kalerkantho

ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্য রোগ

সমন্বিত চিকিৎসায় তালগোল!

তৌফিক মারুফ   

৩০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সমন্বিত চিকিৎসায় তালগোল!

৫২ বছর বয়সী আজমল হোসেনকে নিয়ে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফটকে এসে নামেন ছেলে রুহেল হোসেন। রুহেল বলেন, ‘আব্বুর পাঁচ দিন ধরে জ্বর, সঙ্গে গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। বমিও হয়েছে। আবার বুকেও ব্যথা আছে। সকালের দিকে একবার অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জ্বরের দ্বিতীয় দিন ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়েছি সাভারের একটি ক্লিনিকে; কিন্তু রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। আজ সকালে আবার পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু রিপোর্ট পজিটিভ আসে। তাই হাসপাতালে নিয়ে এলাম।’

মোহাম্মদপুরের শেখের টেক এলাকার রনিকে (১৭) নিয়ে তার মা বসেছিলেন একই হাসপাতালের করিডরে (রোগী বেশি, তাই ঠাঁই হয়েছে করিডরেই)। চার দিন ধরে তাদের কাটছে এখানে। মা শিউলি বেগম বলেন, ‘প্রথম তো শুধু ডেঙ্গু ধরা পড়ছিল; কিন্তু এখন তো আবার ডাক্তাররা বলছেন টাইফয়েডও হইছে। ছেলেটার অবস্থা তো খারাপের দিকেই।’

গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে চার বছরের আনিকাকে নিয়ে আসেন তার মা-বাবা। ভালুকার ডাক্তাররা পরীক্ষা করে শিশুটির শরীরে ডেঙ্গুর সঙ্গে নিউমোনিয়াও শনাক্ত করেছেন। এরপরই তাকে রেফার করা হয়েছে ঢাকায়। আনিকার বাবা সোলায়মান বলেন, ‘জ্বর অইছিল পরে ঘন ঘন শরবত আর পানি খাওয়াইতাম। ডাক্তার কইছুইন বেশি পানি খাওয়াইছুন দেইখ্যা শরীরে পানি জইম্যা নিউমোনিয়ায় ধরছে।’

শুধু এ কয়েকজনই নয়, এবার ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের অনেকেরই একই সঙ্গে অন্য রোগও আছে। ফলে তাদের জটিলতা ও কষ্ট যেমন বেশি, তেমনি তাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষায়িত চিকিৎসার জায়গায় এক ধরনের সমন্বয়হীনতার প্রশ্ন তুলেছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, এবার যেহেতু ডেঙ্গুর গতি-প্রকৃতি ও পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্নতর তাই শুধু ডেঙ্গুর দিকেই নজর না রেখে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সমন্বিত চিকিৎসার ওপরও অধিক গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এ ছাড়া কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেন, যেহতু এডিস মশা থেকে ডেঙ্গু ছাড়া আরো কয়েকটি রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, এর মধ্যে বাংলাদেশেও আগে এমন কোনো কোনো রোগ দেখা গেছে, সেদিকেও নজর রাখা দরকার। বিশেষ করে জিকা-ইয়োলো ফিবার এনসেফালাইটিসের দিকেও খেয়াল রাখা উচিত। কিন্তু হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর এক ধরনের ঢল নামায় এসব সমন্বিত চিকিৎসা নিয়ে চলছে তালগোল অবস্থা। ফলে জটিল রোগীদের ঝুঁকি আরো বাড়ছে।

জানতে চাইলে রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এবার সত্যিই পরিস্থিতি জটিল। বিশেষ করে অনেকের প্লাটিলেট না কমলেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার নজির পাওয়া যাচ্ছে। আবার এক দিনের জ্বরেই রোগী কোমায় চলে যাওয়ার ঘটনাও দেখছি। এমনকি সেরোটাইপ-১ থেকেও রোগীর পরিণতি সেরোটাইপ-৩-এর মতো হয়ে যাচ্ছে। আবার কারো মধ্যে শুরুতেই সেরোটাইপ-৩ দেখা দিচ্ছে। এ ছাড়া ডেঙ্গুর নতুন বিপদ হিসেবে মায়োকার্ডিটিস নিয়ে বড় করে ভাবনার প্রয়োজন আছে। এর এত সব জটিল পরিস্থিতি কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া ম্যানেজ করা খুবই কঠিন। কারণ এগুলো ধরতে পারা, সেই অনুযায়ী সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া অপেক্ষাকৃত নবীন বা উপযুক্ত পর্যায়ের প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের ছাড়া সম্ভব নয়।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, যেকোনো ভাইরাসেই মায়োকার্ডিটিসের ঝুঁকি থাকে। আর ডেঙ্গু রোগীদের মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। এ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কারো যদি রক্তচাপ অস্বাভাবিক কমে যায়, হার্টের পাম্প কম অনুভূত হয়, তবে সেটিকে মায়োকার্ডিটিসের লক্ষণ বলেই মনে করতে হবে। এ ছাড়া আগে থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত বা রিং পরানো কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি অব্যশই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরার্মশ নেওয়া জরুরি। নয়তো শুধু ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেওয়া হলে যেকোনো বিপদ ঘটার ঝুঁকি থাকে। এ ক্ষেত্রে যে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হবে, সেখানকার কর্তৃপক্ষ বা চিকিৎসকদের উচিত হবে দ্রুত সমন্বিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সফি আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঙ্গু হলে শরবত-জুস-পানি বেশি খাওয়ানোর কথা শুনে অনেকেই না বুঝে শিশুদের অতিমাত্রায় বিভিন্ন পানীয় পান করায়, এতে অনেক শিশুর ঠাণ্ডা লেগে একপর্যায়ে তা নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে। আমরা এমন রোগী পাচ্ছি।’

অন্যদিকে গতকাল জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে বসে গাজীপুর সদরের আলতাফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড় ভাইয়ের আগে থেকেই যক্ষ্মা আছিল। এর মধ্যে আবার ডেঙ্গুতে ধরছে। এখন দুইটা মিল্ল্যা জটিলতা আরো বাড়ছে। গাজীপুরের ডাক্তাররা এখানে পাঠাইয়া দিছে চিকিৎসার জন্য। এখন দেখি ডাক্তাররা কী করেন।’

জানতে চাইলে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (যক্ষ্মা) অধ্যাপক ডা. শামিউল ইসলাম সাদী বলেন, যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই খুব নাজুক থাকে। তার ওপর ডেঙ্গু হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতেই পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের চিকিৎসার জন্য স্বাভাবিক ডেঙ্গুর ব্যবস্থাপনার বাইরেও বাড়তি চিকিৎসা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে।

রোগতত্ত্ববিদ ড. মাহামুদুর রহমান পরামর্শ দিয়ে বলেন, এবার যত ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে বা নিচ্ছে, তাদের প্রফাইলিং বা সার্ভেইল্যান্সের আওতায় আনতে পারলে ভালো ডকুমেন্টেশন হয়ে উঠত। এতে ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে আর কী কী নতুন উপসর্গ বা জটিলতা দেখা দিয়েছে, সেটা বেরিয়ে আসত। পাশাপাশি সমাধানে নতুন কোনো পথ বেরিয়ে আসতে সহায়কও হতে পারে এটি। যদিও সরকারের এবারকার গাইডলাইন অনেক ভালো একটি ব্যাপার হয়েছে। এখন সেটি সবাই ফলো করছে কি না, সেটাই দেখার ব্যাপার।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এবারের ডেঙ্গুর ধরনে পরিবর্তন দেখেই আগের গাইডলাইন আপডেট করেছি। তা সবার কাছে পাঠিয়েছি। এর আগে থেকেই চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সব হাসপাতালে চিঠি দিয়ে, বৈঠক করে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সমন্বয়হীনতার সুযোগ থাকার কথা নয়।’

এদিকে অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, চার ধরনের (সেরোটাইপের) ডেঙ্গু (ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪) নিয়ে আরো বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি হয়ে উঠেছে। সে অনুসারে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় নজর দেওয়া দরকার। নয়তো জটিলতা যেমন বাড়বে, তেমনি জটিল রোগীদের বিপদের ঝুঁকি আরো বাড়বে।

২৯ দিনে ১১ হাজার ৪৫০ জন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুসারে, গতকাল সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৯৬ জন। চলতি জুলাই মাসের গত ২৯ দিনে ভর্তি হয়েছে ১১ হাজার ৪৫০ জন এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় ১৩ হাজার ৬৩৭ জন। এর মধ্যে ৯ হাজার ৭৮২ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। বাকি তিন হাজার ৭৪৮ জন বিভিন্ন হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিল।

গতকাল ঢাকার ১৩টি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ২৬৫ জন। অন্যদিকে ৮৫৬ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার ছয়টি সরকারি ও দুটি সমিতিভুক্ত হাসপাতালে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা মেডিক্যালে ১২৫ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ১১৩ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৮ জন, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬০ জন, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ২১ জন, কুর্মিটোলা হাসপাতালে ৭৯ জন উল্লেখযোগ্য। আর ঢাকার বাইরের ৫০ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে গতকাল নতুন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ২৪০ জন আর পুরনো মিলে মোট ভর্তি আছে ৫৩১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘ঢাকার বাইরে দ্রুত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তাই আমরা এখন ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও একইভাবে সর্তকতা, সচেতনতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার দিকে নজর রাখছি।’

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহের মধ্যে প্রথম দুই দিন ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার যা ছিল, সেই তুলনায় গত তিন দিনে ধারাবাহিকভাবেই লাফিয়ে তা বাড়ছে। অর্থাৎ গত ২৪ জুলাই হাসপাতালে ভর্তীকৃত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৮০১ জনে ছিল, পরদিন তা নেমে যায় ৬৯৬ জনে, এর পরদিন নেমে যায় ৬৪৬ জনে; কিন্তু এরপর গত তিন দিনে পর্যায়ক্রমে ৮৪৫, ৯৩৯ হয়ে গতকাল তা আগের যেকোনো এক দিনে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সব রেকর্ড ছাড়িয়ে উঠে গেছে এক হাজার ৯৬ জনে।

মন্তব্য