kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

আশিকুলকে অবৈধ অস্ত্র দিয়েছিল কারা?

মেহেদী হাসান   

২১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আশিকুলকে অবৈধ অস্ত্র দিয়েছিল কারা?

অবৈধ যে দুটি অস্ত্র কেনা ও গ্রহণ করার দায়ে নিউ ইয়র্কের আদালত বাংলাদেশি আশিকুল আলমকে কারাগারে পাঠিয়েছেন, সেই অস্ত্রগুলো নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে তৈরি নয় বলে হলফনামা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল তদন্ত ব্যুরো এফবিআই। সেই অস্ত্রগুলোর ‘ম্যানুফাকচারস সিরিয়াল নম্বরও’ মুছে ফেলা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, এক রাজ্যের অস্ত্র অন্য রাজ্যে নেওয়া যায় না। সিরিয়াল নম্বর নেই এমন অস্ত্র রাখাও বে-আইনি।

এফবিআই আশিকুলের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনলেও আদালতে উত্থাপিত হলফনামা অনুযায়ী সে অস্ত্রগুলো আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তারাই তাঁকে দিয়েছিলেন। নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করা, হামলার জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া, অস্ত্র সংগ্রহ—পুরো প্রক্রিয়াতেই আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। গত বছরের আগস্ট মাসে বা তার কাছাকাছি সময়ে ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’ (আন্ডার কভার, সংক্ষেপে ইউসি-১) এর নজরে পড়েছিলেন নিউ ইয়র্কের কুইন্সের বাসিন্দা আশিকুল। এর পর প্রায় ১০ মাসে অন্তত ২৩ দফা সাক্ষাৎ ও বৈঠক করে রীতিমতো তাঁকে ওসামা বিন লাদেনের উত্তরসূরি বানানোর ফাঁদ পাতা হয়েছে। আর সেই ফাঁদে তিনি পা দিয়েছেন।

‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’ আশিকুলের সঙ্গে মিলে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করেছেন। অস্ত্র কেনার জন্য ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’ তাঁর সহযোগী হিসেবে অপর একজন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যাকে এফবিআইয়ের হলফনামা ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-২’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-২’ আবার তাঁর সহযোগী ও অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে যে ব্যক্তিকে আশিকুলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তাকে হলফনামায় ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-৩’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ৭ জুন নিউ ইয়র্কের আদালত আশিকুল আলমকে বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। আজ শুক্রবার মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

আশিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ কেবল অবৈধ অস্ত্র রাখার মধ্যে সীমিত থাকবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আদালতে দাখিল করা হলফনামায় এফবিআইয়ের স্পেশাল এজেন্ট সিন ডিলন বলেছেন, এই হলফনামা দাখিল করা হয়েছে সীমিত উদ্দেশ্য। মূলত আশিকুল আলমকে গ্রেপ্তারের সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। তবে আশিকুলের সঙ্গে তাঁদের কথোপকথনের রেকর্ড আছে।

আশিকুলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে তিনি ‘জ্ঞাতসারে’ ও ‘আগ্রহভরে’ দুটি ‘গ্লোক ১৯ ৯এমএম সেমি অটোমেটিক পিস্তল’ কিনেছিলেন। সেগুলো প্রস্তুতকারকের ক্রমিক নম্বর মুছে ফেলা, বিকৃত করা ছিল। সেগুলো ‘ইন্টারস্টেট অ্যান্ড ফরেন কমার্স’-এর আওতায় পড়েছে, যা অবৈধ।

জানা যায়, গ্লোকের পিস্তল তৈরি হয় অস্ট্রিয়ায়। এফবিআই গ্লোকের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে থাকে। সিএনএনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০১৬ সালে গ্লোকের কাছ থেকে এফবিআইয়ের সাড়ে আট কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র কেনার কার্যাদেশ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়।

এফবিআইয়ের হলফনামায় দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নিউ ইয়র্কের সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ টাস্কফোর্সের তদন্ত চলার সময় আশিকুল আলম আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সিরিয়াল নম্বর নষ্ট করা হয়েছে এমন দুটি অস্ত্র কেনেন ও গ্রহণ করেন।’

হলফনামা ঘেঁটে জানা গেছে, ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’-এর কাছে টাইমস স্কয়ার এলাকায় হামলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গার কথা জানতে চেয়েছিলেন আশিকুল। ছদ্মবেশী ওই কর্মকর্তা আশিকুলকে ফাদার ডাফি স্কয়ার এলাকা দিয়ে হামলা চালানোর পরামর্শ দেন।

‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’ আশিকুলকে পেনসিলভানিয়ায় শ্যুটিং রেঞ্জেও নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ও আশিকুল অস্ত্র চালানোর ব্যাপারে শিক্ষা নেন।

হলফনামায় বলা হয়েছে, গত বছরের আগস্ট মাসের কাছাকাছি সময় থেকে গত ৬ জুন পর্যন্ত ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’ আশিকুল আলমের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন। এসব সাক্ষাতে আশিকুল ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলাকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া আইএসসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর হামলার প্রশংসা করেও আশিকুল বক্তব্য দিয়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর আশিকুলের কাছে ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’ জানতে চেয়েছিলেন, ওসামা বিন লাদেনের স্থলাভিষিক্ত কে হতে পারে? জবাবে আশিকুল বলেছিলেন, ‘ওসামা বিন লাদেন তাঁর কাজ করেছেন। এখন আমাদের করতে হবে।’

গত ২৭ সেপ্টেম্বর আশিকুল আলম ও ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’-এর মধ্যে আলোচনা হয়েছিল ‘সুইসাইড ভেস্টের’ ব্যবহার নিয়ে। ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’ জানতে চেয়েছিলেন, আশিকুল সুইসাইড ভেস্ট ব্যবহার করবেন কি না? আশিকুলের জবাব ছিল ইতিবাচক।

আশিকুল ‘আইন প্রয়োগকারী ছদ্মবেশী কর্মকর্তা-১’-কে নিজের সহযোগী মনে করে এতটাই বিশ্বাস করেছিলেন যে ওই কর্মকর্তার মোবাইল ফোন চেয়ে নিয়ে আল-কায়েদা নেতা আনওয়ার আল-আওলাকির বক্তৃতা সার্চ করে শুনেছিলেন। আর এগুলোই এখন তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

মন্তব্য