kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

চুক্তি করেও অরক্ষিত শ্রমিক

হায়দার আলী, মালয়েশিয়া থেকে ফিরে   

২৪ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



চুক্তি করেও অরক্ষিত শ্রমিক

মালয়েশিয়ার মাটিতে গত বছরের ৩ অক্টোবর পা রাখতে না রাখতেই শোনা গেল এক ‘গরম’ খবর। টিয়ং টট নামে এক প্রিন্টিং কারখানায় চলছে শ্রমিক অসন্তোষ। আর সেটা বাংলাদেশি শ্রমিক অধ্যুষিত কারখানা। ওই দিন দুপুরে কুয়ালালামপুরের মসজিদ ইন্ডিয়া এলাকার ডাব্লিউ হোটেলে বসে স্থানীয় সাংবাদিক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ গৌতম রায় বললেন, ‘চলেন ভাই, এখানকার যুবলীগ নেতা ব্রাউন সোহেলের কাছে যাই; তাহলেই সব জানতে পারবেন।’

এই ব্রাউন সোহেল হলেন আশফাকুল ইসলাম সোহেল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের ছেলে। ১৯৯৬ সালে কুয়ালালামপুরে এসে মালয়েশীয় মেয়ে বিয়ে করে সে দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে এখানেই বসবাস করছেন। পেশায় ফার্নিচার ব্যবসায়ী সোহেল পারিবারিক নেশায় পড়ে বিদেশবিভুঁইয়ে রাজনীতি করলেও শ্রমিকদরদি হিসেবে পরিচিত তিনি। তাই তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে বিবাহসূত্রে মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী শ্রমিকদরদি সাংবাদিক গৌতমের। বিকেলেই গৌতমের সঙ্গে রওনা হই বুকিত বিনতাং এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে। সেখানে বসে ব্রাউন সোহেলের কাছে জানা গেল বিস্তারিত। ঘটনাটা সংক্ষেপে দাঁড়ায়—টিয়ং টটে পুরনো পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি শ্রমিকের সঙ্গে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে যাওয়া আরো ১৪৯ জন শ্রমিক যুক্ত হয়েছে ৮-১০ মাস হলো। কিন্তু তারা কেউ চুক্তি অনুযায়ী বেতন পাচ্ছে না। বেতনের এক হাজার এবং ওভারটাইমের ৪০০-৫০০ রিঙ্গিত থেকে থাকা, ঋণ, লেভি, ইউটিলিটি ইত্যাদি খাতের নাম করে কেটে রেখে মাস শেষে ৮০০-৯০০ রিঙ্গিত করে দেওয়া হচ্ছে শ্রমিকদের। অথচ চুক্তিতে লেভি বা ভিসা নবায়নের ফি দেওয়ার কথা কম্পানির। আর ঋণ বলে কিছু না থাকলেও সেটা চাপিয়ে দিয়ে টাকা কাটা হচ্ছে। ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট কাজ বন্ধ রেখে এসবের প্রতিবাদ জানায় শ্রমিকরা। সেখানে কর্মরত খালাতো ভাইয়ের কাছে ঘটনা জানতে পেরে ব্রাউন সোহেল জানান বাংলাদেশ হাইকমিশনে। বারবার জানিয়েও কোনো সাড়া না পেয়ে ইফতেখারুল আলম নামে এক শ্রমিক ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেন। তখন টনক নড়ে হাইকমিশনের। ঘটনাস্থলে দৌড়ান লেবার উইংয়ের কর্মকর্তা সিলভি সুগুমারান ও মো. মুকসেদ আলী। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা না বলে ভালো-মন্দ খেয়েদেয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে দহরম-মহরম করে চলে আসেন। পরে মালিকপক্ষ ওই দিনই ছয় শ্রমিককে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। বুঝতে পেরে চারজন পালিয়ে যায়। বাকি দুজনকে পাওনা বেতন-ভাতা না দিয়েই দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সেটাও চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এভাবে মালয়েশিয়ার মাটিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে পদে পদে চুক্তি লঙ্ঘন করে শোষণের নানা ঘটনা শুনে পরদিনই রওনা হই সেলাংগর শহরে টিয়ং টট করখানায়। অনেক চেষ্টা করে ভেতরে ঢুকতে না পারলেও বোঝা গেল, কারখানার পরিস্থিতি থমথমে। সময় নষ্ট না করে গেলাম শ্রমিক ডরমিটরিতে। কিন্তু ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ তারা, যদি দেশে পাঠিয়ে দেয়! এখানে ৪০-৪৫ মিনিট থেকে, শ্রমিকদের মানবেতর জীবনের চিত্র দেখে ছুটলাম পালিয়ে যাওয়া চার শ্রমিকের খোঁজে। ফোনে যোগাযোগ করে কাজাং শহরে পাওয়া গেল দুজনকে—ইফতেখারুল আলম ও এস এম মনির। মুখ শুকিয়ে কাঠ হওয়ার জোগাড় তাঁদের। কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে জানালেন তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা আর প্রতিবাদ করার করুণ পরিণতির সেই ঘটনা। ইফতেখার বললেন, ‘চুক্তিতে কর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থা মালিকপক্ষের করার কথা থাকলেও চারজন ধারণক্ষমতার একেকটি রুমে ১৬ থেকে ২০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে কয়েদিদের মতো। তার ওপর মাস শেষে বেতন থেকে আবাসন বাবদ টাকা কেটে রাখা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে তামিল নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে নির্যাতন চালানো হয়।’

কর্মীদের বেতনের রসিদগুলোতেই ফুটে আছে কম্পানি কর্তৃপক্ষের চুক্তি লঙ্ঘনের ভয়ংকর চিত্র। নরসিংদীর সদর উপজেলার নোয়াপাড়া ভগিরতপুর গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে এস এম মনির দেশে থাকতে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। সুদর্শন ছেলেটি লেখাপড়া ফেলে সচ্ছল জীবনের আশায় পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। ক্যাথারসিস রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে টিয়ং টট প্রিন্টিং কারখানায় চাকরি নিয়ে আসেন। এস এম মনিরের সঙ্গে চুক্তিপত্রে কম্পানির পক্ষে স্বাক্ষর করেন নিয়োগকর্তা টেং জোক হং; কম্পানির এনআরআইসি নম্বর-৬৪০৭১০০১৫৯০৮; ঠিকানা-লোট ২০২০৮ বাটু ৭৩/৪, জালান কাপার, কেলাং ৪২১০০, কেলাং সেলাংগর। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে এস এম মনিরের দৈনিক ৩৮.৪৬ রিঙ্গিত করে মজুরি হিসেবে বেতন এসেছিল ৯৬১.৩০ রিঙ্গিত। ওভারটাইম হয়েছিল ৫৪০.৮৪ রিঙ্গিত। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অতিরিক্ত কাজ করায় আরো পেয়েছিলেন ৮৬.৫৪ রিঙ্গিত। ওই মাসে মোট এক হাজার ৫৮৮.৮৮ রিঙ্গিত বেতন পাওয়ার কথা মনিরের, যা বাংলাদেশি টাকায় ৩৩ হাজারেরও বেশি। কিন্তু নানা ছুতায় টাকা কাটায় কম্পানি থেকে মনির পেয়েছেন এক হাজার ১৮৮.৮৮ রিঙ্গিত, যা বাংলাদেশি ২৪ হাজার ৯০০ টাকার মতো। মনিরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া বেতনের রসিদ থেকে দেখা যায়, ঋণ দেখিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে ৩০০ রিঙ্গিত, বাংলাদেশি টাকায় যা ছয় হাজার ৩০০ টাকা। আর ইউটিলিটি চার্জ ৫০ ও লজিং চার্জ ৫০ রিঙ্গিত কেটে রাখা হয়েছে।

এস এম মনির বললেন, ‘কম্পানি থেকে এক টাকাও ঋণ নিইনি, কিন্তু বেতন থেকে মাসে মাসে টাকা কাটা হয়েছে। চুক্তিতে থাকার খরচ কম্পানির নামে থাকলেও প্রতি মাসে ৫০ রিঙ্গিত করে কেটে নেয়।’

টিয়ং টটের এফ০৪৬৩ নম্বরের কর্মী আব্দুল মান্নানের ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসের বেতন রসিদে দেখা যায়, ২৫ দিনের দৈনিক বেসিক ৯৬১.৫০ রিঙ্গিত+৭৫ ঘণ্টা ওভারটাইমের ৫৪০.৮৪ রিঙ্গিত—মোট ১৫০২.৩৪ রিঙ্গিত বেতন-ভাতা পাওয়ার কথা। কিন্তু লোন ৩০০ রিঙ্গিত, লজিং ৫০ ও ইউটিলিটি ৫০ রিঙ্গিত দেখিয়ে তাঁর বেতন থেকে কেটে রাখা হয়েছে ৪০০ রিঙ্গিত। অর্থাৎ ওই মাসে মান্নান বেতন পেয়েছেন ১১০২.৩৪ রিঙ্গিত। একইভাবে ওই তিন খাতে ৪০০ রিঙ্গিত কেটে নিয়ে ওই কম্পানির এফ০৪৩৫ নম্বরের কর্মী হোসেন মোহাম্মদ আলমগীরকে ওই মাসের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে ১১৮৮.৮৮ রিঙ্গিত।

অথচ মনির, মান্নান, আলমগীর—তিন শ্রমিকের সঙ্গে টিয়ং টটের করা চুক্তির কোনোটিতেই ওই তিন খাতের খরচ কর্মীর কাছ থেকে নেওয়ার কথা লেখা নেই। বরং বলা আছে, ওই সব খরচ মালিকপক্ষ বহন করবে। আবার মান্নানের রসিদে ২৬টির জায়গায় ২৫টি বেসিকের বিষয়ে জানা যায়, অসুস্থতার কারণে এক দিন অনুপস্থিত থেকে পরদিন এসে নিয়মমাফিক ছুটির দরখাস্ত দিলেও তাঁর এক দিনের বেসিক কেটে রাখা হয়, যা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আর আলমগীরের রসিদে রবিবারের ১২ ঘণ্টা ওভারটাইম ভাতার হিসাব করা হয়েছে বেসিকের দেড় গুণ ধরে। কিন্তু চুক্তি ঘেঁটে দেখা যায়, সাপ্তাহিক ছুটির দিন ওভারটাইম পাওনা হওয়ার কথা বেসিকের দুই গুণ হিসাবে।

এভাবে টিয়ং টটের ১১ জন শ্রমিকের বেতনের রসিদ ঘেঁটে দেখা যায়, চুক্তির বরখেলাপ করে নানা ছুতায় টাকা কেটে পাওনা মজুরির অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ কর্মীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হয়।

আরেক শ্রমিক সাইফুল ইসলাম বললেন, ‘প্রথম মাসের বেতনের রসিদ দেখে সুপারভাইজারকে জানানোর পরও কোনো প্রতিকার পাইনি। পরের মাসে বেতন কম দেওয়ায় দল বেঁধে আমরা ম্যানেজারকে জানাই; তিনিও কোনো সমাধান দেননি। নিরুপায় হয়ে সবাই কাজ বন্ধ করে দিই। কিন্তু সমাধান তো হয়ইনি, উল্টো অনেকের শাস্তি হয়েছে।’

আনোয়ার হোসেন নামের একজন শ্রমিক বলেন, ‘হাইকমিশনের লোকজন আমাদের কথা না শুনে কম্পানির লোকদের সঙ্গে ভূরিভোজ করেন আর আমাদের বলেন, মুখ বুজে কাজ করতে, নইলে দেশে চলে যেতে হবে।’

কম্পানিস কমিশন অব মালয়েশিয়ার ওয়েবসাইটে দেখা যায়, টিয়ং টটের নিবন্ধন নম্বর ০০০৮০৬৭১৫৩৯২। এটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তান জক হং, মহাব্যবস্থাপক নিকশন আউ ইয়ং ও বিপণন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক আনসন আউ ইয়ং। এখানে অফসেট ডিসপেনসার, কার্টন ইত্যাদি তৈরি হয় বলা আছে।

কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে মালয়েশিয়াকিনি টিয়ং টট কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রশ্ন পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা কোনো সাড়া দেয়নি।

চুংগাই লালং পেটানি এলাকার ‘মেডিক্যাল রাবার প্রডাক্ট এসডিএন বিএইচডি’র শ্রমিক মো. হাফিজউদ্দিন প্রতিদিন ৯ ঘণ্টা কাজ করলেও কোনো ওভারটাইম ভাতা পান না। মিরাজুল ইসলাম নামে আরেক শ্রমিক বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে অফিস করে ছুটি পাই ৬টায়। প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে বেশি কাজ করালেও বেতন পাই সেই এক হাজার রিঙ্গিত। দুজনেরই বেতনের রসিদে তাদের কথার প্রমাণ মেলে।

দেশে ফিরে রামরুর চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকীকে কয়েকটি চুক্তিপত্র দেখাই এবং শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা জানাই। কিছু পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, হাইকমিশনের কর্মকর্তারা পারত চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিতে, শ্রম আদালতে মামলায় সহযোগিতা করতে কিংবা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের সহযোগিতা নিতে। চুক্তির শর্ত মানানোর ক্ষেত্রেও হাইকমিশন উদ্যোগী হতে পারে।

হাইকমিশনের কর্মকর্তা মো. মুকসেদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘টিয়ং টটে শ্রমিক ধর্মঘটের খবর পেয়ে আমরা সরেজমিন তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারি, কারখানায় কাজ করা অবস্থায় মোবাইলে কথা বলা, সিগারেট খাওয়া, কম্পানির দেওয়া জুতা না পরায় অনেক শ্রমিকের বেতন থেকে টাকা কাটা হয়েছিল।’ কিন্তু জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে যাওয়া প্রতিটি শ্রমিকের কাছ থেকেই নানা খাতে কেন চুক্তি ভেঙে টাকা কাটা হয়?—প্রশ্ন করলে জবাবে তিনি বলেন, ‘কম্পানিতে কাজ করলে তো কম্পানির আইন মেনে চলতে হবে। ওদের আইন ভেঙেছে বলেই ছয়জনকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কম্পানি।’

চুক্তিপত্রে বলা আছে, শুধু ফৌজদারি অপরাধ করলেই শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারবে ন্যায্য পাওনা মিটিয়ে। মোবাইলে কথা বলা আর কম্পানির জুতা পরে অফিস না করা কি ফৌজদারি অপরাধ?’

এমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মুকসেদ আলী বলেন, ‘দেখুন, ওদের দেশের আইন না মানলে তো ওরা ব্যবস্থা নেবেই। সবাইকে তো আর দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়নি।’

‘এই কম্পানি থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং দেশে ফেরত পাঠানো শ্রমিকদের অভিযোগ, আপনারা শ্রমিকদের স্বার্থ না দেখে, শ্রমিকদের সঙ্গে কথা না বলে কম্পানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ নিয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে ভূরিভোজ করে চলে এসেছেন...।’

এবার হাইকমিশন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা মিথ্যা অভিযোগ। আমরা ওদের সঙ্গেও কথা বলেছিলাম।’

১০ দিনের মালয়েশিয়া সফরে যে ৭৮ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩৮ শতাংশ শ্রমিকই চুক্তি অনুযায়ী বেতন-ভাতা পায় না। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ—২৮ জনই বলেছে, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা চুক্তির ২০ ধারার ১ উপধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই উপধারায় বলা আছে, ‘নিয়োগকর্তা কর্মীর পাসপোর্ট নিজের হেফাজতে রাখতে পারবেন না।’ পরের উপধারাতেই বলা আছে, কর্মী সব সময় পাসপোর্ট নিজের সঙ্গে রাখবে। যদি কোনো কারণে পাসপোর্ট হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে কর্মী নিজ খরচে তা আবার করে নেবে। চুক্তির ২০ ধারার ৩ উপধারায় কর্মীর পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে রাখার কিছু শর্ত উল্লেখ আছে—১. চিকিৎসার সুবিধার জন্য, ২. ভিসা আবেদনের প্রয়োজনে (সাময়িক নিয়োগ), ৩. বিদেশি কর্মীর পরিচয়পত্র তৈরির জন্য ও ৪. ভিসা নবায়নের প্রয়োজনে কর্মীর পাসপোর্ট নিয়োগকর্তা সাময়িক সময়ের জন্য রাখতে পারবেন, তবে ওই সব কাজ শেষ হওয়ার পর কর্মীকে তার পাসপোর্ট ফেরত দিতে হবে। কিন্তু অনুসন্ধানে প্রমাণ মেলে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশি যত শ্রমিক বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় গেছে, সবার কাছ থেকে বিমানবন্দরেই পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটস রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় গিয়ে ৮০ জন শ্রমিকের পাসপোর্ট হাতছাড়া হয়েছে। তাদেরই একজন কুষ্টিয়ার খোকসার শাহিন রানা। দেশে ফিরে গত ২৪ অক্টোবর তাঁর সঙ্গে কথা হয় ফোনে। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে নামার পর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার আগেই আমাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট কেড়ে নেয় কম্পানির লোকজন।’ নরসিংদীর রায়পুরার আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘পাসপোর্ট নেওয়ার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে, ফেরত দেয়নি।’

রামরুর পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘যেকোনো দেশের আইন অনুযায়ী কোনো অভিবাসী শ্রমিকের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া আইনবহির্ভূত। শ্রমিককে ক্ষমতাহীন করতে শুরুতেই পরিকল্পিতভাবে এটা করা হয়।’

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো আইনই একজনের পাসপোর্ট আরেকজনের কেড়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়নি। অথচ মালয়েশিয়ায় এটা অহরহ করা হচ্ছে। এটা এক ধরনের জিম্মি কৌশল। বেতন-ভাতা যাই দেওয়া হোক, শ্রমিক যেন কম্পানি ছেড়ে চলে না যায়। এর বিরুদ্ধে মালয়েশিয়া পুলিশ কিংবা আদালতে অভিযোগ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা হতে পারে।

চুক্তির আরেক বড় বরখেলাপ হলো—এক কম্পানির নামে কর্মী এনে আরেক জায়গায় কাজে খাটানো। এই শ্রমিকদের অবস্থা হয় আরো করুণ। কারণ ওরা অর্থাৎ দ্বিতীয় কম্পানি আর তখন চুক্তির পরোয়া করে না, যেহেতু তাদের সঙ্গে ওই কর্মীর কোনো চুক্তি হয়নি। তাই প্রথম দিন থেকেই শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয় শ্রমিকরা।

আরো ভয়াবহ ঘটনা পাওয়া যায় সেরামবাংয়ের ডায়নাকোরাল অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কম্পানিতে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিক ট্রাভেলস নামের রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা করে দিয়ে এখানে এসে চরম বিপাকে পড়ে ১৯২ জন শ্রমিক। ডায়নাকোরালের নামে ভিসা করে নেওয়া হলেও সেখানে তাদের কোনো কাজ দেওয়া হয় না। কারখানা থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে গুদামের মতো একটি ঘরে রেখে চুক্তির বরখেলাপ করে তাদের একেক দলকে একেক জায়গায় কাজে দেওয়া হয়। তাদেরই একজন রাজু মিয়া বললেন, ‘পরিবারের সুখের জন্য সব কিছু বিক্রি করে মালয়েশিয়া এসে এখন পথের ভিখারি হাওয়ার অবস্থা। গোডাউনের মধ্যে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। দেশের বাড়িতে পাওনাদাররা চাপ দিচ্ছে। পরিবারও আছে কষ্টে। আমাদেরও এখানে তিন বেলা খাবার জোটে না। কিছু চাল আর আলু দিয়েছে মালিকপক্ষ। তা-ই খেয়ে আছি।’

জালালউদ্দিন মোল্লা বললেন, ‘জঙ্গল থেকে শাকসবজি কুড়িয়ে নিয়ে কোনো মতে রান্না করে খাচ্ছি। ডায়নাকোরাল কম্পানিতে ভিসা হলেও কাজ দেয় অন্য কম্পানিতে। সেখানে কিছু দিন কাজ করার পর আবারও আরেক কম্পানিতে নেয়।’

ডায়নাকোরালের পরিচালক রুইবেন অভিযোগগুলো অস্বীকার করে মালয়েশিয়াকিনিকে বলেন, ‘ওরা নির্মাণ শ্রমিক, সিআইডিবি গ্রিন কার্ড ছাড়া কর্মস্থলে যেতে পারে না। কাজ শুরুর দুই মাস আগে এই কার্ড দেওয়া হয়। মেডিক্যাল, স্টিকার ও গ্রিন কার্ডের পর তারা কাজের যোগ্য হয়। এই দুই মাস আমরা শ্রমিকদের সব কিছু দিয়ে যে জায়গায় রাখি, সেটা বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার কনস্যুলার পরিদর্শন করে প্রত্যয়ন করেছেন। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা আফিন ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে।’

বিস্মিত হতে হয়, সাক্ষাত্কার দেওয়া ৪২ জন শ্রমিকের মধ্যে ২৮ জনই বলেছে, তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তিই হয়নি। কিন্তু উভয় সরকারের এমওইউ অনুযায়ী শ্রমিকের সঙ্গে নিয়োগকর্তার চুক্তি করা বাধ্যতামূলক, যা লেখা আছে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কাছে পাঠানো নিয়োগানুমতিপত্রের ১ নম্বর শর্তেই।

বায়রার সাবেক মহাসচিব মনসুর আহমেদ বলেন, ‘আসলে চুক্তি একটা সই করিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের হাতে দেওয়া হয় না। কিছু ভালো কম্পানি চুক্তির কপি শ্রমিককে দেয় এবং চেষ্টা করে চুক্তি অনুযায়ী পারিশ্রমিক দেওয়ার। যাদের চুক্তির কপি দেওয়া হয় না, তাদেরই মূলত অন্য কম্পানিতে কাজ দিয়ে কম বেতন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং বাকিটা আত্মসাৎ করা হয়।’

অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘নর্থ-সাউথ ইনিশিয়েটিভ’-এর অ্যাড্রিয়ান পেরেইরার কাছে মালয়েশিয়াকিনি জানতে চেয়েছিল, অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে কেউ চুক্তি ভঙ্গ করলে মালয়েশিয়ার আইন কী বলে?

জবাবে পেরেইরা বলেন, মালয়েশিয়ার আইনে অনেক সমস্যা আছে। বৈধ কাগজপত্রসংক্রান্ত ঝামেলায় আদালতে এলে অভিবাসীদের আইনি সহায়তার ব্যবস্থা নেই এখানে। যে আইনগুলো রয়েছে, সেগুলো নিশ্চিতভাবেই যথেষ্ট নয়। শ্রমিক অসন্তোষের মুখোমুখি হলে কম্পানিগুলো ওদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে দেয় এবং তুচ্ছ অভিযোগে দেশে ফেরত পাঠায়। শ্রমিকদের আইন অনুযায়ী ছাঁটাই করা হলো কি না তা যাচাই করার ব্যবস্থা ইমিগ্রেশনের নেই। বৈষম্যও আছে। অভিবাসীদের দুই সপ্তাহ আটক বা রিমান্ডে রাখা যায়; কিন্তু মালয়েশীয়দের দুই দিনের বেশি রাখা যায় না। ওই দুই সপ্তাহে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। কর্মঘণ্টার হেরফের করে মালয়েশীয় কম্পানি বিদেশি শ্রমিকদের কোনো ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধ না দিয়ে টানা খাটাতে পারে।

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ১০ লাখ শ্রমিকও যদি এখানে থাকে এবং কমপক্ষে ১ শতাংশ শ্রমিকও যদি সমস্যায় পড়ে, তবু সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার। এত শ্রমিকের দেখভাল করার মতো জনবল আমাদের নেই। এখানে আমাদের বড় দুর্বলতা আছে।’

আপনার কর্মকর্তাদের ডাকলেও যান না; কখনো গেলেও মালিকপক্ষের সুবিধা নিয়ে চলে আসেন—টিয়ং টটের শ্রমিকদের এই অভিযোগ তুলে ধরলে হাইকমিশনার বলেন, ‘এ বিষয়টা আমাকে খতিয়ে দেখতে হবে।’

মালয়েশিয়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ইফতেখারুল আলম

দালালের প্রতারণায় নিঃস্ব প্রবাসীর স্বজনের কান্না

দালালের প্রতারণায় নিঃস্ব প্রবাসীর পরিবার (ভিডিও-১)

দালালের প্রতারণায় নিঃস্ব প্রবাসীর পরিবার (ভিডিও-২)

দালালের প্রতারণায় নিঃস্ব প্রবাসীর পরিবার (ভিডিও-৩)

দালালের প্রতারণায় নিঃস্ব প্রবাসীর পরিবার (ভিডিও-৪)

 

মন্তব্য