kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পীরগঞ্জে পুলিশ হেফাজতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু

ফাঁড়ির হাজতখানা ছিল ইনচার্জের ‘টর্চার সেল’

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফাঁড়ির হাজতখানা ছিল ইনচার্জের ‘টর্চার সেল’

রংপুরের পীরগঞ্জে ভেন্ডাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির হাজতে ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনায় ফাঁড়ি ইনচার্জ (আইসি) আমিনুল ইসলামের বিচারের দাবিতে অনড় এলাকাবাসী। গত ১৬ অক্টোবর একই দাবিতে হাজারো ভুক্তভোগী স্লোগান দিয়ে রাস্তা অবরোধ, ফাঁড়ি ঘেরাও করে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে। পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ছুড়লে কয়েকজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় আইসি আমিনুল ইসলাম, এসআই তাজউদ্দিন, পিএসআই মাহি আলম, এএসআই হরিকান্ত, কনস্টেবল আরিফুল ও ভুপেনকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ফাঁড়ি ইনচার্জ আমিনুল ও তাঁর সোর্স জিয়ার অত্যাচার-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হাজারো মানুষ। ফাঁড়িতে পুলিশ হেফাজতে ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনার পর বেরিয়ে আসছে ওই হাজতখানার ‘টর্চার সেলে’ সাধারণ মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতনের নানা চিত্র।

জিয়াউর রহমান জিয়া ছিলেন ইনচার্জ আমিনুল ইসলামের সোর্স। তিনি নিজেকে ফাঁড়ির সেকেন্ড ইনচার্জ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি ছিলেন গোদের ওপর বিষফোড়া। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তার করা গেলে অনেক অপকর্মের তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানায় এলাকাবাসী।

১৯৯৯ সালের ৮ এপ্রিল পীরগঞ্জের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ভেন্ডাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। ২০০৩ সালে নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু হয়। ফাঁড়িতে জিডি, অভিযোগ, মাদক ও মামলার তদন্ত কার্যক্রম এবং তাত্ক্ষণিক সমস্যা মনিটর করা হতো। ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর ২২তম ইনচার্জ হিসেবে আমিনুল ইসলাম যোগদান করেন। তখন থেকে তিনি ওই এলাকায় মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ওঠেন। এ কারণে এলাকাবাসী তাঁকে ‘ফাটাকেষ্ট’ উপাধি দেয়। কারণ তিনি নানা ছলছুতায় সাধারণ মানুষকে আটকে মারধর, মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করতেন। ফাঁড়ির হাজতখানাটিকে পরিণত করেন ‘টর্চার সেলে’। অসংখ্য মানুষ জানিয়েছে নির্মম নির্যাতনের কথা। আটক বাণিজ্য ছিল তাঁর প্রতিদিনকার কাজ।

গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় ছাগল ব্যবসায়ী শামছুল হককে (৫৫) পীরগঞ্জের বড়দরগাহ বাসস্ট্যান্ড থেকে চোলাই মদ সেবনের অভিযোগে আটক করা হয়। শামছুলকে ছেড়ে দিতে ওই রাতে তাঁর পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন আমিনুল। পরদিন সকালে এক লাখ থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার টাকায় দফারফা করার কথা জানান তিনি। কিন্তু টাকা না দেওয়ায় মাদক কারবারি হিসেবে শামছুলের নামে মামলা দেওয়া হয়। ১৬ অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে শামছুলের সঙ্গে দেখা করে স্বজনরা। এর কিছুক্ষণ পর শামছুলের মৃত্যুর খবর জানানো হয় স্বজনদের। শামছুল হক পার্শ্ববর্তী মিঠাপুকুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ফাঁড়ির ইনচার্জ আমিনুলের নির্যাতনের শিকার এলাকার হাজারো মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। একপর্যায়ে ফাঁড়ি ঘেরাও করে স্থানীয় জনতা ইটপাটকেল ছুড়লে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়াধাওয়ি ও সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইনচার্জ আমিনুলের নির্যাতনের শিকার গুর্জিপাড়া এলাকার পুলিশেরই এক দারোগার ছেলে নিশাত মিয়া। সে ওই ইনচার্জের মোটরসাইকেলকে ওভারটেক করায় থানায় নিয়ে তাকে বেদম মারধর করা হয়। একপর্যায়ে মাদকের মামলার ভয় দেখিয়ে ওই দারোগার পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।

আরেক ঘটনায় মাদকের মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে নির্যাতন করে পার্বতীপুরের রিয়ন মিয়ার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা, নগদের এসআরের কর্মী রুবেল মিয়ার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা, গুর্জিপাড়ার চাকরিজীবী আতিয়ার রহমানসহ ছয়জনকে ধরে নিয়ে ৪৮ হাজার টাকা, ভেন্ডাবাড়ীর জুতার মিস্ত্রি (মুচি) রামনালের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা, কলা ব্যবসায়ী শাহীনুরের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা, মথুরাপুরের ব্যবসায়ী রায়হানের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা, ভেন্ডাবাড়ী হাটের ব্যবসায়ী জোনাব আলী ও তাঁর ছেলেকে ধরে নিয়ে ফাঁড়িতে নির্যাতন চালিয়ে ৩০ হাজার টাকা আদায় করে ছেড়ে দেন। এলাকা ঘুরে এ রকম অনেক নির্যাতন এবং ফাঁড়ি ইনচার্জ আমিনুলের আটক বাণিজ্যের তথ্য পাওয়া গেছে।

গুর্জিপাড়ার ফার্নিচার ব্যবসায়ী সুজন মিয়া জানান, তাঁর কাছ থেকে সোফাসেট নিয়ে ২০ হাজার টাকা দেননি ইনচার্জ আমিনুল। উল্টো তাঁকে মাদক মামলার ভয় দেখানো হয়।

গুর্জিপাড়ার আরেক ব্যবসায়ী খালেক মিয়া জানান, অন্যায়ভাবে আমিনুল তাঁর কাছে দেড় লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। টাকা না দেওয়ায় তাঁকে ধরে নিয়ে মাদক মামলায় চালান করা হয়। চার দিন তাঁকে হাজতবাস করতে হয়।

ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, হাজতখানাটিকে ইনচার্জ আমিনুল টর্চার সেল করে তোলেন। টাকা না পেলে নির্মম নির্যাতন চালানো হতো সেখানে। আমিনুল এভাবে এক বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

নতুন যোগদানকারী ফাঁড়ি ইনচার্জ সুশান্ত বলেন, ভেন্ডাবাড়ীর মানুষ শান্তিপ্রিয়। বর্তমানে এলাকা শান্ত এবং পুলিশ টহল রয়েছে।

এদিকে হাজতখানায় মারা যাওয়া শামছুলের মৃত্যুতে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবারটি। তাঁর স্ত্রী মমেনা বেগম, কন্যা সান্তনা ও বোন ফাতেমা বেগম বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ ইনচার্জ আমিনুলের শাস্তির দাবি জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা