকর কমিশনার কার্যালয় থেকে আউয়ালের হালনাগাদ আয়কর বিবরণীর কোনো তথ্য দুদককে দেওয়া হয়নি।

জানা যায়, গত ২৪ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সচিবকেও একটি চিঠি দেন দুদকের উপপরিচালক আলী আকবর। তিনি চিঠিতে আউয়ালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিবরণীর সত্যায়িত ফটোকপি ৪ নভেম্বরের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে দুদকে পাঠাতে অনুরোধ জানান।

দুদক সূত্রে জানা যায়, অনুসন্ধানে আউয়ালের বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্যের সত্যতা মিলছে। ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তিনি তাঁর হাতে নগদ অর্থ দেখিয়েছিলেন ছয় লাখ ১৮ হাজার ৬৭১ টাকা। তখন ব্যাংকে ছিল চার লাখ ৮১ হাজার ৩২ টাকা। তাঁর বার্ষিক আয় ছিল চার লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৩ টাকা। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৩ সালের আয়কর বিবরণীতে তাঁর নিট সম্পদ দেখানো হয় এক কোটি ৯০ লাখ ৬১ হাজার ১৩১ টাকা। ২০১৩ সালে তাঁর সম্পদের পরিবৃদ্ধি ঘটে ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ১৩১ টাকা।

সূত্র মতে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেওয়া হলফনামার সঙ্গে আউয়াল যে আয়কর বিবরণী দাখিল করেন, সেখানে পরিবারের ভরণ-পোষণ, ব্যক্তিগত খরচ, উৎসব ব্যয়, যানবাহন খরচসহ যাবতীয় ব্যক্তিগত খরচ দেখান দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসে ২১ হাজার টাকার কিছু বেশি ব্যয় দেখান। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই ব্যয় খুবই কম বলে মনে করেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এভাবে ব্যয় কম দেখিয়ে তিনি তাঁর অবৈধ অনেক অর্থ বৈধ করেছেন।

জানা যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য থাকাকালে আউয়াল অবৈধভাবে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা অর্জন করেন। ওই সময় তিনি চারটি কার্গোর মালিক হন। ওই কার্গোগুলোর তথ্যও দুদকের হাতে এসেছে।

আউয়াল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের ঠিকাদারি লাইসেন্স হস্তান্তর করেন স্ত্রী লায়লা পারভীনের নামে। আউয়ালের হস্তক্ষেপে লায়লার মালিকানাধীন মেসার্স বুশরা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সুভাষ এন্টারপ্রাইজের নামে বেকুটিয়া ফেরিঘাট ও বলেশ্বর সেতুর ইজারা মেলে। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে ইজারা গ্রহণে আউয়ালের অন্যায় প্রভাব খাটানোর তথ্যও পেয়েছে দুদক।

দুদকের একাধিক সূত্রে জানা যায়, আউয়ালের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের তদন্তে নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হচ্ছে দুদককে। বিশেষ করে, পিরোজপুর সার্কেল-৬ উপকর কমিশনারের কার্যালয়কে দুই দফা চিঠি দিয়েও আউয়ালের হালনাগাদ আয়কর বিবরণীর তথ্য পায়নি দুদক।

আউয়ালের দুর্নীতির তদন্ত বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক মো. আলী আকবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে বেশ কিছু দুর্নীতির অভিযোগ আমাদের হাতে এসেছে। সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের কাজ করছি আমরা। উনার অর্থ-সম্পদের তথ্য সংগ্রহে আমরা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়েছি। এখনো সব তথ্য হাতে আসেনি। তবে অনেক তথ্যই আমরা পেয়েছি।’

দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রসঙ্গে এ কে এম এ আউয়াল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কোনো অবৈধ অর্থ উপার্জন করিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে যে আয়কর বিবরণী জমা দিয়েছিলাম, সেখানে সব তথ্য দিতে পারিনি। কারণ তখন জরুরি অবস্থা চলছিল, কী কী সম্পদের বিবরণ জমা দেওয়া হয়েছে, তা ভালোমতো খেয়াল করতে পারিনি। তখন নির্বাচন করাটাই বেশি জরুরি ছিল। ২০০৮ সালে কী স্টেটমেন্ট জমা দিয়েছিলাম, সেটাই তো বেদবাক্য নয়।’

সংসদ সদস্য হওয়ার পর প্রভাব খাটিয়ে স্ত্রীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে বেকুটিয়া ফেরিঘাট ও বলেশ্বর সেতুর ইজারা নেওয়া প্রসঙ্গে আউয়াল বলেন, ‘এই ইজারা নেওয়া বেআইনি নয়। আমরা বহু বছর ধরেই ঠিকাদারি করে আসছি। তার ধারাবাহিকতায়ই সেতুটি ইজারা নিয়েছি।’

নামে-বেনামে চারটি কার্গোর মালিক হওয়া প্রসঙ্গে আউয়াল বলেন, ‘এ অভিযোগটির সত্যতা নেই।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা