kalerkantho

মাঠে নামতে হবে জনগণকেও

ডেঙ্গু নিয়ে নাগরিক প্রতিক্রিয়া

নওশাদ জামিল   

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাঠে নামতে হবে জনগণকেও

সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। এ নিয়ে আতঙ্ক, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা সর্বত্র। প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে মানুষ। হাসপাতালগুলোও জায়গা দিতে পারছে না ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের। এ অবস্থায় ডেঙ্গুর বিস্তারকে ‘মহামারি’ ও ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে অভিহিত করে এই ঘাতক মশা মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। তাঁরা বলেছেন, ‘এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশনকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের সফল হতেই হবে।’

কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক ও জনপ্রতিনিধি গতকাল বৃহস্পতিবার এমন অভিমত ব্যক্তি করেন। তাঁরা বলেন, এবার ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা আগে থেকেই উচ্চারিত হচ্ছিল। কিন্তু তা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যথাযথ পূর্ব প্রস্তুতি নেননি। এ ক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার কথা বার বার উচ্চারিত হচ্ছে।

ডেঙ্গর বিস্তার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিশিষ্ট নাগরিকরা বলেন, ঢাকা শহরজুড়ে নিত্যদিন খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে রাখা নির্মাণসামগ্রী ও খোঁড়া গর্তে জমে থাকা পানিতে বাসা বাঁধছে এডিস মশা। বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রজনন। অথচ সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং নেই। এ কাজে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার ঘাটতি কাম্য নয়।

প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে : অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ডেঙ্গু শুধু ঢাকা শহর নয়, সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। পত্র-পত্রিকায় খবর পড়ছি, প্রতিটি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এটি খুবই উদ্বেগজনক। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে অনেকে মারা গেছে। দিন দিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। যাদের স্বজন মারা গেছে তারাই শুধু আপনজন হারানোর বেদনা বুঝতে পারছে। যাদের স্বজনরা ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করছে তারাও বুঝতে পারছে। আমি আশা করব, সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এখনই ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে জরুরি পদক্ষেপ নেবে।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কের পাশাপাশি গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। আতঙ্ক ও গুজব পরিহার করে প্রতিটি নাগরিককে সচেতন হতে হবে। এডিস মশার নিয়ন্ত্রণে ও ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। নিজের বসতবাড়ি প্রতিদিনই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব জায়গায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণ-তরুণীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে এলে দ্রুতই ডেঙ্গু মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

ডেঙ্গুর বিস্তার জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে : আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডেঙ্গুর বিস্তার আমাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা যেমন উদ্বিগ্ন, জনগণও তেমনই আতঙ্কগ্রস্ত। এ অবস্থায় সবারই সচেতন হওয়া জরুরি। ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে।’

দীর্ঘদিন পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আলোকিত মানুষ গড়ার এই কারিগর বলেন, ‘আমাদের অনেকের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে। খাওয়া শেষে বোতলটা ছুঁড়ে ফেলি রাস্তায়। ডাব খেয়ে খোসাটা ফেলে রাখি নর্দমায়। রাজধানী ঢাকার ড্রেন ও নালা-নর্দমা পরিষ্কার নেই। ঝোপঝাড় পরিষ্কার নেই। অলিগলি ও রাস্তার খানাখন্দগুলো অপরিষ্কার। আর তাতে পানি জমে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে।’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, সিটি করপোরেশন যদি আগে থেকে প্রস্তুতি নিত এবং মশা নিধনের ব্যবস্থা করত তাহলে অবস্থা এতটা জটিল হতো না। জনগণ তো আর ড্রেন ও নালা-নর্দমা পরিষ্কার করবে না। সে দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। নাগরিকের দায়িত্ব তার বসতবাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখা। তিনি বলেন, ‘তরুণ-তরুণীরা যেকোনো দুর্যোগ-সমস্যায় এগিয়ে আসে। আমরা আশা করি, ডেঙ্গুু মহামারি মোকাবেলায়ও তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে।’

নগরকর্তাদের উদাসীনতা মানুষকে ক্ষুব্ধ করছে : সাবিনা ইয়াসমিন

বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘জনগণ ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কে আছে এটা মিথ্যা নয়। ডেঙ্গু যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে তা-ও মিথ্যা নয়। প্রতিদিন পত্রিকা ও টেলিভিশনের খবরে যা শুনছি, যা দেখছি—আমি খুবই আতঙ্ক বোধ করছি। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে ও মশা নিয়ন্ত্রণে এখনই জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।’

সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, সবাই বলাবলি করছে যে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ার এই সময়ে নগরের কর্তা ব্যক্তিদের কর্তব্যে উদাসীনতা ও দায়িত্বহীন কথাবার্তা মানুষকে ক্ষুব্ধ করছে।

ডেঙ্গু বিস্তার রোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় ডাক্তাররা যেভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তার প্রশংসা করি। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জোরালো উদ্যোগটা নিতে হবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। নিজের বসতবাড়ি নিজেকেই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। শুধু বাসাবাড়ি নয়; অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করতে হবে।

নড়াইলে ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসার দায়িত্ব আমার : এমপি মাশরাফি

সংসদ সদস্য ও জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা নড়াইলে ডেঙ্গু আক্রান্ত সবার চিকিৎসার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গোটা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা সবাই স্বজন-প্রিয়জনকে নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। এ অবস্থায় একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আমি ঘোষণা দিচ্ছি যে আমার নির্বাচনী এলাকা অর্থাৎ নড়াইল সদর ও লোহাগড়ায় সব হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দায়িত্ব আমার।’

নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেও জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন মাশরাফি। সবাইকে নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার জনগণের পাশে থাকা আমার দায়িত্ব। আমি সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

জনগণের সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যেতে হবে। সবাই একযোগে মাঠে নামলে ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমরা জয়ী হব।’

 

মন্তব্য