kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন

বাদ পড়ছেন সভাপতি সাধারণ সম্পাদক

পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির তরুণ নেতাদের কপাল খুলছে

তৈমুর ফারুক তুষার   

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাদ পড়ছেন সভাপতি সাধারণ সম্পাদক

ছাত্রলীগ, যুবলীগের পর এবার স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বাদ পড়ছেন। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের আগামী কমিটিতে ঠাঁই হচ্ছে না বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের। সংগঠনটির তৃতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি আছে—এমন সৎ ও দলের দুঃসময়ে মাঠে থাকা নেতাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হবে। নেতাদের নানা অপকর্মে ভাবমূর্তির সংকটে পড়া সংগঠনকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে সত্যিকার অর্থেই ‘স্বেচ্ছাসেবক’ লীগ গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতা কালের কণ্ঠকে এমনটাই জানিয়েছেন।

সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার ও সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথকে আর নেতৃত্বে রাখতে আগ্রহী নন। ফলে এ দুই পদেই নতুন নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে। নানা অপকর্মে জড়িয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়া যুবলীগের শীর্ষ পদে বর্তমান কমিটির বাইরে থেকে কাউকে নেতৃত্বে আনার কথা ভাবা হলেও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্ষেত্রে তেমনটা হবে না। স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান কমিটিতে বেশ কয়েকজন তরুণ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিসম্পন্ন দক্ষ নেতা রয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এমন ইঙ্গিতই দেওয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্মেলনের মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন নেতৃত্ব আসছে। যাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আছে, শিক্ষিত এবং সাংগঠনিক দক্ষতা আছে তাদের নেতৃত্বে আনা হবে।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রথম সভাপতি। স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে তাঁর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। এবার সংগঠনটির সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কেমন নেতৃত্ব আসতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা সৎ, যাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে, যারা সাহসী ও দুঃসময়ে সংগঠনের জন্য কাজ করেছে, তাদের খুঁজে বের করে নেতা নির্বাচিত করা হবে। যারা দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংগঠনের জন্য কাজ করছে, তাদের মাঝ থেকেই অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের সামনে আনা হবে।’

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসছে কি না জানতে চাইলে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘যথাসময়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন হয়নি, অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে আগামী কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনাই বেশি।’

আগামী ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় এবং ১১ নভেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর ও ১২ নভেম্বর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় সাত বছর পর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রায় ১৩ বছর পর। ফলে এ সম্মেলন ঘিরে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, তিন বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কমিটি এরই মধ্যেই সাত বছর পার করে ফেলায় কেন্দ্রীয় শীর্ষ দুই নেতাকে আর নেতৃত্বে রাখতে আগ্রহী নন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার এরই মধ্যে ক্যাসিনোকাণ্ডে সমালোচিত। তাঁর ব্যাংক হিসাবে লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। আর সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃত্বে রয়েছেন। বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তীব্র কোন্দলে জড়িয়েছেন পঙ্কজ। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই পঙ্কজের ওপর বিরক্ত। ফলে এ দুই নেতাকেই বাদ দিয়ে নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের কথা ভাবছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান কমিটির নেতাদের মধ্যে সহসভাপতি ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক নির্মল রঞ্জন গুহ, সহসভাপতি মতিউর রহমান মতি, মঈন উদ্দিন মঈন, আফজালুর রহমান বাবু ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চু সভাপতি প্রার্থী। তবে সংগঠনটির নীতিনির্ধারকরা তাঁদের সাধারণ সম্পাদক পদে রাখতে চাইলে তাঁরা আপত্তি জানাবেন না।

সহসভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও এক-এগারোর সময়ে রাজপথে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। নেতাকর্মীদের কাছে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিত। গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চু সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। সাবেক এ ছাত্রলীগ নেতা বিরোধী দলে থাকার সময়ে একাধিকবার কারা নির্যাতনের শিকার হন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায়ও তিনি আহত হন। আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের একাধিক সূত্র জানায়, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে যেকোনো একটি পদে সাচ্চুকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান কমিটির তরুণ সাংগঠনিক সম্পাদকদের আসার সম্ভাবনা বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে শেখ সোহেল রানা টিপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাজ্জাদ সাকিব বাদশা সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এ দুই নেতা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এবং পরবর্তী সময়ে আলোচিত এক-এগারোর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটকে সফলভাবে পরিচালনা করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে। মেধাবী ও বিনয়ী নেতা হিসেবে নেতাকর্মীদের কাছে তাঁরা বিশেষ জনপ্রিয়।

আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল হাসান জুয়েলেরও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সাবেক এ ছাত্রলীগ নেতাও এক-এগারোর সময়ে কারা নির্যাতিত। তিনি প্রায় এক বছর কারাবন্দি ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কাজ করছেন জুয়েল।

সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম আজিম, আব্দুল আলীম বেপারীও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী। রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আজিম তাঁর বিভাগের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে সামাল দিয়ে নীতিনির্ধারকদের সুনজরে রয়েছেন। বর্তমান কমিটির সহসভাপতি মুজিবুর রহমান স্বপন, দপ্তর সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ টুটুল, সহগ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বিটুও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী।

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণে যাঁরা আলোচনায়

ঢাকা মহানগর উত্তরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদেও পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এ পদ দুটি পেতে বর্তমান কমিটির সহসভাপতি গোলাম রাব্বানী ও শফিকুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফরোজ হাবীব ও হাবিবুর রহমান পান্না, সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম মনোয়ারুল ইসলাম বিপুল তৎপর রয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইসহাক মিয়া সভাপতি পদপ্রত্যাশী। তিনি আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলাম বিপুল সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা মহানগরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে বিশেষ তৎপরতা চালাচ্ছেন তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক এজিএস আমজাদ হোসেন। কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে তাঁর বিশেষ জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রচার সম্পাদক দুলাল হোসেন, মোহাম্মদপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি লায়ন এম এ লতিফও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের একটি সূত্র জানায়, ইসহাক মিয়াকে সভাপতি ও বিপুলকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর উত্তরের কমিটি গঠনের সম্ভাবনাই বেশি।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসছে। দক্ষিণে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে এগিয়ে আছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কামরুল হাসান রিপন, বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, তারেক সাঈদ, মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ ও শেখ আনিসুর রহমান রানা।

একটি সূত্র জানায়, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছারেরও যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর মতো পরিণতি হতে পারে। ক্যাসিনো কাণ্ডে নাম আসায় তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি। ফলে কাউন্সিলের আগেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা