kalerkantho

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

আমরা প্রতিহিংসা করলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমরা প্রতিহিংসা করলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসন ও আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাস ও পুড়িয়ে মানুষ হত্যার কঠোর সমালোচনা করে সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ মানুষ হত্যার রাজনীতি করে না। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসীও নয়। আমরা যদি সেটা বিশ্বাস করতাম, এ দেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না।’

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এদিন সংসদের বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালান না বলেও উল্লেখ করেন।

বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের লিখিত জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি সরকারের সময় তাদের হাতে আওয়ামী লীগ যে পরিমাণ হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে তা আর কেউ হয়নি। এ দেশে জঙ্গি সৃষ্টি, অগ্নিসন্ত্রাস, বোমা হামলা, মানি লন্ডারিং, এতিমের টাকা আত্মসাৎসহ হেন অপকর্ম নেই যা খালেদা জিয়া, তাঁর দুই ছেলে এবং তাঁর দলের নেতারা করেননি।

এর আগে রুমিন ফারহানার প্রশ্ন ছিল, ‘দেশে বর্তমানে মানুষ হত্যা হতে মশা মারা পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রয়োজন হয়।’ এমন প্রশ্নের তীব্র সমালোচনা করে লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি (রুমিন) একটি অনাকাঙ্ক্ষিত, অসংসদীয় ও অবান্তর প্রশ্ন এনেছেন। তিনি মানুষ হত্যা আর মশা মারাকে একই সমতলে নিয়ে এসেছেন। সংসদ সদস্যের নেত্রী খালেদা জিয়ার মতো দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালেই কি প্রশ্নকারী খুশি হতেন?’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র একটি যন্ত্রের মতন। এই যন্ত্রের বিভিন্ন কল-কবজা যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তখনই রাষ্ট্র ভালো থাকে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র ভালোভাবে কাজ করছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের অকার্যকর হওয়ার কথা উনি (রুমিন) বলছেন। অকার্যকর রাষ্ট্রের উদাহরণ তো বিএনপিই সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসত রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী ঘুমিয়ে থাকতেন, সিদ্ধান্ত দিতেন তাঁর পুত্র হাওয়া ভবন থেকে। মন্ত্রী-সচিবরা হাওয়া ভবন থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মেয়ে; যিনি তাঁর জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন এ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। তাঁর মেয়ে হিসেবে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। আমি সেটাই প্রতিপালনের চেষ্টা করি। সে জন্য দিনরাত পরিশ্রম করি। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সকল প্রতিষ্ঠানকে আরো সক্রিয় রাখার জন্য সদা-সর্বদা সচেষ্ট থাকি।’

সংসদ নেতা বলেন, ‘প্রশ্নকর্তা বিএনপি এমপির দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের রক্তে রঞ্জিত হয়ে খুনিদের সহায়তায় ক্ষমতায় বসেছিলেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিহিংসার বলি হয়ে জেলখানায় নির্মমভাবে নিহত হন জাতীয় চার নেতা। জিয়াউর রহমানই তো এ দেশে হত্যা, ক্যুর অপরাজনীতি শুরু করে। সশস্ত্র বাহিনীর শত শত অফিসার, সৈনিককে হত্যা করে। ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের সংস্কৃতি চালু করে। একটা পুরো প্রজন্মকে নষ্ট করে দেয় এই মেজর জিয়া। তাই বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যের মুখে মানুষ মারার বিষয়টি অবলীলায় চলে আসে। এটাই তো তাদের দলীয় আদর্শ। আর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া যে তার (জিয়া) চেয়েও এক কাঠি সরেস—সে প্রমাণ তিনি করেছেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রশ্নকর্তার নেত্রী খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর শাসনামলের পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকেসহ আওয়ামী লীগের পুরো নেতৃত্বকে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় মদদে খুনের নেশায় মত্ত হয়েছিল তাঁর দল বিএনপি।’

ডেঙ্গুর কিট : জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৩ আগস্ট পর্যন্ত সরকার এক লাখ ৫৭ হাজার এসএস-ওয়ান কম্ব কিটসহ মোট তিন লাখ ৬৮ হাজার ২০০ ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণ কিট আমদানি করেছে। গত ৬ আগস্ট থেকে বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে দেশেই ডেঙ্গু রোগের কিট তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার কিট সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণ কিট ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই।

দেশবাসীকে ডেঙ্গু রোগ মোকাবেলায় নিজ নিজ এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় ১২৭টি দেশে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।

মুজিববর্ষ পালন : গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ১৭ মার্চ ২০২০ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষ’-এর আয়োজন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলাই আমর সরকারের মূল লক্ষ্য। নিজের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, দেশের জন্য কী করতে পারলাম সেটাই আমার কাছে মূল লক্ষ্য। বিশ্বনেতা জাতির পিতা, আমি নই। এটা আমার বিনয় নয়, এটাই বাস্তব সত্য কথা।’

তিস্তা চুক্তি : জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো চুক্তি সম্পাদনের সময় বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখেই খসড়া প্রস্তুত ও চূড়ান্ত করা হয়। তিস্তাসহ অন্য সকল অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। এ চুক্তিটি সম্পাদনের জন্য সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রুমানা আলীর প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের চাপে মিয়ানমার দ্বিপক্ষিক চুক্তিগুলো স্বাক্ষর করলেও তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট গড়িমসি করে। দ্বিপক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী পরিচিতি যাচাইয়ের জন্য মিয়ানমারের কাছে আমরা এ যাবৎ তিন দফায় ৫৫ হাজার ৫১১ জন রোহিঙ্গার তথ্য প্রদান করেছি।’ তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষাপূর্ব বিভিন্ন দফায় এসব রোহিঙ্গার ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে। তাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা দুই দফা প্রস্তুতি নিই। প্রথমবার গত বছরের ১৫ নভেম্বর এবং দ্বিতীয়বার চলতি বছরের ২২ আগস্ট আরেক দফা প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক করা হয়। কিন্তু যাবতীয় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে সম্মত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

 

 

মন্তব্য