kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

পেঁয়াজ নিয়ে নৈরাজ্য চলছেই

উৎপাদন বাজার ব্যবস্থাপনা কোথাও নজরদারি নেই

তৌফিক মারুফ   

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উৎপাদন বাজার ব্যবস্থাপনা কোথাও নজরদারি নেই

পেঁয়াজ নিয়ে হুলুস্থুল চলছে দেশজুড়ে। নজিরবিহীন দাম বৃদ্ধির কারণে সরকার, ভোক্তা, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। এর আড়ালে চাপা থেকে যাচ্ছে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন, আমদানি আর চাহিদার হিসাবের গোড়ায় বড় ধরনের গলদের বিষয়টি। পরিসংখ্যান-তথ্য নিয়েও গরমিল পাওয়া যায় সরকারি তরফ থেকেই। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিসংখ্যানে গড়বড় থাকলেও এত বড় সংকটময় পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়। কারণ সর্বশেষ কৃষিশুমারির তথ্য অনুসারে দেশে খানা রয়েছে তিন কোটি ৬০ লাখ। তাতে বড়জোর ২২-২৩ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ লাগার কথা। তাঁদের মতে, এক শ্রেণির আমদানিকারক সিন্ডিকেট পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ তৈরি করতেই কৃত্রিমভাবে এ সংকট তৈরি করেছে। কেউ কেউ সরকারের সামগ্রিক পূর্বপরিকল্পনার অভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মত দিয়েছেন।

তবে ত্যক্ত-বিরক্ত ভোক্তাদের অভিযোগ সরাসরি। তাঁদের অনেকে বলছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লোকজনের সঙ্গে আঁতাত করে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজে এই মুনাফাকাণ্ড ঘটাচ্ছেন। কারওয়ান বাজারের এক পেঁয়াজ ব্যবসায়ী গতকাল শনিবার বলেছেন, আমদানিকারকরাই পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছেন। সরকারের পেঁয়াজের অভিযানে তাঁরা খেপে গিয়ে বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছেন।

সরকারের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার তাঁর বিশ্লেষণ তুলে ধরেন কালের কণ্ঠ’র কাছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের হিসাবে জনপ্রতি সাধারণত গড়ে দৈনিক ৩৮ মিলিগ্রামের মতো পেঁয়াজ লাগে। সেই হিসাবে ১৭ কোটি মানুষ ধরে বছরে লাগে প্রায় ২৪ লাখ টেন পেঁয়াজ। এ ছাড়া বিভিন্ন ঔষধি কার্যক্রমে আরো অল্প কিছু পরিমাণ পেঁয়াজ লাগে। সে হিসাবে আমাদের দেশে যে উৎপাদন এখন হয় তাতে অতিরিক্ত আমদানির দরকার হওয়ার কথা নয়, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে সংরক্ষণ পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা ভালো নয়। ফলে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হিসাবে ধরতে হয়। সেদিক থেকে হিসাব করলে প্রতিবছরই পাঁচ থেকে সাত লাখ মেট্রিক টন ঘাটতি থেকে যায়, যা সাধারণত প্রতিবেশী ভারত থেকে মেটানো হয়। গত বছরও যেমন ভারত ও মিয়ানমার থেকে প্রায় ১১ লাখ টন পেঁয়াজ দেশে এসেছে, কিন্তু এবার পেঁয়াজ আসা অনেক কম হয়ে গেছে বলেই এমন সংকট তৈরি হয়েছে।’ ওই মসলা গবেষণা কার্যক্রমের আরেক গবেষক নাম না প্রকাশের ইচ্ছা জানিয়ে দাবি করেন, জনপ্রতি দিনে ৩৮ মিলিগ্রাম পেঁয়াজ খাওয়া হলেও বছরে বড়জোর ২০ থেকে ২২ টন পেঁয়াজ লাগতে পারে, কারণ পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ১৭ কোটি মানুষ হিসাব করা যাবে না, খানা হিসাব করতে হবে।

তবে পেঁয়াজ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে একেবারেই অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, পেঁয়াজ এমন একটি খাদ্য যা না খেলে মানুষের শরীরে কোনো ঘাটতি হয় না, তাই খাওয়া কমিয়ে দিলেই সহজে বিষয়টি মিটে যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে পেঁয়াজকে মসলার কাতারে ফেলা হয়েছে। অন্যান্য দেশে এটা সবজির মধ্যেই পড়ে। আমরা কে কিভাবে পেঁয়াজ খাচ্ছি সেটার ওপরই নির্ভর করছে কোন পরিবারে কী পরিমাণ পেঁয়াজ লাগবে না লাগবে। ফলে সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব বের করা মুশকিল। কারণ পেঁয়াজে কোনো পুষ্টিগুণ কিংবা এ জাতীয় কোনো উপাদান নেই। কেবল কিছু পানি-মিনারেল আছে, যেটা না হলেও তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। তাই এটা কম খেলে অসুবিধা কী! বড়জোর স্বাদের কিছু হেরফের হতে পারে পূর্ব অভ্যস্ততার কারণে।’

এদিকে কৃষি বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ দাবি করছেন, সরকারের তরফ থেকে পেঁয়াজ নিয়ে কখনো খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পেঁয়াজ চাষাবাদের জমি আগের তুলনায় বাড়ার ফলে গড় হিসাবে উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু হেক্টরপ্রতি উৎপাদন আগের চেয়ে কমেছে। ফলে কৃষকরা নিরুৎসাহ হচ্ছেন পেঁয়াজ চাষাবাদে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮-১৯ অনুসারে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৩ লাখ ৭৬ হাজার টন, সেখানে উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। আবার একই মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গত ২০ অক্টোবরের আরেক তথ্যে অনুসারে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ বছরে দেশে মোট এক লাখ ছয় হাজার হেক্টর জমিতে ২০ লাখ ১৮ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু কৃষকরা পেঁয়াজ উৎপাদন করেন আরো বেশি, ২ দশমিক ২ লাখ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ ৮১ হাজার টন। তবে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন কম হয়েছে। প্রতি হেক্টরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ টনের, কিন্তু উৎপাদন হয়েছে ১১ দশমিক ২৮ টন করে।

একই অধিদপ্তরের আরেকটি বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৮-১৯ বছরে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ লাখ ৭৬ হাজার টন আর উৎপাদন হয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যেই এমন গড়বড় দেখা যায় তাদের নথিপত্র থেকে। তবে ওই এক বছরই নয়, আগের আরো কয়েক বছরের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও এক লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে ১৪ লাখ ৮৮ হাজার টন পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে ১৭ লাখ টন পেঁয়াজ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে দেশে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একই বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে ওই পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ২৫ লাখ ৪২ হাজার টন।

জানতে চাইলে দেশে কৃষি ফসলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কমিটির সদস্যসচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক (ক্রপস উইং) মো. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে কোনো হিসাব নেই যে কী পরিমাণ পেঁয়াজ প্রয়োজন। তবে সাধারণ পর্যবেক্ষণে আমাদের কাছে পেঁয়াজ আমদানির আদৌ প্রয়োজন আছে কি না সেটা নিয়ে সব সময়ই প্রশ্ন জাগে। আমরা চাইলেই পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে পারি, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এর সংরক্ষণে এখনো উপযুক্ত মাত্রার ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। আবার যখনই বেশি উৎপাদন হয় তখন দাম কমে যায়, কৃষকরা উৎপাদন খরচ পায় না। ওই পরিস্থিতি আবার ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করে।’ এদিকে একরপ্রতি পেঁয়াজ উৎপাদন কম হওয়ার ব্যাপারে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা উইংয়ের পরিচালক ড. মো. আব্দুল ওহাব কালের কণ্ঠকে বলেন, পেঁয়াজ কিছুটা স্পর্শকাতর মসলা জাতীয় শস্য। পানিতে টিকতে পারে না, পচে যায়। ফলে অনেক সময় পেঁয়াজ ক্ষেত থেকে ওঠানোর আগে যদি অকাল বর্ষা হয় তবে উৎপাদন কম হয়।

ওই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘এখন আমরা বারি পেঁয়াজ-৫ নামে গ্রীষ্মকালীন বিশেষ একটি জাতের পেঁয়াজ পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেছি। এখনো সরকারি অনুমোদন পাইনি। এটা সাফল্য পেলে সারা বছরই আমরা পেঁয়াজের উৎপাদন করতে পারব।’

পেঁয়াজ গবেষক শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার বলেন, ‘আমাদের দেশে কৃষক পেঁয়াজ ৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু খরচ গেছে প্রায় ৭০০ টাকা। কৃষকরা এ জন্য ভয় পায়, আবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তো আছেই। তা সত্ত্বেও আমাদের উচিত পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানো এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা করা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা