kalerkantho

ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়

গণভবনে গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। ছবি : পিআইডি

ভারতের আসাম রাজ্যে চলমান ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) বা নাগরিক তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়াকে বরাবরই ওই দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখেছে বাংলাদেশ। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে, যারা আসামে নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হবে তারা বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী। আগামী ৩১ আগস্ট এনআরসি প্রকাশ হওয়ার কথা। আসামের প্রায় ৪০ লাখ বাসিন্দার ‘রাষ্ট্রহীন’ হওয়ার ঝুঁকিসহ নানা শঙ্কার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় স্পষ্ট বলেছেন, এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গতকাল বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যৌথ বৈঠক শেষে জয়শঙ্কর আরো বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের জন্য সত্যিকারের রোল মডেল হওয়া নিশ্চিত করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারতের অবস্থান ও অঙ্গীকারে পরিবর্তন হয়নি বলে উল্লেখ করেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টনে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা খুঁজে পেতে কাজ করতে এবং যেখানে সম্ভব সেখানেই শুরু করতে ভারত প্রস্তুত। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারত—তিন দেশেরই জাতীয় স্বার্থ।

অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বৈঠক নিয়ে সন্তোষ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আনন্দিত যে আমাদের আলোচনা ভালো হয়েছে। আমরা আগামী দিনগুলো আরো ভালো যাবে বলে আশা করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে আমাদের সম্পর্ককে অধিকতর উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। আমরা সেই প্রত্যাশায় আছি এবং আজকে যে আলোচনা হয়েছে আমরা তাতে খুব সন্তুষ্ট।’

জোরালো সম্পর্কের কথা জানানোই উদ্দেশ্য : ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর সফর অত্যন্ত উষ্ণ। খুব ভালো শুরু এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। কারণ এটি গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পর্ক। তিনি বলেন, ‘আমি এই সম্পর্ক নিয়ে আমাদের মনোভাব, সম্পর্কের অবস্থা ও প্রত্যাশা আপনাদের জানাতে চাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশে এটিই আমার প্রথম সফর। এই সফরের উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের অত্যন্ত জোরালো সম্পর্কের কথা জানানো এবং একই সঙ্গে এই শরতে আপনাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রস্তুতি নেওয়া এবং এই সম্পর্ককে আমরা কতটা গুরুত্ব দেই সে বিষয়ে প্রকাশ্যে বার্তা দেওয়া।’

সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় : ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ বা ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতির কথা উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, ‘আমরা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে মডেল সম্পর্ক হিসেবে দেখি। আমাদের মৈত্রী স্ট্র্যাটেজিক (সুদূরপ্রসারী সার্বিক লক্ষ্যমুখী) অংশীদারিতে রূপ নিয়েছে। আমরা বাংলাদেশের শীর্ষ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে সম্মানিত। বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে আমরা সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে আগ্রহী। এটি ভারতেরও স্বার্থ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আজ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দর্শন ও রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকার কারণে এটি সম্ভব হয়েছে।’ জয়শঙ্কর বলেন, আগে পররাষ্ট্রসচিব, এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে তিনি গর্বিত। এই দৃষ্টান্তমূলক সম্পর্ক আরো এগিয়ে নেওয়া নিশ্চিত করাই হবে তাঁর কাজ। 

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই অংশীদারি আরো বাড়ানো উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। আমরা বিশ্বাস করি, নিরাপত্তা ইস্যুতে অপরাধ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অংশীদারিত্বে দুই দেশ সরাসরি উপকৃত হচ্ছে।’ কানেক্টিভিটি ইস্যুতে তিনি বলেন, ‘আকাশ, সাগর, জলপথ ও সড়কপথে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ দুই দেশেরই প্রবৃদ্ধি ও আয় বৃদ্ধি করে। আমরা এই অংশীদারি জোরদার এবং সব সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে চাই।’

জয়শঙ্কর আরো বলেন, ‘জ্বালানি দুই দেশের অংশীদারির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। আমাদের একে অপরের সাফল্যে ভূমিকা আছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিসহ জ্বালানি ভাগাভাগির অনেক প্রকল্প নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। আমরা সেগুলো এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে এবং পরিপক্ব হচ্ছে। বাণিজ্য ইস্যুতে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক অংশীদারির পরবর্তী ধাপে যেতে চাই। বাংলাদেশের জন্য যে গতি সুবিধাজনক সে গতিতেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘পানি সম্পদও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি বণ্টনের জন্য উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা খুঁজে পেতে অগ্রসর হতে চাই। যেখানে সম্ভব সেখানেই শুরু করতে আমরা প্রস্তুত।’

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের অঙ্গীকার করেছিলেন। তবে ভারতে এখনো অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য সৃষ্টি না হওয়ায় ওই চুক্তি সই করা যায়নি। দীর্ঘ প্রায় আট বছর পর গত ৮ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ফেনী, ধরলা, দুধকুমার, মনু, খোয়াই, গোমতী ও মুহুরী—এই সাতটি নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সই করার লক্ষ্যে কাজ করতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। জেআরসির ওই বৈঠকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ওই নদীগুলোর তথ্য-উপাত্ত হালনাগাদ করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর করার কথা।

বাংলাদেশ ও ভারতে মানুষে মানুষে যোগাযোগ প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর বলেন, ‘বিশ্বে আজ আমাদের বৃহত্তম কনস্যুলার কার্যক্রম বাংলাদেশে। আমরা এ জন্য গর্বিত। আমরা বাংলাদেশি বন্ধুদের আমাদের দেশ ভ্রমণ যতটা সম্ভব নির্ঝঞ্ঝাট করতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন ইতিহাস আছে। আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী এবং আপনাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের অংশীদার হতে চাই।’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের আলোচনার অনেক বিষয় ছিল দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে। আমরা মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত লোকদের বিষয়েও আলোচনা করেছি। আমরা মনে করি, বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদ, দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারত—তিন দেশেরই জাতীয় স্বার্থ।’ তিনি বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা ব্যক্তিদের আরো সহযোগিতা দিতে এবং রাখাইনে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি উন্নয়নে আরো সহযোগিতা দিতে আমরা আমাদের প্রস্তুতি পুনর্ব্যক্ত করেছি। আপনারা সবাই জানেন যে আমরা রাখাইনে আড়াই শ বাড়ি নির্মাণ করে গত মাসে সেগুলো বুঝিয়ে দিয়েছি।’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বলেন, ‘‘প্রতিবেশীরা কী করতে পারে সে বিষয়ে উদাহরণ হয়ে আছে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারি। এটি দুই অংশীদারের একসঙ্গে করা কাজ। দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের জন্য এই অংশীদারি সত্যিকারের ‘রোল মডেল’ হওয়া নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।’’

মন্তব্য