kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

নতুন ভিডিও ভাইরাল

জোরালো হলো লড়াকু মিন্নিই ‘সাক্ষী’

নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জোরালো হলো লড়াকু মিন্নিই ‘সাক্ষী’

স্বামীকে খুনিদের হাত থেকে রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়েছিলেন আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার সময় মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওতে সে রকমই দেখা গেছে। ঘটনার সর্বশেষ ভিডিওটিও প্রমাণ করে স্বামীকে রক্ষায় মিন্নির চেষ্টার কমতি ছিল না। কিন্তু পুলিশের কাটছাঁট করা একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নির বিরুদ্ধে রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এর পরই পুলিশ মিন্নিকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগপত্রেও তাঁকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু মিন্নি যে সাক্ষী সেটা জোরদার হচ্ছে হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ ভিডিও প্রকাশের পর।

এ অবস্থায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানির ধার্য দিন আজ বুধবার। বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে এ শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিন জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এ মামলার ৯ নম্বর আসামি নাজমুল হাসানের (১৪) জামিন শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। এ কারণে অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বরগুনা পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মুশফিক আরিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিফাত শরীফ মাদক নিয়ে বিরোধের জের ধরে খুন হয়েছেন। আসামিদের প্রায় সবাই মাদকসেবী। শুধু তা-ই নয়, রিফাতের সঙ্গে এর আগেও মাদক নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়েছে। পারিবারিক দ্বন্দ্বও ছিল। আমার ধারণা, মাদক ও খুনিদের আড়াল করতেই মিন্নিকে নিয়ে নাটক সাজানো হয়েছিল। সেই নাটক করতে গিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্ধসত্য একটি ভিডিও আমরা দেখেছি, যেটি প্রথম ও শেষের ভিডিওটি বিপরীত।’

বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, ‘রিফাত শরীফ হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা ভিডিওটি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা এককথায় স্বীকার করবেন যে মিন্নি জীবন বাজি রেখে তাঁর স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। সোমবার গণমাধ্যমে আসা নতুন ভিডিওটি স্বামী হত্যার সঙ্গে মিন্নির সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রমাণ করে না।’

যদিও পুলিশের হাত ঘুরে গণমাধ্যমে আসা দ্বিতীয় ভিডিও ফুটেজটি দেখে অনেকেই বলেছে ঘটনার সঙ্গে মিন্নি জড়িত। ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ডের মা প্রথমেই ঘটনার জন্য মিন্নিকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্যের সূত্র ধরেই রিফাতের বাবা মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। পরের দিন একই দাবিতে মানববন্ধনও হয়েছে। তার পরই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী মিন্নিকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম আর শেষ ভিডিওটি তা সমর্থন করে না।

বরগুনার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব চিত্তরঞ্জন শীল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। প্রথম ভিডিওটিতে দেখা যায় মিন্নি স্বামীকে বাঁচাতে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। শেষ ভিডিওটিও যাঁরা দেখেছেন তাঁরা বলেছেন মিন্নি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কিন্তু কাটছাঁট করে প্রচারিত দ্বিতীয় ভিডিও ফুটেজটি মিন্নিকে অভিযুক্ত করেছে। কারা কিভাবে, কাদের বাঁচানোর জন্য করেছে, তা কারোরই অজানা নয়। ওই ফুটেজটিই আদালতে পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও ভিডিও ফুটেজের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মিন্নি খুনের নেপথ্যে ছিলেন।’

রক্তাক্ত রিফাতকে একাই হাসপাতালে নিয়েছিলেন মিন্নি

গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে যায় সন্ত্রাসীরা। সেই ঘটনার পর তাঁকে বরগুনা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কী ঘটেছিল তার একটি ভিডিও ফুটেজ গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের সামনের একটি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সকাল ১০টা ২১ মিনিটের সময় মিন্নি একাই একটি রিকশায় করে গুরুতর জখম ও অচেতন রিফাতকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। এ সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মামুন নামের একজন রিফাত শরীফকে বহন করা রিকশার দিকে দৌড়ে আসেন। রিফাতের অবস্থা দেখে তিনি দৌড়ে হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে একটি স্ট্রেচার নিয়ে ফের রিকশার পাশে আসেন। এর সঙ্গে সঙ্গেই আসে উপস্থিত অনেকেই। রিকশা থেকে নামিয়ে রিফাতকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রক্তমাখা হাতে মিন্নি হাসপাতালের সামনে উপস্থিত একজনের ফোন নিয়ে কল করে কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন। এরপর তিনি হাসপাতালে ঢোকেন। এর কিছুক্ষণ পর মিন্নির বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন কিশোর হাসপাতালে আসেন। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের সময় বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্সটি হাসপাতালের সামনে এনে রিফাত শরীফকে বরিশাল নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়। সকাল ১০টা ৪৪ মিনিটের সময় অক্সিজেন ও দুটি স্যালাইন লাগানো অবস্থায় রিফাত শরীফকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালের সামনে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুল্যান্সে তোলা হয়। অ্যাম্বুল্যান্সটি ১০টা ৪৯ মিনিটের সময় বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের উদ্দেশে রওনা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের সামনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একটি ও বরগুনা জেলা পুলিশের একটি সিসি ক্যামেরা আছে। তবে এই ভিডিও কোন ক্যামেরায় ধারণ করা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হাসপাতালে রিফাত-মিন্নির নতুন ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সোহরাব উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বরগুনা জেলা পুলিশের সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এ ছাড়া এখানে অন্য কারো সিসি ক্যামেরা নেই। তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রিফাত শরীফ ও মিন্নির যে ভিডিওটি প্রকাশিত হয়েছে, ওই ভিডিওটি আমাদের ক্যামেরায় রেকর্ড হওয়া ভিডিও নয়।’

বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মিন্নি ও রিফাতের ওই ভিডিওটি কোন ক্যামেরায় রেকর্ড হয়েছে, তা এখনো আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। আমরা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি।’

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘মিন্নি যে রিফাত শরীফকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, তা কলেজের সামনের ভিডিও এবং হাসপাতাল প্রাঙ্গণের ভিডিওতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। আমার মেয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়। আমার মেয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’

অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি আজ

গত ১ সেপ্টেম্বর রিফাত হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এরপর গত ৩ সেপ্টেম্বর এ মামলার ধার্য তারিখ থাকলেও জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আরিয়ান শ্রাবণ নামের এক আসামির জামিন শুনানি থাকায় মামলার মূল নথি ওই আদালতে ছিল। এ কারণে ওই দিন অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি হয়নি। আদালত শুনানির দিন ধার্য করেন আজ ১৮ সেপ্টেম্বর।

এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী মজিবুল হক কিসলু বলেন, ‘আজ এ মামলার অভিযোগপত্রের শুনানির তারিখ পূর্বনির্ধারিত থাকলেও শুনানি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা এ মামলার অভিযুক্ত নাজমুল হাসানের জামিন শুনানি রয়েছে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। এ কারণে মামলার মূল নথি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রয়েছে। মূল নথি ছাড়া অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি হওয়ার সুযোগ নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা