kalerkantho

এবার ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এক শর বেশি দেশে

প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের তাগিদ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এখনো বিপজ্জনক পর্যায়ে যায়নি

তৌফিক মারুফ   

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের তাগিদ

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ পর্যায়ে। যেকোনো বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু আরো প্রাণঘাতী। এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ গবেষণার কথা শোনা গেলেও তা প্রাথমিক পর্যায়েই আছে। এই মুহূর্তে এশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ মিলিয়ে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের কথা জানা গেছে। এর মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারের দিক থেকে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি চলছে ব্রাজিল ও ফিলিপাইনে।

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা, চিকিৎসা—ডেঙ্গু আক্রান্ত দেশগুলোতে এমন প্রতিকারের উদ্যোগের খবরই মিলছে। সরকারও ব্যস্ত ডেঙ্গু প্রতিরোধের কাজে। এর মধ্যে কম্বোডিয়াসহ কয়েকটি দেশে এরই মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক জরুরি অবস্থাও জারি করা হয়েছে। এসব দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও খুব একটা আলাদা কিছু নেই ডেঙ্গু রোগের ক্ষেত্রে। শুধু ছোটখাটো কিছু প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনায় নতুনত্বের খবর মিলছে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো থেকে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও নজরদারি রয়েছে তাদের কাঠামোর মধ্য থেকেই। যদিও সেই কাঠামো অনুসারে দেশে দেশে ডেঙ্গুর এমন পরিস্থিতিতে উচ্চতর বিপদের আশঙ্কার কথা এখনো বলছে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আক্রান্ত দেশগুলার অভিজ্ঞতা বা তাদের গবেষণার ফল পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় এবং যৌথ উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন।

জানতে চাইলে রোগবিজ্ঞানী ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অন্যতম উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাবলিক হেলথ রেগুলেশন অনুসারে এখন চারটি রোগের ক্ষেত্রে বেশি নজরদারি রাখা হয়। বিশেষ করে স্মলপক্স, পোলিও, সার্স ও নতুন ধরনের যেকোনো ইনফ্লুয়েঞ্জার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে কোনো রোগ এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে ট্রেড বা ট্রাভেলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় কি না সেটাও বিবেচনায় রাখা হয়। এ ছাড়া সাধারণত যে রোগ মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় সেই রোগের ভয়াবহতা ও ব্যাপ্তি যখন বেশি হয় তখনই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। যেমন এবোলা কিংবা পোলিওর ক্ষেত্রে রয়েছে। কিন্তু ডেঙ্গু এখন বিশ্বব্যাপী থাকলেও তা প্রতিরোধের উপায় রয়েছে। এ ছাড়া এ রোগ মানুষবাহিতও নয়।

অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সিস অব ইন্টারন্যাশাল কনসার্নের (পিএইচইআইসি) প্রটোকল অনুসারে চারটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরির আওতায় পড়ে না ডেঙ্গু। ফলে বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকলেও তা পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সিস অব ইন্টারন্যাশাল কনসার্নের আওতায় আসেনি। একই কারণে এটাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি পরিস্থিতিও ঘোষণা করেনি কোনো দেশের জন্যই। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সব সময়ই সব রাষ্ট্রকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সার্বিক সহায়তা দিয়ে আসছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন যৌক্তিকভাবেই। সতর্কতার সঙ্গে মানুষের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। তাই বলে এমন অবস্থা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশও ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা যেমন অন্য দেশগুলোর ব্যবস্থাপনা কেমন সেটা পর্যবেক্ষণ করছি অন্য অনেক দেশই কিন্তু আমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার তথ্য অনুসারে, এ বছর শুরু থেকেই মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, এমনকি ফ্রান্সের একটি রাজ্যেও মৃতের সংখ্যা উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিডিসি আটলান্টাসহ আরো একাধিক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ডেঙ্গু নিয়ে বিশ্বজুড়ে এমন অবস্থা চললেও অন্য অনেক রোগের মতো ডেঙ্গু গুরুত্ব পায়নি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল ফোকাসের জায়গায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুধু ভেক্টর বর্ণ ডিজিজের আওতায় ডেঙ্গুকে তুলে ধরেছে অনেকটা সাধারণ ক্যাটাগরির রোগ হিসেবেই। যদিও সংস্থাটি ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ ও নিয়ন্ত্রণে গাইডলাইন করে নিজ নিজ রাষ্ট্রকে নিজেদের মতো করে ব্যবস্থাপনায় নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে ডেঙ্গুর অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব থাকার কারণেই বাংলাদেশের মতো কোনো রাষ্ট্র আগেভাগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে অনেকটা ঢিমেতালে চালায় কাজ।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোস্যাল মেডিসিনের (নিপসম) সাবেক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গুর বাহক মশার উপদ্রব বৃদ্ধির পেছনে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ট্রপিক্যাল অঞ্চলে এর প্রভাব খুবই বেশি।  তিনি বলেন, শুধু দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলই নয়, এবার ইউরোপের কয়েকটি দেশেও ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবারের মতো এত ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু আগে দেখা যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নত কিছু দেশে কারিগরিগত কিছু ব্যবধান ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কাঠামো একই ধরনের। তবে এবার যেহেতু আমাদের দেশে পরিস্থিতি অনেকটা ভিন্ন, ডেঙ্গুর ধরনেও পরিবর্তন এসেছে, তাই আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আরো কিছু আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংস্থা থেকে পরামর্শ নিচ্ছি নিয়মিত। পর্যবেক্ষণ চলছে নিবিড়ভাবে। আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কেন্দ্রীয় দপ্তরের একাধিক বিশেষজ্ঞ ঢাকায় নিয়ে এসেছি, যাঁরা কয়েক দিন ধরেই দেশে অবস্থান করছেন এবং বিভিন্নভাবে তাঁদের সহযোগিতা দিচ্ছেন।’ তিনি ডেঙ্গুকে বৈশ্বিক সংকট উল্লেখ করে আক্রান্ত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও সাফল্য বিনিময়ের ওপর জোর দেন।

মন্তব্য