kalerkantho

ডেঙ্গুমুক্ত থাকতে সতর্কতার সঙ্গে ঢাকা ছাড়ার পরামর্শ

২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ২৪২৮ জন, মারা গেছে চারজন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডেঙ্গুমুক্ত থাকতে সতর্কতার সঙ্গে ঢাকা ছাড়ার পরামর্শ

মায়ের কোলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১৩ মাস বয়সী আয়ান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে চলছে তার চিকিৎসা। ছবি : কালের কণ্ঠ

চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সাত দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত জুলাইয়ের এক মাসের সংখ্যাকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। জুলাই মাসে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল মোট ১৬ হাজার ২৫৩ জন। অন্যদিকে গত ১ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে গতকাল বুধবার (৭ আগস্ট) সকাল ৮টা পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ৮৭৯ জন। বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে যে হারে ভর্তির তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ওই সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ডেঙ্গুর এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঈদের ছুটিতে যারা ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলা বা উপজেলা কিংবা গ্রামের বাড়িতে যাবে তাদের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সতর্কতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসার জন্যও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও কর্মীদের। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৩৪০টি আইসিইউ বেড ও ৩৩৫টি ডায়ালিসিস ইউনিট চালু থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

মহামারি নয়, স্বাভাবিকও বলা যায় না : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারি নয়। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। তাতে পরিস্থিতি একেবারে স্বাভাবিকও বলা যায় না। সেদিকে নজর রেখেই আমরা বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। এ ক্ষেত্রে জেনারেল হাসপাতালগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালেও ডেঙ্গুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেক হাসপাতালে বেডের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, কিটের সংকট দূর করা হয়েছে।’ মন্ত্রী জানান, প্রতিদিন দুই লাখ উপকরণ আসছে। চিকিৎসক-নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সেমিনারে অংশ নিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, গত বছর এমন সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ১১ হাজার জন। আর এ বছর এ সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এটা নিয়ে উদ্বেগ তো থাকতেই পারে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আয়োজিত ‘ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে মন্ত্রী প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, বিএমএর সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মহাসচিব ইহতেশামুল হক চৌধুরী, সংগঠনের সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. সারফুদ্দিন আহম্মেদ, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. গোলাম নবী তুহিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক সেমিনারে মূলবক্তব্য উপস্থাপন করেন।

খোলা জায়গায় ক্যাম্পের প্রস্তুতি : মুগদা হাসপাতালের সেমিনারে দেওয়া বক্তৃতায় স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এই হাসপাতালে যেভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়ছে তাতে হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না হলে আমরা প্রয়োজনে বাইরে খোলা জায়গায় অস্থায়ী ক্যাম্প করে দেব।’

সারা দেশে নতুন ভর্তি হয়েছে ২৪২৮ জন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তারের দেওয়া তথ্য অনুসারে, গতকাল সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত দুই হাজার ৪২৮ জন। এর মধ্যে ঢাকার ৪০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ২৭৫ জন। সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৬২ জন। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য হাসপাতালের মধ্যে মিটফোর্ড হাসপাতালে ১৩৮ জন, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৩৯ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৯৭ জন, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ৪২ জন, কুর্মিটোলা হাসপাতালে ১১০ জন। আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে গতকাল নতুন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে এক হাজার ১৫৩ জন।

গত ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় ৩২ হাজার ৩৪০ জন। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৬১০ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। বাকি আট হাজার ৭০৭ জন বিভিন্ন হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিল। আর সরকারি হিসাবে গতকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ২৩, যাদের সবার মৃত্যু ঢাকায় হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরো চারজনের মৃত্যু : গতকাল ডেঙ্গু আক্রান্ত আরো চারজন মারা গেছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনজন। তাঁরা হলেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেন (২৫), শরীয়তপুরের আমেনা বেগম (৬০) ও কুমিল্লার লাকসামের আছিয়া বেগম (৩৯)। আরেকজন মারা গেছেন বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে। তাঁর নাম মেহেদী হাসান (২৩)। তিনি তিতুমীর কলেজের ছাত্র।

ঈদে ঢাকার বাইরে যাওয়া মানুষের জন্য পরামর্শ : গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আয়োজিত এক সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে, ঈদের ছুটিতে যারা ঢাকা ছেড়ে বিভিন্ন জেলা বা গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাবে তাদের জন্য কিছু করণীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব পরামর্শের মধ্যে রয়েছে বাড়ি, অফিসসহ সব প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টয়লেটের হাই ও লো কমোড ঢেকে দিয়ে যেতে হবে, রেফ্রিজারেটরের ট্রের পানি ফেলে শুকিয়ে রেখে যেতে হবে, এয়ারকন্ডিশনারের পাইপের পানিসহ যেকোনো পানি পরিষ্কার করে রেখে যেতে হবে, বালতি, বদনা, হাঁড়ি-পাতিল, ড্রাম, গামলা, ঘটি-বাটি ইত্যাদির পানি ফেলে পরিষ্কার করে উল্টিয়ে রেখে যেতে হবে, বারান্দা ও বাসার ছাদের ওপর রাখা ফুলের টবের ট্রের পানি ফেলে পরিষ্কার করে উল্টিয়ে রেখে যেতে হবে, পানির ট্যাংকের ঢাকনা বন্ধ করে রেখে যেতে হবে।

এ ছাড়া ঈদের ছুটিতে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের হেল্প ডেস্ক খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঈদের দিন কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রভাইডাররা (সিএইচসিপি) অন-কলে চিকিৎসাকাজে দায়িত্বরত থাকবেন। স্থানীয় কোনো রোগীর যেকোনো সমস্যায় সিএইচসিপিদের মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং চালু থাকবে। বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সহযোগিতায় ২৬টি জেলার সিভিল সার্জন ও সংশ্লিষ্ট আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও), মেডিসিন ও শিশু বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণে ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তা ছাড়া রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৩৪০টি আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) বেড ও ৩৩৫টি ডায়ালিসিস ইউনিট চালু আছে। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও এই সেবা চালু আছে। অন্যদিকে সব বিমানবন্দর, স্থলবন্দর, নৌ ও সমুদ্রবন্দরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ সতর্কতামূলক প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এ সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনাসহ অন্যরা আলোচনা করেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা