kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

দখল করা হয় রঞ্জনের বসতভিটা

খালেদের আশীর্বাদে টুন্ডা কালামের সম্পদের পাহাড়

হায়দার আলী   

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



খালেদের আশীর্বাদে টুন্ডা কালামের সম্পদের পাহাড়

স্ত্রী-কন্যা আর দুই পুত্র নিয়ে রঞ্জন চন্দ্র মণ্ডলের সুখের সংসার। সবুজবাগ থানার নন্দীপাড়ায় পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৪৪ শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করা ঘর ভাড়ায় ভালোই চলছিল তাঁর সংসার। রঞ্জন মণ্ডলের স্বপ্ন ছিল ছেলে শাওন মণ্ডল ইঞ্জিনিয়ার আর মেয়ে শ্যামা রানী হবে ডাক্তার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ছেলে-মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করান। কিন্তু রঞ্জনের সেই স্বপ্ন ধূলিসাত্ করে দেয় স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম আজাদ ওরফে টুন্ডা কালাম ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী। ছেলে-মেয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে দূরের কথা, বর্তমানে সামান্য মাথা গোঁজার ঠাঁইও পাচ্ছেন না রঞ্জন। ২০০ বছরের পুরনো বসতভিটা থেকে রাতের আঁধারে জোর করে রঞ্জনকে উচ্ছেদ করে যুবলীগ নেতা খালেদের আশীর্বাদপুষ্ট টুন্ডা কালাম ও তাঁর সহযোগী আব্দুল হালিম, আজিজুলসহ স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। প্রায় ১৬ কোটি টাকা মূল্যের ৪৪ শতাংশ জমি দখল করে নেওয়ার পর পাঁচ বছর পার হলেও এখনো  তা ফিরে পাননি রঞ্জন। ছেলে শাওন এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের পরও পরীক্ষা দিতে পারেনি টুন্ডা কালাম ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর হুমকিতে। ভিটামাটি হারিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখন তিনি পাগলপ্রায়।

গত বুধবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে টুন্ডা কালাম, আব্দুল হালিম, আজিজুল হকসহ অর্ধশত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হামলা চালায় রঞ্জন মণ্ডলের বাড়িতে। নন্দীপাড়া মৌজার ২৬/২ নম্বর প্লটে রঞ্জনের ৪৪ শতাংশ জমির ওপর নিজের একতলা বসতবাড়ি এবং ৪৪টি টিনশেডের ঘর ভাঙচুর করে মাটিতে গুঁড়িয়ে দেয়। জমিটির রেকর্ডে মালিক হিসেবে নাম রয়েছে রঞ্জন মণ্ডলের দাদা গোবিন্দ মণ্ডলের। বাড়িটি দখলে নিতে রাতভর তাণ্ডব চালায় কালাম বাহিনী। রঞ্জন মণ্ডলের পুত্র-কন্যারা এক কাপড়ে বাড়ি থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে যায়। পরদিন দিনের আলো ফোটার আগেই ২০০ বছরের পুরনো বাড়িটির চিহ্ন মুছে ফেলে টুন্ডা কালাম ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী। এ ঘটনায় রঞ্জন মণ্ডল সবুজবাগ থানায় মামলা করতে চাইলে পুলিশ মামলা না নিয়ে উল্টো কালাম বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত মেরে ফেলার হুমকি পেয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান রঞ্জন মণ্ডল। পরে মানবাধিকারকর্মী মাইনোরিটি ওয়াচ বাংলাদেশের সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রবীন্দ্র ঘোষের সহযোগিতায় ভারত থেকে দেশে ফিরে আসেন। সোনা ও টাকা-পয়সা লুট এবং বাড়িঘর ভাঙচুর ও উচ্ছেদের অভিযোগে ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর রবীন্দ্র ঘোষের সহযোগিতায় মামলা করেন রঞ্জন মণ্ডলের স্ত্রী মালতী রানী মণ্ডল। জালিয়াতি করে ভুয়া দলিল বানিয়ে জমি দখলে নেওয়ার অভিযোগে টুন্ডা কালামসহ তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মামলা করেন রঞ্জন মণ্ডল। ওই মামলায় কালামসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পুলিশ।

আইনজীবী রবীন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘প্রায় ১৬ কোটি টাকা মূল্যের বাড়িসহ জমিটি দখলে নিতেই স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনী ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে উচ্ছেদ করে রঞ্জন মণ্ডলের পরিবারকে। ওই সময় কেউ তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি। স্থানীয় এমপি সাবের হোসেন চৌধুরীকে বারবার বলার পর তিনিও পরিবারটিকে তাদের বাড়িতে উঠিয়ে দিতে পারেননি। ওই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোয় আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে ওই বাহিনী। ভয়ংকর এক দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে রঞ্জন মণ্ডলের পরিবার। সরকারের উচিত পরিবারটির পাশে থাকা।’

ক্ষুব্ধ কণ্ঠে রঞ্জন মণ্ডল বলেন, ‘ভুয়া দলিল বানিয়ে ২০০ বছরের পুরনো বাড়ি, যেখানে শুধু আমার জন্মই নয়, আমার বাবা, দাদার জন্ম, সেই বাড়িতে রাতের আঁধারে হামলা চালিয়ে দখল করে নেয়। বাড়ির জমির বাইরে আরো প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের মূল্যবান সম্পদও লুট করে নিয়ে যায় তারা।’

মালতী রানী মণ্ডল বলেন, ‘কালাম ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে ছেলে- মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ। কালাম স্কুলে গিয়ে হুমকি দিয়ে এসেছে যেন আমার মেয়েকে ভর্তি না করায়। আর নিয়মিত আমাদের হুমকি দিয়ে যেত এলাকা ছেড়ে ভারতে চলে যেতে।’ 

একইভাবে বটতলার গদাধর মণ্ডলের পুত্র অনীল মণ্ডলের ২১ শতাংশের বাড়ি এবং পূর্ব নন্দীপাড়ার কার্তিক চন্দ্র সরকারের ২৬ শতাংশের বাড়ি দখলে নিতে বারবার হামলা চালান টুন্ডা কালাম। জীবনের ভয়ে থানায় একাধিক জিডি করা হলেও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। অন্যদিকে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসাবো মায়াকানন এলাকার মরহুম মোশারফ হোসেন মঞ্জুর মেয়ে তানিয়া আক্তার ও সোনিয়া আক্তারের ১২ কাঠা জমি জোর করে দখল করেছে টুন্ডা কালাম ও তাঁর বাহিনী।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, টুন্ডা কালামের বাবার নাম আলতাফ হোসেন। বরিশাল থেকে আশির দশকে ঢাকায় এসে সবুজবাগ মায়াকানন এলাকায় জিয়া হায়দার স্বপনের বাড়িতে কেয়ারটেকারের কাজ নেন আলতাফ হোসেন। আর গরুর খামারে গরু পালতেন টুন্ডা কালাম। নন্দীপাড়া বটতলায় মুরগিও বিক্রি করতেন। সেই টুন্ডা কালাম একপর্যায়ে যুবলীগ নেতা খালেদের আশীর্বাদ নিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদক কারবার করে শতকোটি টাকার মালিক বনে যান। নেতাকর্মীদের ভাষ্য মতে, টুন্ডা কালাম দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৭৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতির পদটি কিনেছেন এক কোটি টাকার বিনিময়ে। দলীয় পদ আর গডফাদারদের আশীর্বাদ নিয়ে নন্দীপাড়ায় পাঁচটি বাড়িসহ শতকোটি টাকার মালিক এখন টুন্ডা কালাম।

নন্দীপাড়া কবরস্থান, বিশ্বরোড, পশ্চিম নন্দীপাড়াসহ সবুজবাগ থানা এলাকায় কয়েক শ কাঠা জমি রয়েছে তাঁর। এলাকাবাসীর অভিযোগ, একদা গরুর রাখাল আর মুরগি বিক্রেতা টুন্ডা কালাম অন্যের জমি আর বাড়ি দখল করে শতকোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। অর্ধশত ক্যাডার বাহিনী নিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। চাঁদাবাজি করতে গেলে কালামের ডান হাত পিটিয়ে থেঁতলে দেয় স্থানীয় বাসিন্দারা। সেই থেকে ডান হাত অকেজো হয়ে পড়ায় এলাকায় তাঁর পরিচয় দাঁড়ায় টুন্ডা কালাম। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা ফজর আলীকে জোর করে হারিয়ে দিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন টুন্ডা কালাম। যুবলীগ নেতা খালেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন কালাম। তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীকেও এখন প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা