kalerkantho

বিশেষজ্ঞ মত

অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অধিক সাবধান থাকতে হবে

ডা. সামিনা চৌধুরী

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অধিক সাবধান থাকতে হবে

বাংলাদেশের রাজধানী এখন ডেঙ্গুতে ভুগছে। গর্ভবতী মায়েরাও আক্রান্ত। অন্য সময় এ জ্বরে আক্রান্ত হওয়া এবং গর্ভকালীন অবস্থায় আক্রান্ত হওয়ার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। কারণ সে শরীরের অভ্যন্তরে বহন করে চলেছে ছোট্ট এক মানবশিশু। কাজেই  ঝুঁকিটা থাকে দুজনেরই।

প্রথমে শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের ওপর প্রদাহ তৈরি করে। কাজেই জ্বর এসে যায় এবং শরীরে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। যখন এই ভাইরাসটি রক্তনালি, কিডনি, লিভার এবং রোগ প্রতিরোধের সিস্টেমকে আঘাত করে তখন মারাত্মক আকার ধারণ করে। রক্তনালিতে যখন আঘাত হানে তখন রক্তনালির ভেতরে থাকা রক্তের পানি জাতীয় তরলটি রক্তনালির বাইরে চলে আসে। রোগীর শরীরে তখন রক্তচাপ কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে শরীরের সবচেয়ে প্রধান অঙ্গগুলোই (যেমন—ফুসফুস, মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি) শুধু নয়, সারা শরীরেই রক্ত চলাচল কমে যায়। তখনই বিপর্যয় শুরু হয়ে যায়। লিভারের প্রদাহের কারণে লিভার থেকে যেসব উপাদান রক্ত জমাট বাঁধার কাজে সাহায্য করে সেই সব প্রোটিনের ঘাটতি পড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে ঘাটতি পড়ে যায় প্লাটিলেটের। এ সবকিছুর কারণে রোগীর নাড়ির গতি দ্রুত ও দুর্বল হয় এবং রক্তচাপ কমে যায়। রোগীর রক্তক্ষরণ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। রক্তনালি থেকে বের হওয়া প্লাজমা বা জলীয় অংশ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে পেটে ও ফুসফুসে জমে যায়। রক্তের চাপ আরো কমতে থাকলে শরীরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কার্যকারিতা হারাতে থাকে। রোগী মারাত্মক অসুস্থ হয়ে যায়। প্রস্রাবও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

গর্ভাবস্থায় এসব অবস্থাই হতে পারে। এমনকি গর্ভের শিশুটিও ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়। অনেক সময় গর্ভেই শিশুটি মরে যেতে পারে।

গর্ভকালীন অবস্থায়ও এই উপসর্গগুলো হতে পারে। গর্ভকালীন অবস্থায় প্রথম দিকে আক্রান্ত হলে গর্ভপাত, পরে অপরিণত বয়সের শিশুর জন্ম, মৃত শিশু এবং পূর্ণ সময়ের আগেই প্রসব ব্যথা উঠতে পারে। গর্ভফুলের পেছনে রক্তক্ষরণ হতে পারে। তখন পরিস্থিতি খুব জটিল হয়ে যায়।

প্রায় ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে যখন প্রবল আকার ধারণ করে তখন পেটে ও ফুসফুসে, মস্তিষ্কে, বিভিন্ন অঙ্গে পানি জমে যায়, রক্তচাপ কমে যায় এবং হৃত্স্পন্দন খুব দুর্বল ও দ্রুত হয়, যাকে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বলা হয়। রোগীর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়, মৃত্যুর আশঙ্কা বেড়ে যায়। কাজেই সেই সময়ে হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয় যদি গর্ভবতী মহিলা গর্ভাবস্থার শেষের দিকে আক্রান্ত হয়। তখন অনেক সময় প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এ ছাড়া এই ভাইরাস মা থেকে শিশুর মধ্যে চলে যেতে পারে এবং আক্রান্ত নবজাতকের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশ হতে থাকে। শিশুটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতে হয়।

করণীয় : প্রথমত, জ্বরের মাত্রা নামিয়ে রাখতে হবে। সে জন্য প্যারাসিটামল বড়ি সেবন করতে হবে। কুসুম গরম পানিতে গা মুছতে হবে বা গোসল করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার বারবার খেতে হবে। স্যালাইন পানি, ডাবের পানি, স্যুপ, ডালের পানি, ফলের রস, লেবুর শরবত পান করতে হবে এবং সহজপাচ্য নরম খাবার খেতে হবে। তৃতীয়ত, রোগীকে বেশির ভাগ সময় বিশ্রামে থাকতে হবে।

ডেঙ্গু হলে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ও ননস্টেরয়েডাল প্রদাহপ্রশমী সেবন করা যাবে না।

পেটে বেশি ব্যথা, ঘন ঘন বমি, লিভার বড় হয়ে যাওয়া, পেশিতে রক্তক্ষরণ হওয়া, অণুচক্রিকা কমে যাওয়া (চিকিৎসকের পরামর্শে থাকা দরকার), দুর্বলতা, ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, অস্থিরতা—এই ধরনের যেকোনো চিহ্ন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

ল্যাবরেটরি পরীক্ষা : কমপ্লিট ব্লাড কাউন্টে (সিবিসি) হিমাটোক্রিক ও প্লাটিলেট কাউন্ট, এন এস ওয়ান অ্যান্টিজেন পরীক্ষা জ্বর হওয়ার দু-তিন দিনের মধ্যে করতে হবে। ডেঙ্গু অ্যান্টিবডি পাঁচ-সাত দিন পার হলে করতে হবে। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনে লিভার ফাংশন টেস্ট, সিরাম অ্যালবুমিন; ইলেকট্রোলাইট, কোয়াগুলেশন প্রফাইল, বুকের এক্স-রে, পেটের আল্ট্রাসাউন্ড ও অন্যান্য পরীক্ষা করতে হবে।

মূল বার্তা : গর্ভকালে ডেঙ্গু হলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করা উচিত। প্রবলভাবে আক্রান্ত সময়ে প্রসব ব্যথা ত্বরান্বিত করা বা সিজারিয়ান ডেলিভারি না করাই ভালো। সন্তান প্রসব অবশ্যই হাসপাতালে করাতে হবে, যেখানে রক্তক্ষরণ বা অণুচক্রিকা সঞ্চালন এবং দক্ষ চিকিৎসক আছেন। সন্তান প্রসবের সময় রক্তের অণুচক্রিকা দেওয়া প্রয়োজন এবং রক্তসঞ্চালন, ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা তৈরি রাখতে হবে, কারণ যেকোনো সময় এর প্রয়োজন হতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, সভাপতি-ওজিএসবি

 

 

মন্তব্য