kalerkantho

বিবিসি বাংলাকে প্রধানমন্ত্রী

ডেঙ্গুর বিষয়ে সচেতন হতে হবে সবাইকে

► কারো ঘরে বা আঙিনায় মশার লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানা
► হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি শ্রেণি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডেঙ্গুর বিষয়ে সচেতন হতে হবে সবাইকে

 

ডেঙ্গু রোগের বিষয়ে দেশের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, যার যার নিজের ঘরবাড়ি, বাসস্থান ও এর আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। শুধু ঢাকায়ই নয়, সারা দেশে পরিচ্ছন্নতার একটা অভিযান সরকার শুরু করে দিয়েছে। কারো ঘরের কাছে বা ঘরে যদি পানি জমে থাকে, যেখানে মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে, তা দেখতে পেলে তাদের জরিমানা করা হবে।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে লন্ডন সফররত শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। গতকাল মঙ্গলবার বিবিসির মানসী বড়ুয়াকে দেওয়া সাক্ষাত্কারটি প্রচার করা হয়। সাক্ষাত্কারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছাড়াও গণতন্ত্র, গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন, পদ্মা সেতুতে কাটা মাথা সংক্রান্ত গুজব, দেশের অর্থনীতির অবস্থাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন।

ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার বিস্তার রোধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। সিটি করপোরেশনগুলো এডিস মশা সম্পর্কে একেবারেই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বা মশা নিয়ন্ত্রণকে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য করে সময়মতো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে এমন অভিযোগ মানতে রাজি নন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, সংবাদমাধ্যমে ডেঙ্গুবিষয়ক খবর অনেক বেশি প্রকাশিত হচ্ছে; এর ফলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে, আর সেটাই সমস্যা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘একটু উচ্চবিত্ত যারা, সেসব জায়গাগুলোতেই এডিস মশার প্রকোপ বেশি। আমাদের সব সময় লক্ষ থাকে বস্তি এলাকা, ড্রেন এসব জায়গার দিকে। মশা মারা কিন্তু নিয়মিত একটা ব্যাপার।’

শুধু সিটি করপোরেশনকে দোষ না দিয়ে সব মানুষকে সতর্কতা অবলম্বন করতে আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। মশার ওষুধ কেনায় দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তাও তিনি নাকচ করে দিয়েছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘মশার ওষুধ কেনার ব্যাপারে টেন্ডার করা হয়। যারা টেন্ডারে উপযুক্ত হয়, তারা কিনে নিয়ে আসে এবং সেগুলো ব্যবহারও হয়। তবে কোন ওষুধ এডিস মশার ওপর কাজ করে, সে ব্যাপারে বিভক্তিকরণ করা হয়নি বা সে ধরনের সতর্কতা ছিল না।’

ভবিষ্যতে মশা নিয়ন্ত্রণ কিভাবে সুষ্ঠুভাবে করা যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে আহ্বান জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক দল, সরকারি কর্মচারী ও দেশের মানুষকে নিয়ে সারা দেশেই পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করা হয়েছে। সারা বছর ধরেই এটা অব্যাহত রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারো ঘরের কাছে বা ঘরে কোথাও যদি পানি জমা থাকে এবং যেখানে মশার লার্ভা তৈরি হয়, তবে তাদের জরিমানা করা হবে। মানুষ যদি আগামীর জন্য প্রস্তুত থাকে, তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি হবে না বলে মনে করেন তিনি।

পদ্মা সেতুতে মানুষের কাটা মাথা লাগার গুজব এবং এর জেরে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে বেশ কজন মানুষের মৃত্যু বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি জানান, যারা গুজব ছড়াচ্ছে, এ রকম কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে শুরু থেকেই একটা চক্রান্ত ছিল বলেও মন্তব্য করে তিনি বলেন, কারা, কী উদ্দেশ্যে এ অপপ্রচার চালাচ্ছে, তা বের করতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও অমানবিক কায়দায় অত্যাচারের গুরুতর অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এক শ্রেণির মানুষ হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এরা সেই মানুষ যারা সারাক্ষণ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আমাদের পেছনে লেগেই আছে।’

হেফাজতে নির্যাতন বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ কী—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এমন মানসিকতা আমাদের নেই এবং আমরা সেটি করি না। ঘটনাচক্রে কিছু ঘটতে পারে। বরং আপনি যদি গত দশ বছরে আমাদের অবস্থান দেখেন, আমরা কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, ‘আপনি আমার নিজের কথাই চিন্তা করেন, যখন আমি আমার বাবা-মা সবাইকে হারালাম, গুলি করে মারা হলো, কই আমি তো বিচার পাইনি। খুনিদের বিচার না করে তাদের ইনডেমনিটি দেওয়া হলো। অর্থাত্ অপরাধকে প্রশ্রয় দিলেন। উল্টো তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে দেশে অপরাধকে স্বীকৃতি দিয়েই একটা সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, সেই দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। হেফাজতে মানুষ হত্যা করার সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী আমার দলের নেতাকর্মীরা।’ নির্যাতনের সংস্কৃতি বন্ধে কী করা হচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। এখন ঠিক ওইভাবে হেফাজতে মৃত্যু হয় না। নির্যাতনও সেভাবে করা হয় না।’

তবে আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহে কিছু নিয়ম রয়েছে এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর বাইরে কিছু করা হয় না। আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।

শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনার পর থেকে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, অসাংবিধানিক সরকারের সময় যারা বেশি সুযোগ ভোগ করেছে বা ক্ষমতাটা যারা উপভোগ করেছে, তারা কখনোই চায়নি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকুক।

তিনি বলেন, ‘একটা শ্রেণি হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের মধ্যে কিছু আছে যারা অসাংবিধানিক সরকার, জরুরি অবস্থা অথবা মার্শাল ল বা মিলিটারি রুলার এলে তাদের খুব দাম বাড়ে। কাজেই তারা সারাক্ষণ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আমাদের পেছনে লেগেই আছে।’

যেসব দেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ তাদের একটি, কিন্তু এর সুফল সব পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই পৌঁছাচ্ছে। সেভাবেই আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। ২০০৫ বা ২০০৬ সালের দিকে আমাদের দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশের ওপরে ছিল। আজকে সেটা ২১.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। মাত্র ১০ বছরের মধ্যে আমরা সেটা অর্জন করতে পেরেছি। মানুষের মাথাপিছু আয় যেখানে ৪০০-৫০০ মার্কিন ডলার ছিল, আজকে সেখানে প্রায় দুই হাজার মার্কিন ডলারে উঠে এসেছে। প্রবৃদ্ধি আমরা এখন ৮.১ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছি।’

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন বেশ নাজুক অবস্থায় আছে এবং ঋণখেলাপিরা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে তা আর ফেরত দিচ্ছে না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যতটা প্রচার হয় বিষয়টা ততটা না। ঋণ নিয়ে সেটা ফেরত না দেওয়া—এই কালচারটাও আমাদের এখানে শুরু হয় মিলিটারি ডিক্টেটরদের আমলে। আমরা যখন ক্ষমতায় এসেছি আমরা চেষ্টা করেছি, আমরা অনেক টাকা উদ্ধার করেছি। তার পরও কিছু মানুষের প্রবণতা থাকে যে টাকা নিলে মনে হয় সেটি আর ফেরত দিতে হবে না।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মান ও এর চর্চা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে এখন ৪৪টি প্রাইভেট টেলিভিশন আছে এবং তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। স্বাধীনতা না থাকলে তারা আমার বিরুদ্ধে বা সরকারের বিরুদ্ধে এত অপপ্রচার করছে কিভাবে।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোট পড়েছে এবং এ নিয়ে যে সমালোচনা রয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা এখন কোনো কেন্দ্রে গোনার দিক থেকে হয়তো পেয়েছে। কোনো কেন্দ্রে হয়তো হতে পারে। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের ট্রাইব্যুনাল আছে সেখানে মামলা করতে পারে, কোর্টে মামলা করতে পারে। নির্বাচন কমিশনেও মামলা করতে পারে। তারা তদন্ত করে দেখছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ যদি সত্যিই ভোট দিতে না পারত, তাহলে তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষ আন্দোলনে নামত এবং আমরা ক্ষমতায় থাকতে পারতাম না।’

 

মন্তব্য