kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

বিশেষ সাক্ষাৎকার

‘মোশতাকের ফোন এলো বিকেলে’

জেলহত্যা দিবস আজ

৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



‘মোশতাকের ফোন এলো বিকেলে’

সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি এমপি মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের মেয়ে ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ছোট বোন। ঢাকার গুলশানের বাসায় কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে বিশেষ আলাপচারিতায় জানিয়েছেন জেল হত্যাকাণ্ড ও তাঁর বাবার রাজনীতি নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পার্থ সারথি দাস

নিজের ভেতরে রাজনৈতিক চেতনা জেগে উঠেছিল কখন থেকে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনীতির সঙ্গে কবে জড়িয়ে পড়েছিলাম তা বলা যাবে না একেবারে দিন তারিখ উল্লেখ করে। তবে রাজনীতিতে হাতেখড়ির ঘটনাটি বেশ মজার। ১৯৭০ সালের শেষ দিকের ঘটনা। আব্বা একদিন বললেন, ‘চলো, আমার নেতার কাছে নিয়ে যাব।’ মা টিফিন ক্যারিয়ার সঙ্গে নিলেন। তাতে ভাতও ছিল। আমরা গেলাম মধুপুর গড়ের একটি বাংলোয়। নেতার সঙ্গে মিটিং হলো। সেখানে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, ছেলে শেখ রাসেলও ছিল। গোপন স্থানে মিটিং হলো। আমাকে নিয়ে তিনটি কাঠি দিয়ে রাসেল বাংলাদেশের পতাকা বানিয়েছিল। মধুপুরের জঙ্গলে আমরা মিছিল করলাম। বললাম, জয় বাংলা। ওই দিন থেকে আমি মনে করি, চেতনাটি জেগেছিল। তখন আমার বয়স ৭। ছোট বোন রূপাও সঙ্গে ছিল ওই দিন।  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছে থেকে দেখার যে সুযোগ হয়েছিল তা স্মৃতি থেকে তুলে ধরে জাকিয়া নূর লিপি বলেন, বঙ্গবন্ধু ফর্মালিটিজ পছন্দ করতেন না। প্রটোকল পছন্দ করতেন না। ভাবতেন না তিনি প্রেসিডেন্ট। বঙ্গবন্ধু আমাদের বাসায় এলে দৌড়াদৌড়ি লেগে যেত। সেটা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের স্মৃতি। আমার আম্মা মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর হজ করেন। বঙ্গবন্ধু বাসায় এসে দরাজ গলায় তাঁকে লক্ষ্য করে বলতেন, ‘হাজি সাব কোথায়?’ আমি তখন বঙ্গবন্ধুর আশপাশে দৌড়াদৌড়ি করতাম। তাঁর কোলে উঠতাম। তিনি কয়েকবারই এভাবে বাসায় এসেছেন। আর তাঁর বাসায় তো ২৪ ঘণ্টা যাতায়াত ছিল আমাদের। আমি দৌড়ে চাচির (বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী) রুমে চলে যেতাম। বঙ্গবন্ধুকে ডাকতাম ‘চাচা’।

আপনার বাবা একাত্তর সালে কখন ভারতে গেলেন? জাকিয়া নূর লিপি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর আব্বা ভারতে চলে যান। সেখান থেকে পরে মুজিবনগরে আসেন। বড় ভাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমরা পরিবারের অন্য সদস্যরা মে মাস পর্যন্ত ভারতে যেতে পারিনি। যুদ্ধ শুরুর পর এখান থেকে ওখানে করে ৫০ জায়গায় থাকতে হয়েছে। আম্মা ও আমাদের ধরার জন্য পাকিস্তানের আর্মিরা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

তিনি বলেন, হাওরে-বাঁওড়ে নৌকায় ঘুরতে হয়েছে। কখনো হাঁটতে হয়েছে মাইলের পর মাইল। দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের বাড়িতে কিছুদিন করে থাকতে হয়েছে। মে মাসে হিন্দুদের একটি দলের সঙ্গে বোয়ালিয়া খাল ধরে চলছি ভারতে যাওয়ার জন্য। মামারা এই গ্রুপের সঙ্গে আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা আগরতলা গেলাম দুই সপ্তাহের বেশি সময়ে। যেতে যেতে মৃত্যু দেখেছি, যুদ্ধ দেখেছি। আমরা কিশোরগঞ্জ থেকে আগরতলা গেলাম। যাওয়ার পথে আমাদের খাবার ছিল শুধু চিঁড়া-পানি। পানি বলতে নদীর পানি। নদী থেকে পানি তুলতে যাবে, এমন সময় দেখা গেছে কোনো লাশ ভাসছে। তখন পানি বাদ দিয়ে শুধু শুকনো চিঁড়া খেতে হয়েছে।

পরিচয় নেই তবু কৃষকরা ডাল-ভাত আলু সিদ্ধ করে খেতে দিয়েছে। তারা ছিল বড় উদার। আগরতলায় বড় ভাই আশরাফ ট্রেনিং নিয়ে তখন ফ্রন্টলাইনের মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাদের রিসিভ করলেন। একটি সরকারি বাংলোয় নিয়ে গেলেন। সাবান দিয়ে বহুদিন পর গোসল করলাম। আগরতলায় দু-এক দিন ছিলাম।

আপনার বাবার সঙ্গে দেখা হলো কবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কলকাতায় পার্ক সার্কাসে একটি বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয় বাংলাদেশ সরকারের জন্য। তখন আব্বার সঙ্গে দেখা হলো প্রায় পাঁচ মাস পর। আমরা ওই বাসার সপ্তম তলায় থাকতাম। বিপরীত দিকের ফ্ল্যাটে চাচা তাজউদ্দীন আহমদের পরিবার থাকত। পরের ফ্ল্যাটে খন্দকার মোশতাকের বাসা। পঞ্চম তলায় থাকত এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর পরিবার। পাঁচটি পরিবার একটি ভবনে থাকত।

মোশতাকের ছেলেরা লন্ডন গেল : তখন তো মোশতাকের ছেলেরাও ওখানে ছিল, প্রসঙ্গ টানতেই তিনি যোগ করে বলেন, হঠাৎ একদিন শুনি খন্দকার মোশতাকের ছেলে ইনু ও টিপু লন্ডন চলে যাবে। অথচ তারা তখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ট্রেনিং নিতে পারত। আমার ভাই সৈয়দ আশরাফের চেয়ে বয়সে বড় ছিল তারা। ইনু ও টিপু লন্ডন যেদিন যাবে সেদিন আমরা এয়ারপোর্ট গেলাম। তখন তো মুক্তিযুদ্ধ কবে শেষ হবে তা নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশের ভাগ্য নিয়ে টানাটানি চলছে, ওই অবস্থায় তারা চলে গিয়েছিল।

বড় ভাই রাতে লুকিয়ে বাসায় আসতেন : তখন বড় ভাই রাতে লুকিয়ে বাসায় মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন উল্লেখ করে জাকিয়া নূর লিপি বলেন, অনেক রাতে বড় ভাই আশরাফ বাসায় আসতেন। সকালে ঘুম ভাঙত মায়ের কান্নার শব্দে। বাবা বোঝাতেন, হাজার হাজার ছেলে যুদ্ধে গেছে। ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, বড় ভাই রেডি হয়ে চলে গেছে। মা আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতেন।

দেখা হলো ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে : কলকাতা থেকে ফিরলেন কবে প্রশ্নের জবাবে লিপি বলেন, ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বরের পর। আম্মার মানত ছিল, দেশ স্বাধীন হলে আজমীর শরিফ জিয়ারত করবেন। আমরা আজমীর শরিফ গেলাম। দিল্লিও গেলাম। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসায় দাওয়াত ছিল। সেখানে প্রিয়াঙ্কা ও রাহুল গান্ধীকে দেখলাম। আব্বা তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন না। তার আগেই বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন।

আপনার বাবা রাজনীতিতে কতটা ব্যস্ত ছিলেন, জানতে চাইলে লিপি বলেন, আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই দেখতাম বাবা ব্যস্ত থাকতেন রাজনীতিতে। তখন ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১। আমরা আব্বাকে কম সময় পেতাম। আগরতলা যড়যন্ত্র মামলায় বাইরে থেকে আব্বাকে মুভ করতে হয়েছে। আনন্দ মোহন কলেজের সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ওকালতিতে গিয়েছিলেন। আব্বা খুব কম কথা বলতেন, শুনতেন বেশি। আব্বা প্রচুর বই পড়তেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কোন কোন স্মৃতি মনে পড়ে, জানতে চাইলে লিপি বলেন, ভোর থেকে গোলাগুলির শব্দ হচ্ছিল বলে শুনছিলাম। বাসায় বলাবলি হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যাবেন। এ জন্য আতশবাজি হচ্ছে। তার পরও কানে আসে, অ্যাটাক করা হয়েছে।

বিকেলে বাসায় মোশতাকের ফোন এলো : আমরা তখন বেইলি রোডের বাসায়। একসময় বুঝতে পারি, ঘটনা অন্য রকম। তারপর আমাদের বাসায় আর্মিরা আসবে, তা অনেকেই বলছিল। বাবা বলছিলেন, আমি সরব না। তাঁর তখন উদ্ভ্রান্তের মতো অবস্থা। আম্মাকে বললেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে চলে যাও।’ কিন্তু আম্মাও থেকে গেলেন। ১০০ ভাগ কনফার্ম ছিলাম, আমাদের ওপর অ্যাটাক হবে। দুই ভাই লন্ডনে। বিকেল থেকেই ফোন আসতে লাগল। আব্বা তখন উপ-রাষ্ট্রপতি। মোশতাকের ফোন এলো বিকেলে। তিনি ফোন করলেন ১৫ই আগস্ট বিকেলে। বাবা রেগেমেগে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। মোশতাক আব্বাকে বলছিলেন, ‘আপনার কিছু হবে না। আপনি সরকারে আসেন।’ আব্বা মোশতাকের কথা শুনে ঢিল দিয়ে ফোন ফেলে দিলেন। আমরা ভয়ে কাঁপছি। আবার ৩০ মিনিট পর ফোন এলো। তখন মা ফোন ধরলেন। মোশতাক মাকে ‘বোন’ ডাকতেন। আব্বাকে বোঝানোর দায়িত্ব মাকে দিলেন মোশতাক। কিন্তু আব্বা বললেন, ‘যেখানে বঙ্গবন্ধু নেই, সেখানে নজরুল থাকবে কেন?’ সেদিন পর পর চার-পাঁচবার ফোন করেছিলেন মোশতাক। মোশতাক শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘চেষ্টা করলাম, আর বাঁচাতে পারলাম না।’ আমরা গৃহবন্দি। সকালে ফাঁকা থাকলেও বিকেলে বাসা ঘিরে রাখল আর্মিরা।

জেলে আব্বা শুধু কাগজ-কলম চাইতেন : আমাদের তিন ভাই-বোনকে মালিদের কোয়ার্টারে পাঠানো হলো। আব্বা বলছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে যারা রাখেনি তারা আমাকে কেন রাখবে?’ ঢাকায় আত্মীয়দের বাসায় তখন আমাদের থাকতে হয়েছে। এক মামার বাসা আরমানিটোলায়, সেখানে উঠলাম আমরা। তখন আব্বা কেন্দ্রীয় কারাগারে। প্রতি সপ্তাহে বাবার সঙ্গে দেখা হতো। আব্বা বলতেন, ‘অনেক কাগজ-কলম দিয়ে যাও।’ পরের সপ্তাহে আবার বলতেন, শেষ হয়ে গেছে। আমার ধারণা, বাবা অনেক কিছু লিখে গেছেন। তবে ওই লেখাগুলো পাইনি। আশা করি, কোনো একদিন তা পাব। আব্বা বলতেন, ‘ভয় পেয়ো না। দেশ স্বাধীন, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

জেল হত্যাকাণ্ডের পর কখন জানতে পারলেন আপনার বাবা আর নেই, জানতে চাইলে লিপি বলেন, জেল হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর আমরা নিশ্চিত হই। আমাদের ভাড়া বাসা তখন ইত্তেফাক অফিসের কাছে। রাতে গোলাগুলি হয়েছে। পাবদা মাছ ছিল আব্বার প্রিয় মাছ। পরদিন দুপুরে মা টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত, পাবদা মাছ ও ডাল পাঠালেন বাবার খাবার হিসেবে।  কিন্তু তা ফেরত এলো জেল গেট থেকে। খাবার নিয়ে মামাতো ভাই ফিরে আসে। আম্মা তখন ভয়ে অস্থির। ৫ তারিখও টিফিন ক্যারিয়ার ফেরত আসে। চাচা তাজউদ্দীন আহমদের বাসা ধানমণ্ডিতে। সেখানে আমরা যাই। চাচি বললেন, সব ঠিক আছে। তারপর ইত্তেফাক মোড়ের বাসা এবং পরে আরমানিটোলায় মামার বাসায় যাই। সেখানে গিয়ে শুনি, লাশ শনাক্ত করে লাশ বুঝে নেওয়ার জন্য কথা বলছিল কেউ। তখন ধাক্কা খেলাম, মানুষ লাশ হয়? আব্বার সঙ্গে ২ নভেম্বর সর্বশেষ দেখা হয়েছিল। তিনি চিন্তিত ছিলেন। মা, ছোট এক ভাই ও এক বোনও গিয়েছিল।

লিপি বলেন, আমরা, আমাদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ। জেল হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। তবে অপরাধী সবার শাস্তি হয়নি। অনেকে নেপথ্যে ছিল, তাদের মুখোশ উন্মোচন হয়নি। পলাতক আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। শেখ হাসিনার কারণেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা