kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

আবরার হত্যাকাণ্ড

অভিযুক্ত ২৫ জন

জড়িতরা রাজনৈতিক শেল্টারে অছাত্রের মতো আচরণ করত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অভিযুক্ত ২৫ জন

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বী হত্যা মামলায় ২৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। গতকাল বুধবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। ২৫ জনের মধ্যে চারজন পলাতক। বাকিরা কারাগারে আছেন।

আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বাকি ১৩ জনের ১৬১ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। মামলার আলামত হিসেবে আবরার ফাহাদের রক্তমাখা জামাকাপড়, আসামিদের মেসেঞ্জারে কথোপকথন ও বুয়েটের শেরেবাংলা হলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ দেখানো হয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপের তথ্য ও তথ্য-প্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণসহ আট আসামির বক্তব্য তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে। ৩০২, ১০৯ ও ১২০ ধারায় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আদালত পুলিশের নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) মাজহারুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে গতকাল দুপুরে মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, চার্জশিটভুক্ত ২৫ জনের মধ্যে হত্যায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ১১ জন। তাঁরাই আবরারকে কয়েক দফায় মারপিট করেন। বাকি ১৪ জন বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। মামলার তদন্তে এখন পর্যন্ত ৩১ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বাদীপক্ষের ছয়জন ছাড়াও বুয়েটের সাতজন শিক্ষক, ১৩ জন শিক্ষার্থী ও পাঁচজন কর্মচারী রয়েছেন। তিনি বলেন, অভিযোগপত্রের আসামিদের মধ্যে ১৯ জনের নাম এজাহারেই উল্লেখ ছিল। পুলিশ তদন্তে নেমে আরো ছয়জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে।

হত্যার কারণ সম্পর্কে যা বলেন মনিরুল ইসলাম : কোনো একক কারণে আবরারকে হত্যা করা হয়নি। তিনি (আবরার) শিবির করেন কি না, হত্যার পেছনে এটি একটিমাত্র (অন্যতম) কারণ। কিন্তু যাঁরা তাঁকে হত্যা করেছেন, তাঁরা এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। সালাম না দেওয়া—সব মিলিয়ে আগে থেকেই একটা ক্ষোভ ছিল। বাকিরাও যাতে তাঁদের যথাযথভাবে সালাম দেয়, তাঁদের ভয় করে চলে—এ রকম একটা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতেই দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় উচ্ছৃঙ্খল ছেলেগুলো এই কাজ করেছেন। এখানে সিনিয়র-জুনিয়র ইস্যুও ছিল। কথিত সিনিয়রা তাঁদের জুনিয়রদের এক ধরনের আতঙ্কে রাখার জন্য, তাঁদের কাজে লাগানোর জন্য এটা করেছেন। এ রকম বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে।

তদন্তে একজন সাক্ষী বলেছেন—তিনি একজনকে সালাম দেননি বলে তাঁকে পেটানো হয়েছে। তাই উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের অভ্যস্ততার অংশ হিসেবেই আবরার হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে মনিটরিং করলে এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত। রাত ১০টার পর থেকে আবরারের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ২টা ৫০-এর দিকে ডাক্তার তাঁকে দেখে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ছাত্রলীগকর্মীদের হাতে অনেকেই নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন জানিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, কেউ মামলা করতে চাইলে করতে পারেন। তা তদন্ত করে দেখা হবে।

শেরেবাংলা হলের যে ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে নির্যাতন করা হয়, সেই কক্ষের আবাসিক ছাত্র, বুয়েট ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহাকেও অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে, যদিও এজাহারে তাঁর নাম ছিল না। প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘অমিত সাহা এর আগেও একজনকে পিটিয়েছেন। আবরারকে মারধরের সময় তিনি উপস্থিত না থাকলেও তাঁকে ডেকে আনাসহ তাঁর বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এ কারণে তাঁকে আসামির তালিকায় প্রথম দিকে রাখা হয়েছে।

আসামিদের অনেকে আদালতে জবানবন্দি না দিলেও পুলিশের কাছে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানান মনিরুল ইসলাম।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র : এজাহারভুক্ত ১৯ জনসহ এজাহারের বাইরে আরো ছয়জন আবরার হত্যায় আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত ১৯ জন হলেন—বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল, সদস্য মুনতাসির আল জেমি, সদস্য মুজাহিদুর রহমান, সদস্য হোসেন মোহাম্মদ তোহা, সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম, শামীম বিল্লাহ, মাজেদুল ইসলাম, আকাশ হোসেন, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, মাহমুদুল জিসান, মোয়াজ আবু হোরায়রা, এ এস এম নাজমুস সাদাত ও মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম।

এজাহারের বাইরে অভিযুক্ত ছয় আসামি হলেন—বুয়েট ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না, আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা, মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত, উপদপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ ও মাহামুদ সেতু।

পলাতক চারজন : চার্জশিট দেওয়া হলেও এখনো চারজন গ্রেপ্তার হননি। তাঁরা হলেন—এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মাহমুদুল জিসান, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম ও মুজতবা রাফিদ। মুজতবা রাফিদ সবার শেষে অতিসম্প্রতি চার্জশিটভুক্ত হন বলে জানা গেছে। তাঁদের বেশির ভাগ বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

মারপিটে সরাসরি জড়িত ১১ জন : মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং খন্দকার তাবাখ্খারুল ইসলাম তানভীর।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন : ইফতি মোশাররফ হোসেন সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, অনিক সরকার, মোজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, মনিরুজ্জামান মনির, এ এস এম নাজমুস শাদাত ও খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর।

উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা