kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

শান্তিতে নোবেল ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রীর

২০ বছরের সংঘাত অবসানের স্বীকৃতি

সাব্বির খান সুইডেন থেকে   

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



২০ বছরের সংঘাত অবসানের স্বীকৃতি

২০১৯ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হয়েছেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলী। ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার’ জন্য তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। 

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান বেরিত রেইজ-আন্দেরসেন গতকাল বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউটের প্রেস রুম থেকে বিজয়ীর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অর্জনে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা সীমান্ত সংঘাত নিরসনে তাঁর নিষ্পত্তিমূলক উদ্যোগের জন্য তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হলো।’ ইথিওপিয়া ছাড়াও আফ্রিকার পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে শান্তি এবং এ লক্ষ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য যাঁরা নিরলস কাজ করেছেন, তাঁদের  অংশীদারিমূলক  অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপও পুরস্কারটি প্রদান করা হলো বলে জানায় নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।

এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছিল। সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছিল সুইডেনের জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থানবার্গের নাম এবং এর পরেই আলোচনায় ছিলেন আবি আহমেদ। এ ছাড়া নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডার্ন, ব্রাজিলের আদিবাসী নেতা ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মী রাওনি মেতুকতায়ারের নামও শোনা যাচ্ছিল।

আবি আহমেদ (৪৩) নোবেল পাওয়ার ঘোষণা শোনার পর বলেছেন, তিনি উচ্ছ্বসিত ও বিনম্র। নোবেল কমিটিকে টেলিফোন করে বলেন, ‘আপনাদের খুবই ধন্যবাদ। এই পুরস্কার আফ্রিকা, ইথিওপিয়াকে দেওয়া হয়েছে। আমি কল্পনা করতে পারছি, এই পুরস্কারকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে আফ্রিকার নেতারা শান্তি প্রতিষ্ঠায় কিভাবে নিজেদের নিয়োজিত করবেন।’   

আবি আহমেদ ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী হয়েই স্পষ্ট করেন, তিনি ইরিত্রিয়ার সঙ্গে শীতল হয়ে যাওয়া শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে চান। ইরিত্রিয়ার রাষ্ট্রপতি ইসাইয়াস আফওয়ারকির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ ২০ বছরের অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে আবি আহমেদ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চুক্তির নীতিমালাগুলো কার্যকর করেছিলেন। ২০১৯ সালের জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে আসমারা ও জেদ্দায় প্রধানমন্ত্রী আবি ও রাষ্ট্রপতি আফওয়ারকির মধ্যকার স্বাক্ষরিত ঘোষণাপত্রে এই নীতিমালাগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এই অকল্পনীয় সফলতার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল ২০০২ সালের আন্তর্জাতিক সীমানা-কমিশনের সালিসি রায়কে মেনে নিতে আবি আহমেদের শর্তহীন সদিচ্ছা, যা না হলে শান্তিচুক্তিটি কোনোভাবেই আলোর মুখ দেখত না।

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বলেছে, এক পক্ষের চেষ্টায় কখনো শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী আবি যখন তাঁর হাত বাড়িয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি আফওয়ারকি তখন তা আঁকড়ে ধরেছিলেন, যা দুই দেশের সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ককে একটি সুনির্দিষ্ট শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত করতে সহায়তা করেছে। এই শান্তিচুক্তি ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সব মানুষের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে সহায়তা করবে বলে কমিটি আশা প্রকাশ করে।

নোবেল কমিটি এটাও বলেছে, এখনো অনেক কাজ বাকি। তবু প্রধানমন্ত্রী আবি যেভাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কাজগুলো শুরু করেছেন, তা ইথিওপিয়ার নাগরিকদের উন্নত জীবন এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা দিচ্ছে।

আবি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেন। মিডিয়ার সেন্সরশিপ উঠিয়ে নেওয়া ছাড়াও বিরোধী দলের ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেন। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের বহিষ্কার করার পাশাপাশি ইথিওপিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নারীদের জীবনমান উন্নয়নে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রেখেছেন। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠা দিতে স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন আবি আহমেদ।

ইরিত্রিয়ার সঙ্গে শান্তিপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী আবি পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার শান্তি ও সমন্বয়সাধনের কাজেও নিজেকে নিযুক্ত করেছেন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি এবং তাঁর সরকার অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে বহু বছরের রাজনৈতিক বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে ইরিত্রিয়া ও জিবুতির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অবদান রেখেছেন। এ ছাড়া তিনি সামুদ্রিক অঞ্চলের অধিকার নিয়ে কেনিয়া ও সোমালিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিরোধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার জন্য নিজ থেকেই এগিয়ে গিয়েছেন। এই বিরোধের সুষ্ঠু সমাধানের জন্য এখন দুই পক্ষই আশাবাদী। সুদানে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সে দেশের সামরিক সরকার ও বিরোধীরা এরই মধ্যে আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছেন। সুদানে বেসামরিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এবং গণতন্ত্রের পথে শান্তিপূর্ণভাবে উত্তরণের লক্ষ্যে একটি নতুন সংবিধানের খসড়া যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে গত ১ আগস্ট, যে চুক্তি সম্পাদনে নেতৃত্ব দেওয়ার কাজে প্রধানমন্ত্রী আবি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।

ইথিওপিয়া একটি বহু ভাষাভাষীর দেশ। সাম্প্রতিককালে দেশটির বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তঃকলহ, বিদ্বেষ ও সহিংসতা বিস্ফোরকের মতো দানা বেঁধে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রয় ৩০ লাখ ইথিওপীয় নিজ দেশেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশের এই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ পুনর্মিলন, সংহতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানালেও অনেক চ্যালেঞ্জই এখনো তাঁর সামনে অমীমাংসিত অবস্থায় আছে। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বলেছে, কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন যে এই বছরের বিজয়ীকে খুব তাড়াতাড়ি পুরস্কারটি দেওয়া হলো। তবে ঐকান্তিক প্রচেষ্টার জন্য আবি আহমেদের এই স্বীকৃতি প্রাপ্য এবং কঠিন পথ চলায় তাঁকে উৎসাহ দেওয়া নৈতিকভাবে প্রয়োজন বলে মনে করে নোবেল কমিটি।

আবি আহমেদ আলী ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট ইথিওপিয়ার অরোমো প্রদেশের আগারোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ওরোমো নৃগোষ্ঠীর মুসলমান এবং মা আমহারা নৃগোষ্ঠীর একজন খ্রিস্টান। আবি নব্বইয়ের দশকে কিশোর বয়সে মার্ক্সবাদী ডার্গ সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। আবি আদ্দিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে ডক্টরেট এবং লন্ডনের গ্রিনিচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেতৃত্বের (লিডারশিপ) ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ১৯৯৫ সালে তিনি রুয়ান্ডায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন ইথিওপীয় সামরিক বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল। ২০১০ সালে আবি ওরোমো পিপলস ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশনে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ২০১৬ সালে ইথিওপিয়ার গবেষণা ও প্রযুক্তি মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। ৪১ বছর বয়সে ২০১৮ সালের এপ্রিলে আবি আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

১৯০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ৯৯ জনকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ২৪টি সংগঠন। দুটি শান্তি পুরস্কার যৌথভাবে দেওয়া হয়েছে এবং ১৭ জন নারী নোবেল পেয়েছেন। শান্তিতে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই যিনি পেয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সে এবং সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ বিজয়ী জোসেফ রোডব্লাট, ৮৭ বছর। ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের লি ডাক থো-কে শান্তিতে নোবেল দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে শান্তিতে নোবেল বিজয়ীকে সোনার মেডেল, নোবেল ডিপ্লোমা এবং ৯ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার প্রাইজমানি হিসেবে দেওয়া হবে। আগামী ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে ৪টায় ঘোষণা করা হবে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীর নাম।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা