kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে উভয়সংকটে বিএনপি

ড. কামালের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ

এনাম আবেদীন   

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে উভয়সংকটে বিএনপি

নির্বাচনের আগে গঠিত রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট টিকিয়ে রাখা হবে নাকি ভেঙে দেওয়া হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বিএনপি। ফলে ওই ফ্রন্টও গতিশীল হচ্ছে না, আবার ভেঙেও যাচ্ছে না।

বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গত বছর ১৩ অক্টোবর গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে পরে যোগ দেয় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গত ৮ জুলাই জোট ছেড়ে চলে যায়। দলটিকে জোটে রাখার চেষ্টাও করেনি বিএনপি।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক আদর্শ তথা নীতিগত কিছু বিষয়ে দ্বিমত হওয়ায় ফ্রন্টভুক্ত অন্য দলগুলোর সঙ্গেও বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় সবচেয়ে বেশি দূরত্ব তৈরি হয়েছে ফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে। এসব কারণে নির্বাচনের পরে আনুষ্ঠানিক ও অর্থবহ কোনো বৈঠকও হয়নি। তবে ফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বিএনপি। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের তথা উদারপন্থী বলে পরিচিত ওই দলগুলো বিএনপির কাছ থেকে চলে গেলে দুদিক থেকেই সরকারের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তাঁদের মতে, একদিকে ওই দলগুলো বিএনপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে; অন্যদিকে জামায়াতকে জড়িয়ে বিএনপিকে আবারও ‘জঙ্গিবাদী’ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করবে সরকার।

ঐক্যফ্রন্ট গঠনে নিয়ামক ভূমিকা পালনকারী বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভাষায়, ‘ঐক্যফ্রন্ট মৃত্যুবরণ করেনি। প্রাণহীন অবস্থায় টিকে আছে।’ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই প্রতিষ্ঠাতা আরো বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট থাকবে কি না এ সিদ্ধান্ত বিএনপিকেই নিতে হবে। তবে আমি মনে করি, রাজনৈতিক আদর্শ তথা অবস্থানগত কারণে বিএনপিরই ফ্রন্টকে বাঁচিয়ে রাখা উচিত।’ তাঁর মতে, শুধু জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে চললে বিএনপি ভুল করবে।

শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে ইমেজ বিল্ডিংয়ের জন্য ড. কামালসহ ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রয়োজন ছিল। এখনো হয়তো আছে। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে জোট গঠন করেও আজ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান সম্পর্কে ড. কামাল হোসেন কোনো ভালো কথা বলেননি। এমনকি খালেদা জিয়ার মুক্তির কথাও তাঁকে বলাতে হচ্ছে বলে-কয়ে।’ তিনি আরো বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনার বিষয়টিও তিনি এড়িয়ে গেছেন বলে শুনছি। তা ছাড়া তাঁকে সামনে রেখে আন্দোলন বা ভবিষ্যতে ভালো কিছু হবে—এমন সম্ভাবনাও এখন কম। ফলে ফ্রন্ট রক্ষা আপাতত বিএনপির জন্য উভয় সংকটে পরিণত হয়েছে।’ 

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা-পরবর্তী বিশ্বে উদ্ভূত নতুন মেরুকরণ বিএনপি বুঝতে সক্ষম হয়নি। হামলায় অভিযুক্ত আল-কায়েদা ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব অবস্থান নিলেও কার্যত ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলো তখন থেকে সারা বিশ্বে চাপের মুখে পড়ে। অথচ একই সময়ে জামায়াতসহ ইসলাম ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে বিএনপি সরকার গড়ে। ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে জামায়াতকে জড়িয়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচার জোরদার হলে বিএনপি কিছুটা ভাবমূর্তির সংকটে পড়ে। ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। পঁচাত্তর-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে উত্থান হওয়া বিএনপির আন্তর্জাতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনও ওই সময় হারায় দলটি। অন্যদিকে ক্ষমতায় থাকাকালে ঢাকায় তাইওয়ান সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে দলটি সমর্থন হারায় আরেক মিত্র চীনেরও। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রায় মিত্রহীন অবস্থায় ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট বিজয়ী হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতাদের বিচার শুরু হলে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে বিএনপি। এসব কারণে সর্বশেষ নির্বাচনে ‘উদারপন্থী’ দলগুলোকে কাছে টেনে ওই সংকট থেকে বেরোনোর চেষ্টা করে দলটি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা ওই দলগুলো আবার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আশায় বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির নিচে আশ্রয় নেয়।

তবে নির্বাচনী ফল অনুকূলে না আসার পাশাপাশি আদর্শগত তথা সাংগঠনিক লাভ-লোকসানের বিষয়টি নির্বাচনের পর দলগুলোর সামনে আসে। এমন পরিস্থিতিতেই বিএনপি ও গণফোরামের এমপিদের সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে জোট ছেড়ে চলে যায় কাদের সিদ্দিকীর দল। শরিক জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গেও এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়। দল দুটি এখনো ফ্রন্ট ছেড়ে যায়নি। তবে ক্ষোভ তাদের মধ্যেও আছে। এমপিদের সংসদে যোগদানে দল দুটির নেতারা মনে করেন, ৩০ ডিসেম্বর ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও আন্দোলন করার সুযোগ ছিল যা বিএনপি করেনি; পাশাপাশি ড. কামাল হোসেনও তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেননি।

অবশ্য গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বয়সের কারণে ড. কামাল হোসেন নির্বাচন করতে পারেননি।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচন করলে একটা কিছু হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি তো কখনো একক নেতৃত্বের কথা বলেননি। সব সময় বলেছেন যৌথ নেতৃত্বে সব কিছু হবে। কিন্তু নির্বাচনে বিপর্যয়ের কারণে এখন বিভিন্নভাবে দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। অথচ নির্বাচনে জয়লাভ করলে কাদের সিদ্দিকী ও বিএনপিসহ সবাই সুফলের অংশীদার হতো।’

এক প্রশ্নের জবাবে ঐক্যফ্রন্টের এই নেতা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই ড. কামাল হোসেন বারবার তাঁর কথা বলেন। এতে বিএনপির দোষ খোঁজা উচিত নয়। তা ছাড়া জিয়াউর রহমানের নাম যে একেবারে তিনি নেন না এ কথা ঠিক নয়। কারণ জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। খালেদা জিয়ার মুক্তিও কামাল হোসেন বেশ কয়েকবার চেয়েছেন।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বর্তমানে ঐক্যফ্রন্ট খুঁড়িয়ে চলছে। কিন্তু দৌড়াতে বা জোটকে গতিশীল করতে হলে সঠিক কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কী চায়। তবে আমি মনে করি, যে যে কারণে ঐক্যফ্রন্ট গড়ে উঠেছিল তার প্রয়োজনীয়তা এখনো আছে।’

জানা গেছে, বিএনপির মধ্যে দুই ধরনের ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। একদিকে তারা মনে করছে, ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর নেতাদের ইমেজ কাজে লাগানো জরুরি। অন্যদিকে ওই দলগুলোর কাছ থেকে সাংগঠনিক বা ভোটের রাজনীতিতে বড় ধরনের কিছু পাওয়ার নেই বলেও বিএনপির অনেকে মূল্যায়ন করছেন। অথচ নির্বাচনে তাদের অনেক আসন ছাড়তে হবে। গত নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টকে ছাড়তে হয়েছিল ২০টি আসন। তা ছাড়া ঐক্যফ্রন্ট রক্ষা করতে গিয়ে এরই মধ্যে ২০ দলীয় জোট ভাঙনের মুখে পড়েছে। তাই রাজনীতির লাভ-ক্ষতির হিসাবের মধ্যেই আটকে আছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য দাবি করেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও আছে, ২০ দলীয় জোটও টিকে আছে। কোনো জোটই ভাঙেনি। তাঁর মতে, ‘ভোটারবিহীন’ একটি নির্বাচনের পর শুধু রাজনৈতিক দল নয়, জনগণ পর্যন্ত স্তম্ভিত হয়ে গেছে। ফলে সব কিছু গুছিয়ে উঠতে সময় লাগছে। সময়মতো জোটকে গতিশীল করা হবে বলেও জানান তিনি।

সূত্র মতে, ড. কামাল হোসেনের ভূমিকার কারণে বিএনপির মধ্যেও কতগুলো প্রশ্ন সামনে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব দেওয়ার পরও নির্বাচনে তাঁর অংশ না নেওয়া রহস্যজনক। দ্বিতীয়ত, জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখানোর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান প্রদর্শনসহ রাজনৈতিক নীতিগত বিষয়ে দৃশ্যমান পৃথক অবস্থান তৈরি হয়েছে বলেও তাঁরা মনে করেন। গত ৩১ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের এক আলোচনাসভায় বঙ্গবন্ধুর নাম বললেও জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নাম না বলায় সভাস্থলেই বিক্ষোভ করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া অনুরোধ করা সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনার বিষয়টি ড. কামাল হোসেন এড়িয়ে গেছেন বলে বিএনপি মনে করে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ড. কামাল হোসেনকে সামনে নিয়ে আর কতটা এগোনো যাবে সে নিয়েও সাম্প্রতিককালে বিএনপির মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব কারণেই ফ্রন্টের বৈঠক করার আগ্রহ বিএনপি হারিয়ে ফেলছে।

অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনসহ ফ্রন্টের অন্য শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, বিএনপি এখন চলছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় এবং তিনি নিজেই জোট গতিশীল করার ব্যাপারে অনাগ্রহী। তা ছাড়া ওই নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ তারেকের নেতৃত্ব পছন্দও করেন না বলে ফ্রন্টের মধ্যে আলোচনা আছে। বিএনপি নেতাদের কাছে তথ্য আছে যে ড. কামাল হোসেন নির্বাচনের আগে ঘরোয়া আলোচনায় বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকেই যেখানে মানা কঠিন সেখানে তারেক রহমানকে মানা কিভাবে সম্ভব?’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা