kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ

সাক্ষরতার হার বাড়াতে শুধুই ফাঁকা বুলি

শরীফুল আলম সুমন   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাক্ষরতার হার বাড়াতে শুধুই ফাঁকা বুলি

সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৪ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সাক্ষরতার হার বাড়ানো নিয়ে শুধুই ফাঁকা বুলিতে দায় সারা হয়েছে। সাক্ষরতার হার বাড়াতে তেমন কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়নি। তবে সরকারি হিসাবে এখন সাক্ষরতার হার ৭৩.৯ শতাংশ। আর বেসরকারি হিসাবে এই হার প্রায় ৫৭ শতাংশ। ফলে কবে নাগাদ দেশ নিরক্ষরমুক্ত হতে পারে তা বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

২০৩০ সালের মধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে দেশ নিরক্ষরমুক্ত করতে হবে। কিন্তু যে হারে কাজ চলছে তাতে ওই সময়ের মধ্যেও দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করা সম্ভব নয় বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

আজ রবিবার আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘বহু ভাষায় সাক্ষরতা উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা’। দেশে এই দিনটি নানা জাঁকজমক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালন করা হলেও সারা বছর আর তেমন কোনো কর্মসূচি থাকে না। ফলে সাক্ষরতার হার তেমন বাড়ছে না।  

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের হিসাবে দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬৭ বছর পর্যন্ত সাক্ষরতার হার ৭৩.৩ শতাংশ এবং ৭ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত ৭৩.২ শতাংশ। গড় সাক্ষরতার হার ৭৩.৯ শতাংশ।

তবে বেসরকারি সংস্থা ‘গণসাক্ষরতা অভিযান’ ২০১৬ সালে সাক্ষরতার হার নিয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, সাক্ষরতার হার ৫১.৩ শতাংশ। তবে বর্তমানে এনজিওগুলোর কোনো জরিপ না থাকলেও বেসরকারি হিসাবে সাক্ষরতার হার প্রায় ৫৭ শতাংশ বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

সাক্ষরতার হার ও সংজ্ঞা নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। বিবিএস কোনো লোকের কাছে জানতে চায়, আপনি লিখতে পারেন কি না? তিনি বললেন, পারি। হয়তো তিনি স্বাক্ষর করতেও জানেন। কিন্তু তাঁকে যদি এক পৃষ্ঠা লিখতে দেওয়া হয় হয়তো পারবেন না। অথচ বিবিএস তাঁকেও সাক্ষরতার আওতায় নিয়ে আসে। আর বেসরকারি জরিপে একজন মানুষ লিখতে ও পড়তে পারে কি না তা যাচাই করা হয়। ফলে সরকারিভাবে সাক্ষরতার হার নিয়ে বিভ্রান্তি থেকেই যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংজ্ঞানুযায়ী, সাক্ষরতা হচ্ছে পড়া, অনুধাবন করা, মৌখিকভাবে এবং লেখার বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন করা এবং গণনা করার দক্ষতা। এটি একটি ধারাবাহিক শিখনপ্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজস্ব বলয় এবং বৃহত্তর সমাজের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য ক্ষমতা ও জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সাক্ষরতা বলতে লিখতে, পড়তে, গণনা করতে ও যোগাযোগ স্থাপন করার সক্ষমতাকে বোঝানো হয়। সাক্ষরতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের পঞ্চম শ্রেণি পাস করা শিক্ষার্থীর সমমানের হতে হবে বলে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, দেশে এখন জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৫৫ লাখ। এই সংখ্যা থেকে স্কুলে ভর্তির জন্য যারা এখনো উপযোগী নয় তাদের বাদ দিয়ে সরকারিভাবে এখন সোয়া তিন কোটি ও বেসরকারিভাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি লোক নিরক্ষর। আর এদের সাক্ষরতার আওতায় আনার ব্যাপারে গণসাক্ষরতা অভিযানের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাক্ষরতার ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হলেও তা বেশ ধীরগতিসম্পন্ন, বছরে মাত্র ০.৭ শতাংশ। অগ্রগতির হার পঠন ও লিখন দক্ষতার ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো হলেও গাণিতিক দক্ষতা এবং দক্ষতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা খুবই কম। সাক্ষরতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি যদি এই হারে চলতে থাকে তাহলে সাক্ষরতা দক্ষতার প্রাথমিক স্তরে পৌঁছতেই বাংলাদেশের সব নাগরিকের আরো ৪৪ বছর এবং অগ্রসর পর্যায়ে উন্নীত হতে ৭৮ বছর লাগবে।

গণসাক্ষরতার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০০২ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তকারীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই ছিল অসাক্ষর। ২০১৬ সালে এসেও এই অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষার বর্তমান মান নিয়ে জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশের প্রাথমিক পর্যায়ের সাক্ষরতা অর্জনের জন্য ছয় থেকে সাত বছরের বিদ্যালয় শিক্ষার প্রয়োজন। এবং তিন-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠীর অগ্রসর পর্যায়ে সাক্ষরতা অর্জনের জন্য ১০ বছরের বিদ্যালয় শিক্ষার প্রয়োজন।

সাক্ষরতার হার বাড়ানো নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ থাকলেও সরকার অনেকটাই নির্বিকার। সর্বশেষ ২০১৪ সালে সাক্ষরতা নিয়ে সব প্রকল্পই শেষ হয়। এরপর ওই বছরের শেষের দিকে ‘মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা)’ নামে নতুন একটি প্রকল্প শুরু হয়। যদিও এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। এ জন্য প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দক্ষতাকে বাদ দিয়ে ১৫-৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা প্রদানে শুধু ৪৫২ কোটি ৫৮ লাখ টাকার প্রকল্প পাস হয়। আর এই প্রকল্প ২০১৮ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ওই বছরের ডিসেম্বরে মূলত কাজ শুরু হয়। গত ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত একটি ছয় মাসের কোর্স শেষ হয়েছে। আগামী নভেম্বর থেকে পরবর্তী ছয় মাসের ব্যাচ শুরু হবে। এই কাজটি মূলত এনজিওদের দিয়ে করানো হচ্ছে। কিন্তু নামকরা এনজিওদের কাজ না দিয়ে ভুঁইফোড় ও কাগজে-কলমে নাম থাকা এনজিওদের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকল্পটি মূলত ব্যর্থ প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। এখন শুধু টাকা খরচের মহোৎসব চলছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভুলের ওপরই চলছে সাক্ষরতার প্রকল্প। কারণ ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী যেসব ব্যক্তি আছে তারা কোনো না কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন দিনমজুরি দিলেও কমপক্ষে ৫০০ টাকা আয় করে। তাহলে তারা কেন তাদের পেশা বাদ দিয়ে সাক্ষরজ্ঞান নিতে আসবে? যদি এই প্রকল্পের সঙ্গে দক্ষতার বিষয়টি যোগ থাকত তাহলে কেউ কেউ আগ্রহী হতো।

এ ছাড়া ২০১৭ সালে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন প্রকল্প’ চলছে। তাদের পাঁচ বছর মেয়াদি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আগামী বছরে আরো ৯ লাখ শিশুকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। তবে এখানেও সংশ্লিষ্টদের একই প্রশ্ন, যারা সরকারি স্কুলে যায় না, তারা কেন বিনা লাভে এই প্রকল্পে পড়তে আসবে? এখানে নাম লিপিবদ্ধের মাধ্যমে বেশির ভাগ কাজ চলছে।

তবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো সূত্র জানায়, শিগগিরই ‘নন-ফরমাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রগ্রাম’ নামে একটি প্রগ্রাম আসছে। সেখানে ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের শিক্ষা প্রদান করা যাবে। যাদের মধ্যে ১৫ লাখকে দক্ষতা ও ৫০ লাখকে বয়স্ক শিক্ষা দেওয়া হবে। এ ছাড়া এই প্রগ্রামের মাধ্যমে ঝরে যাওয়া আরো ১০ লাখ শিশুকে শিক্ষা প্রদান করা হবে। এ ছাড়া ৫০০ উপজেলায় ৫০০ আইসিটি বেজড কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার নির্মিত হবে। ৬৪ জেলায় ‘জীবিকায়ন দক্ষতা’ নামের একটি প্রকল্পও হাতে নেওয়া হচ্ছে।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে যে প্রকল্পগুলো চলছে সেগুলো আমরা কঠোরভাবে মনিটর করছি। আর নতুন প্রকল্পগুলো পাস হলে সাক্ষরতা কার্যক্রম আরো জোরদার হবে। আমরা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এমডিজির লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছি। আর ২০৩০ সালের মধ্যেই এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করতে পারব।’

তবে গত বৃহস্পতিবার সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন কিছুটা অসন্তোষই প্রকাশ করেন। গত এক বছরে সাক্ষরতার হার মাত্র ১ শতাংশ বাড়ায় তাঁর এই অসন্তোষ। তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি মানুষকে সাক্ষরতার আওতায় আনা হবে। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ নিরক্ষরকে অক্ষর জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে।’

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষানীতিতে জাতীয় সাক্ষরতা মূল্যায়ন কমিটি গঠন করার কথা ছিল। কিন্তু গত ১০ বছরেও সেটা হয়নি। আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। সাক্ষরতার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত দক্ষতাও দিতে হবে। এটাকে একটা সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা