kalerkantho

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পথের সন্ধানে

ঢাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ, দিচ্ছেন নানা পরামর্শ

তৌফিক মারুফ   

৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পথের সন্ধানে

শিশুপুত্র জ্বরে আক্রান্ত। তাকে নিয়ে ঢাকার শিশু হাসপাতালে আসেন মা-বাবা। একপর্যায়ে তাঁরা ছেলের মাথায় পানি ঢালেন। ছবি : লুৎফর রহমান

দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধের পথ খুঁজতে খুঁজতেই এর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। এখনো ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিধনে কার্যকর কোনো ওষুধের নাগাল পায়নি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবে আগের ওষুধ বা কীটনাশক কার্যকর না থাকা কিংবা নতুন ওষুধ কবে আসছে, না আসছে, তা নিয়ে চলছে তোলপাড় অবস্থা। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে একের পর এক তাগিদ দেওয়ার পরও এর দ্রুত কোনো সমাধানের পথ এখনো মেলেনি। তবে এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিদেশ থেকে আনা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন কীটতত্ত্ববিদকে; যিনি ঢাকায় এসেই প্রতিদিন দৌড়ঝাঁপ এবং একের পর এক সভা-বৈঠক করছেন, যেখানে তিনি নিজের কিছু তত্ত্ব তুলে ধরছেন বারবার। আর ওই তত্ত্ব আর তথ্য-উপাত্ত থেকে পরিষ্কারভাবে বেরিয়ে এসেছে—ঢাকার দুই সিটি যে ওষুধ এত দিন ব্যবহার করেছে বা এখনো নতুন করে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা ডেঙ্গু প্রতিরোধে খুব একটা কার্যকর হবে না, বরং এডিস মশা নিধনে বাসস্থান বা প্রতিষ্ঠানকেই নিজ নিজ ব্যবস্থাপনা দাঁড় করাতে হবে, যা হবে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব আঞ্চলিক দপ্তরের সিনিয়র কীটতত্ত্ববিদ ড. বি এন নাগপাল তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও চিন্তা এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটির মেয়র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মূলত সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকারের কাজ। যেহেতু এই মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে জনস্বাস্থ্যকে বিপদের মুখে ফেলেছে, তাই আমরা সিটি করপোরেশনসহ সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এবং নতুন কিছু দিকনির্দেশনা দিতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন গবেষককে নিয়ে এসেছি। ওই গবেষকের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে আমরা কাউকে বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে হেয়, তাদের প্রতি বিতর্কের উদ্রেক ঘটাতে চাই না, বরং চলমান সংকট বা সমস্যা থেকে উত্তরণে নতুন কোনো পন্থা কাজে লাগাতে চাই। আশা করি, নাগপালের পরামর্শ আমাদের সবাইকে নতুনভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’

বি এন নাগপাল তাঁর সায়েন্টিফিক পেপারে উল্লেখ করেছেন, এডিস মশা কখনোই কোনো ড্রেন, নালা-নর্দমা, মুক্ত জলাশয়, নদী-পুকুর- খালের পানিতে হয় না বা থাকে না। এই মশার মূল প্রজননক্ষেত্র স্বল্প পরিমাণের স্বচ্ছ পানির যে পাত্র, চৌবাচ্চা, নির্মাণাধীন অবকাঠামোর বিভিন্ন স্থান বা উপকরণ, বাড়ির বাগান কিংবা বারান্দা অথবা ঘরের ভেতরে যেকোনো ধরনের পানির পরিকাঠামোতে। এমনকি খাবার পানির গ্লাসের কোনো কোনো অংশেও এডিস মশার ডিম থাকতে পারে সহজেই। আবার পানির কাছাকাছি থেকেই পানির স্পর্শে না এসে প্রায় এক বছর সুপ্ত থাকতে পারে এডিস মশার ডিম। আর কোনোভাবে ডিম পানির স্পর্শে এলেই তা ফুটে লার্ভায় পরিণত হবে দু-তিন দিনের মধ্যে। লার্ভা চার-পাঁচ দিনের মধ্যে পরিণত হবে পিউপায় আর পিউপা দু-এক দিনের মধ্যেই বড় মশায় রূপ নেবে। এ ক্ষেত্রে একটি নারী এডিস মশা চার থেকে ছয় সপ্তাহ এবং পুরুষ এডিস মশা সাত থেকে ১০ দিন বেঁচে থাকতে পারে। একটি নারী মশা উপযুক্ত পরিবেশে এক সঙ্গে ৬০ থেকে ১০০টি ডিম ছাড়তে পারে।

ড. বি এন নাগপালের মতে, এডিস মশা ঘরে-বাইরে আলোতে বা রোদে কিংবা খোলামেলা জায়গায় থাকতে পারে না। এগুলো শুধুই ঘরের ভেতরে অন্ধকার জায়গায় কিংবা বিভিন্ন আসবাবপত্রের নিচে বা ঝুলিয়ে রাখা কাপড়ের সঙ্গে লুকিয়ে থাকে। নারী এডিস মশা সেখান থেকে মানুষের নাগাল পেলেই কামড় বসিয়ে দিয়ে রক্ত খায়। পুরুষ এডিস মশা রক্ত খায় না। ফলে এডিস নিধনে বাইরে খোলা জায়গায়, মাঠে-ঘাটে, সড়কে ওষুধ ছিটিয়ে কোনো লাভ নেই; বরং ওই ওষুধ শুধু কিউলেক্স মশা নিধনে কাজে আসতে পারে, তা-ও বেশি মাত্রায় প্রয়োগে পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনার আশঙ্কা থাকে। তাঁর মতে, ফগার মেশিনের ধোঁয়ায় মশা দূর হতে পারে, তবে এডিস মশা নয়।

তিনি জানান, এডিসের আরেক জাত অ্যালবোপিকটাস ঘন বনেও থাকতে পারে, যদিও বাংলাদেশে এই জাতের এডিস মশার অস্তিত্ব আছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

নাগপাল অবশ্য ঘরোয়া ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি টেমোফস (জেনেরিক) নামের একটি লার্ভিসাইড কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন; যে ওষুধ লিকুইড আকারে ভোরে ছিটিয়ে দিতে হয়। গতকাল সোমবারও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক বিশেষ ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, টেমোফস হতে পারে বড় এডিস মশা নিধনের কার্যকর একটি উপায়, যা সাধারণত পরিবেশ-প্রতিবেশের তেমন ক্ষতি করে না; যদিও ঢাকায় বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই লার্ভা নিধনে এই টেমোফস প্রয়োগ করা হচ্ছে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। কিন্তু পরিমাণে খুবই কম হওয়ায় তাতে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান অন্য বিশেষজ্ঞরা।

নাগপালের সঙ্গে একমত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাগপালের কথাই ঠিক। আমরা তো এই কথা আরো আগে থেকেই বলে আসছিলাম। কিন্তু আমাদের কথা তো দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে কানে নেওয়া হয়নি বলেই আজ এমন দুর্দশায় পড়তে হয়েছে।’

তিনি বলেন, এই টাকা খরচ করে এত মশার ওষুধ আনা হচ্ছে, তাতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে খুব বড় কোনো ইতিবাচক কাজ হবে না, যতক্ষণ না লার্ভা ধ্বংস করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশে এডিস অ্যালবোপিকটাস আছে কি না জানতে চাইলে এই কীটতত্ত্ববিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এমন কোনো সার্ভে নেই, তবে থাকলে সুন্দরবন এলাকায় এটি থাকা অস্বাভাবিক নয়; যদিও ওই জাতের মশা থেকে সাধারণ ইয়েলো ফিভারের ঝুঁকি বেশি।’

মন্তব্য