kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

সম্রাটের হাত ধরেই ছয় যুবলীগ নেতা ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে

লায়েকুজ্জামান   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সম্রাটের হাত ধরেই ছয় যুবলীগ নেতা ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে

ঢাকায় ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত সাত যুবলীগ নেতা। এই সাতজনের দুজন এসেছেন ফ্রিডম পার্টি থেকে, দুজন বিএনপি থেকে, একজন জাতীয় পার্টির এবং একজন ছিলেন হোটেল বয়। শুধু একজন শুরু থেকেই যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের হাত ধরেই প্রথমে মতিঝিলের ক্লাবপাড়া, পরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ক্যাসিনোর প্রসার ঘটে।

এই সাতজন হচ্ছেন যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, সহসভাপতি এনামুল হক আরমান, সহসভাপতি সোহরাব হোসেন স্বপন, সহসভাপতি সরোয়ার হোসেন মনা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল হক সাঈদ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ও নির্বাহী সদস্য জাকির হোসেন। এর মধ্যে একমাত্র সম্রাটের রাজনীতি শুরু যুবলীগের মাধ্যমে। তিনি অন্য কোনো দল করেননি।

আরমানের রাজনীতিতে আগমন বিএনপি ঘরানার লোক হয়ে। স্বপন ছিলেন ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার। মনা যুবলীগে এসেছেন জাতীয় পার্টি থেকে। সাঈদ ছিলেন বিএনপি ঘরানার লোক। খালেদ সরাসরি জড়িত ছিলেন ফ্রিডম পার্টির সঙ্গে। জাকির ছিলেন কাকরাইলের পিয়াল হোটেলের গ্লাস বয়। খালেদ সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে তাঁদের সবার নেতা সম্রাট। যুবলীগে তাঁদের অভিষেক ঘটে সম্রাটের মাধ্যমেই ঊর্ধ্বতন নেতাদের সেলামি দিয়ে। তাঁরা প্রত্যেকে পৃথক পৃথক অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করলেও তাঁদের নিয়ন্ত্রণের নাটাই সম্রাটের হাতে।

সম্রাট : ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাটের আদি বাড়ি ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায়। তাঁর বাবা চাকরি করতেন রাজউকে। বাবার চাকরি সূত্রে তিনি প্রথমে বসবাস করতেন কাকরাইলের সার্কিট হাউস সড়কের সরকারি কোয়ার্টারে। পরে মধ্য বাড্ডায়। সম্রাটের রাজনীতিতে আগন ঘটে ১৯৯১ সালে যুবলীগের মাধ্যমে। তাঁর চাচাতো ভাই শরীফ ওই বছর সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হলে লাইমলাইটে আসেন সম্রাট। প্রথমে তিনি যুবলীগ মহানগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হন। সে সময় সভাপতি ছিলেন নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। পরবর্তী সময়ে সম্রাট ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি হন। সম্রাট রাজনীতির সুদিন-দুর্দিন সব সময়েই সংগঠনের সঙ্গে আছেন।

আরমান : ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি এনামুল হক আরমানের বাড়ি নোয়াখালীতে। ঢাকায় এসে ‘লাগেজ ব্যবসা’ করতেন। পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুর থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য এনে বায়তুল মোকাররমে বিক্রি করতেন। আরমান একসময় খালেদা জিয়ার নিকটাত্মীয় ‘বাউন্ডারি ইকবাল’ হিসেবে পরিচিত ইকবাল হোসেনের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ইকবালের যাতায়াত ছিল হাওয়া ভবনে। তাঁর মাধ্যমে আরমানও হাওয়া ভবনঘনিষ্ঠ হন। শামিল হন বিএনপির রাজনীতিতে। পদ-পদবি না থাকলেও হাওয়া ভবনঘনিষ্ঠ বলে মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। বিএনপি আমলেই আরমান ফকিরাপুলের কয়েকটি ক্লাবের জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হলে যুবলীগের মিছিলে হাজির হতে শুরু করেন আরমান। ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন সম্রাটের। সম্রাট ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হলে সহসভাপতি করা হয় আরমানকে। সম্রাটের ক্যাসিনোর টাকার সংগ্রাহক তথা ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত আরমান। মূলত তাঁর মাধ্যমেই ক্যাসিনোজগতে প্রবেশ ঘটে সম্রাটের। ক্যাসিনো কারবারে আরমানকে গুরু বলে মানেন সম্রাট।

আরমান একসময় সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় লাগেজ আনার ব্যবসা করতেন। সে সুবাদে সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনোর সঙ্গে পরিচয় ঘটে আরমানের। পরবর্তী সময়ে সম্রাটকে এই লাভজনক কারবারের ধারণা দেন তিনি। সম্রাটঘনিষ্ঠ যুবলীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আরমান নিজের টাকা দিয়ে প্রথমে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম কিনে আনেন ঢাকায়।

স্বপন : আরামবাগ-ফকিরাপুল ক্লাব পাড়ার ডন হিসেবে পরিচিত যুব লীগ দক্ষিনের সহ-সভাপতি সোহরান হোসেন স্বপন যিনি সম্রাটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওই দুই এলাকায় স্বপনের বিচরণ দীর্ঘদিন ধরে। মতিঝিলের ফ্রিডম পার্টির নেতা সরুর মাধমে ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার হিসেবে রাজনীতিতে আগমন ঘটে স্বপনের। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি মিশে যান বিএনপির সঙ্গে তবে কোনো পদ পাননি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে স্বপন যুবলীগ হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। এক সময়ে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তাকেও যুবলীগ দক্ষিণের সহ-সভাপতি করা হয়। সম্রাটের হয়ে ঢাকার ক্যাসিনোগুলোর অন্যতম নিয়ন্ত্রকদের একজন স্বপন।

মনা : সরোয়ার হোসেন মনার বাড়ি বরিশালে। বর্তমানে সম্রাটের হয়ে আরামবাগ-ফকিরাপুল এলাকার ক্যাসিনো দেখাশোনার দায়িত্ব তাঁর। মনা একসময় জড়িত ছিলেন জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে। এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হলে বেশ কিছুদিন রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। বিএনপিতে প্রবেশের চেষ্টা করেও পারেননি। পরবর্তী সময়ে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ হয়ে যুবলীগের নেতা হয়ে ওঠেন। তাঁকেও করা হয় ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি।

সাঈদ : মোমিনুল হক সাঈদ ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। মতিঝিল এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি হন বিএনপি নেতা লোকমান হোসেন। এই লোকমান হোসেনের ক্যাডার হিসেবে বিএনপি ঘরানার রাজনীতিতে আগমন ঘটে সাঈদের। মতিঝিল এলাকার ভয়ংকর ক্যাডার হিসেবে পরিচিত সাঈদ হঠাৎ যুবলীগ হয়ে ওঠেন বিএনপি ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পরপরই। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়ে আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠেন তিনি। ঢাকার ক্যাসিনোজগতের অন্যতম হোতা তিনি। তাঁর নিয়ন্ত্রিত ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে নগদ ১০ লাখ টাকা জব্দ করেছে র‌্যাব। তিনি আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবেরও সভাপতি। মতিঝিল এলাকার ফুটপাত থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজি—সব কিছুর নিয়ন্ত্রক সাঈদ। আরামবাগ-ফকিরাপুল এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেছেন, বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ফকিরাপুল-আরামবাগ এলাকায় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সিসি ক্যামেরা ও লোহার গেট বসিয়ে প্রতি মাসে এলাকার প্রায় ৩০ হাজার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাসে এক হাজার করে টাকা আদায় করতেন তিনি। সাঈদ বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।

খালেদ : সদ্য বহিষ্কৃত ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার রাজনীতির শুরু ফ্রিডম পাটির অস্ত্রবাজ ক্যাডার হিসেবে। ১৯৮৭ সালে খিলগাঁওয়ের কুখ্যাত সন্ত্রাসী মানিক ও মুরাদের মাধ্যমে ফ্রিডম পার্টিতে নাম লেখান তিনি। ১৯৯১ সালে ওই এলাকা থেকে জামায়াতের প্রার্থী আব্বাস আলী খানের নির্বাচনী প্রচারণা চালাতেন খালেদ। পরবর্তী সময়ে মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনের ঘনিষ্ঠ হয়ে তাঁর ক্যাডারের পরিচিতি পান। ১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ খিলগাঁও রেলওয়ে কেন্দ্র পর্যবেক্ষণে গেলে তাঁকে অস্ত্রের মুখে কেন্দ্র থেকে বের করে দেন খালেদ ও যুবদল নেতা মজনু। এ তথ্য জানিয়েছেন খিলগাঁও এলাকার আওয়ামী লীগের নেতারা। খিলগাঁও এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের মাধ্যমে খিলগাঁও-শাহজাহানপুরে দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠেন খালেদ। পরে সম্রাটের মাধ্যমে যোগ দেন যুবলীগে। যুবলীগে আসা খালেদের টার্গেটে পরিণত হন এলাকার নিবেদিত আওয়ামী পরিবারের সদস্যরা। তাঁর ভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন ত্যাগী ছাত্রলীগ নেতা সোহেল শাহরিয়ার। দুই বছর আগে খালেদ গুলি চালান এক আওয়ামী লীগ নেতার মায়ের ওপর। মোহাম্মদপুরে যুবলীগ নেতা গিয়াসসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক নেতার খুনের পেছনে খালেদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

জাকির : ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য জাকির হোসেন একসময় ছিলেন কাকরাইলের পায়েল হোটেলের গ্লাস বয়। হোটেলের চাকরি ছেড়ে ফরিদপুর ম্যানশনে একটি ফিল্ম কম্পানির পিয়নের চাকরি নেন। বর্তমানে তিনি যুবলীগের অন্যতম দাপুটে নেতা সম্রাটের ঘনিষ্ঠ। বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন জাকির। যুবলীগের একটি সূত্র জানায়, সম্রাটের বিপুল অঙ্কের অর্থ গচ্ছিত আছে জাকিরের কাছে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা