kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ আষাঢ় ১৪২৭। ১৪ জুলাই ২০২০। ২২ জিলকদ ১৪৪১

ডেঙ্গুর চাপ সামলাতে অন্য রোগীদের সেবায় বিঘ্ন

তৌফিক মারুফ   

২৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডেঙ্গুর চাপ সামলাতে অন্য রোগীদের সেবায় বিঘ্ন

ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলের পাশে কাঁদছেন মা। ছবিটি গতকাল রাজধানীর মুগদা হাসপাতাল থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাইরের চেয়ে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ভিড় শুরু থেকেই বেশি। আবার তুলনামূলকভাবে চিকিৎসকও ঢাকায় বেশি। আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদেরও বেশির ভাগই ঢাকায়। তবু প্রতিটি হাসপাতালে হিমশিম অবস্থা। তবে শোচনীয় অবস্থা ঢাকার বাইরে। বিশেষ করে ঈদের পর থেকে ডেঙ্গু চিকিৎসা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো হাসপাতালে ঘাটতি মেটাতে অন্য বিভাগের চিকিৎসকদের মেডিসিন বিভাগে দায়িত্ব পালন করাতে গিয়ে অন্য রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসায়ও চরম ব্যাঘাত ঘটছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার বাইরে এবার সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা চলছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এখানে চিকিৎসক সংকট অন্য যেকোনো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চেয়ে বেশি। মোট ২২৪ জন চিকিৎসক পদের মধ্যে ১২৫টিই শূন্য। এর মধ্যে আবার ডেঙ্গু চিকিৎসার উপযোগী মেডিসিন বিভাগের চারজন অধ্যাপকের মধ্যে আছেন একজন। সঙ্গে আছেন চারজন সহযোগী অধ্যাপক এবং পাঁচজন সহকারী অধ্যাপক। আবার আটজন রেজিস্ট্রারের মধ্যে আছেন মাত্র দুজন। কনসালট্যান্ট, মেডিক্যাল অফিসারও কম। এমন পরিস্থিতি নিয়েই গতকাল সোমবার পর্যন্ত এখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৬৪০ জন রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। মাত্র ৭২ বেডের মেডিসিন ইউনিটে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ছিল ১৬৭ জন। এর মধ্যে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হন ৪৮ জন।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খুবই অসহায় অবস্থায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে চলেছি। প্রতিদিনই এই হাসপাতালে সব ইউনিটের ইনডোর মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার রোগী থাকে। এদের সেবা দিতে হচ্ছে মাত্র ৯৯ জন চিকিৎসককে। এ ক্ষেত্রে বড় ভরসা ইন্টার্নরা। আরেক সমস্যা হচ্ছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র না থাকা। প্লাটিলেট সেপারেটর মেশিন না থাকায় ওই কাজ করতে হচ্ছে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে।’ তিনি বলেন, ‘অন্য ইউনিটের চিকিৎসকদের ডেঙ্গুর চিকিৎসায় নিয়োজিত করতে গিয়ে অন্য বিভাগের রোগীদের সেবায় বিঘ্ন ঘটছে।’

অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা) ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী এমন সমস্যার কথা জানেন না। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন খোঁজখবর নিই তখন তো এত সমস্যার কথা কেউ আমাদের বলে না।’ তবে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘লাইন ডিরেক্টরের সঙ্গে বহুবার এসব বিষয়ে কথা হয়েছে। জরুরি দুটি মেশিন পাঠানোর জন্য বহুভাবে আবেদন নিবেদন করেছি। এরপর আর কিভাবে জানাতে হবে বুঝতে পারছি না।’

এক হাজার বেডের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও গতকাল সব ওয়ার্ড মিলিয়ে ভর্তীকৃত রোগী ছিল তিন হাজার ৫১২ জন। এর মধ্যে মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডে ৯৩ জন ছিল ডেঙ্গু রোগী। গতকাল সকাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় এখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ১১ জন। ওই হাসপাতালের উপপরিচালক লক্ষ্মী নারায়ণ মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জায়গা সংকুলান করা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। আর বিদ্যমান চিকিৎসক দিয়েই টেনেটুনে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’

ঢাকায় সুবিধা কিছুটা বেশি থাকলেও অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। মুগদা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আমিন আহম্মেদ খান বলেন, ‘এখানে ৬০ বেডের মেডিসিন বিভাগে আগেই প্রতিদিন রোগী থাকত প্রায় দেড় শ। আর ডেঙ্গু সমস্যা শুরুর পর এখন আরো শোচনীয়। গতকালও আমার এখানে মোট ২৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিল। এর মধ্যে ১৮৭ জন মেডিসিন ওয়ার্ডে আর বাকিরা শিশু ওয়ার্ডে। মেডিসিন বিভাগে সর্বমোট চিকিৎসক আছেন মাত্র ১৮ জন। আর শিশু ওয়ার্ডে সাত-আটজন। অবশ্য বিশেষ ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন চিকিৎসক এখানে দায়িত্ব পালন করছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সামগ্রিক সংকটের প্রভাব তো সব রোগীর ওপরই পড়ছে। তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি কমেছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন এক হাজার ২৫১ জন রোগী হাসপাতালগুলোয় ভর্তি হয়েছে। আগের দিন ভর্তি হয় এক হাজার ২৯৯ জন। এর মধ্যে ঢাকার ১২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে ৩৬৫ ও ২৯টি বেসরকারি হাসপাতালে ২১২ এবং ঢাকার বাইরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ৬৭৪ জন। আর ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে—ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭৭, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৮৮, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫৪, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫৬ এবং কুর্মিটোলা হাসপাতালে ২৪ জন।

১৭৩ জনের মৃত্যু তথ্য, আরো পাঁচ মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মৃত্যুর তথ্য আরো হালনাগাদ করা হয়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত মোট ১৭৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে অধিদপ্তরের আইইডিসিআর। আগের দিন ওই সংখ্যা ছিল ১৬৯। বেড়েছে পর্যালোচনার সংখ্যাও। মৃত আরো আটজনের তথ্য পর্যালোচনা করে আরো পাঁচজনের ডেঙ্গুতে মৃত্যু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আইইডিসিআর। ফলে গতকাল পর্যন্ত মৃত ১৭৩ জনের মধ্যে ৮৮ জনের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে ৫২ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হেনা বেগম (৪৫) নামে এক ডেঙ্গু রোগী মারা গেছেন। তিনি রাজধানীর শ্যামপুর পালপাড়া এলাকার মো. ফিরোজের স্ত্রী।

মৃতের ভাই সুমন বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে তাঁর বোন জ্বরে ভুগছিলেন। স্থানীয় হাসপাতালে পরীক্ষা করে স্বজনরা ডেঙ্গু নিশ্চিত হন। পরে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে গতকাল সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। বিকেলে হেনা মারা যান। এদিকে বেসরকারি তথ্য মতে, গতকাল ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরো চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা