kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

রাবি শিক্ষক শফিউল হত্যা

তিনজনের ফাঁসি, আটজন খালাস

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী   

১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তিনজনের ফাঁসি, আটজন খালাস

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. এ কে এম শফিউল ইসলাম লিলন হত্যা মামলায় ছাত্রদলের সাবেক নেতাসহ তিনজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আদালত। গতকাল সোমবার দুপুরে জনাকীর্ণ আদালতে বিচারক অনুপ কুমার এ রায় ঘোষণা করেন। এ সময় মামলার ১১ জন আসামির মধ্যে ১০ জন উপস্থিত ছিলেন।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন রাবি ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি আব্দুস সালাম পিন্টু, কাটাখালী পৌর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মানিক ও তাঁর সহযোগী সবুজ শেখ। তবে সবুজ পলাতক রয়েছেন। খালাসপ্রাপ্তরা হলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আব্দুস সালাম পিন্টুর স্ত্রী ও রাবির হিসাব শাখার কর্মী নাসরিন আক্তার রেশমা, বিএনপিকর্মী সিরাজুল ইসলাম কালু, আল-মামুন, সাগর, জিন্নাত, আরিফ ও ইব্রাহীম খলিল ওরফে বাবু ওরফে টোকাই বাবু।

তবে মামলার রায় ও তদন্ত নিয়ে আসামি ও বাদীপক্ষ উভয়েই অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। নিহত শফিউল ইসলামের ছেলে সৌমিন শাহরিদ আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মামলায় সঠিক তদন্ত হয়েছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয় না। যেহেতু মামলার ঠিকমতো তদন্ত হয়নি, সেহেতু রায়ে সঠিক আসামিরা উঠে এসেছে বলে মনে হয় না। মামলার সঠিক তদন্ত হলে হয়তো মূল আসামিরা উঠে আসত। আবার হয়তো এরাও জড়িত থাকতে পারে। তবে মামলার আসল মোটিভ উদ্ধার হয়নি বলে আমার মনে হয়। যে কারণ দেখিয়ে আমার বাবার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ হয়েছে, সেটি কোনো কারণ হতে পারে না। অযৌক্তিক একটি ঘটনা তুলে এনে মামলাটি শেষ করা হয়েছে।’

তদন্ত সম্পর্কে শাহরিদ বলেন, এমনও হতে পারে বিষয়টি রাজনৈতিক, বিষয়টি অন্য কোনোভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত। মামলাটির তদন্তের শুরুতে মনে হয় ঠিক জায়গায় ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সেটি অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর সেখানেই আমার সন্দেহ রয়েছে। তদন্ত চলাকালে আমার সঙ্গেও সঠিকভাবে যোগাযোগ করেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা। এমনকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আমাকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করা হয়নি। বরং বারবার আমাকে নিরুৎসাহ করা হয়েছে।’

এদিকে মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী গোলাম মোর্তজা সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মামলায় ৩৩ জন সাক্ষীর একজনও আসামিদের নাম বলেননি। শুধু একজন আসামির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে আসামিদের নাম উঠে এসেছে। কাজেই সব আসামিই খালাস পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা সেটি পাইনি। ফলে আমরা দ্রুত উচ্চ আদালতে আপিল করব।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল প্রশিকিউটর এন্তাজুল হক বাবু বলেন, ‘নিহতের ছেলে ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যে অভিযোগ করেছেন তা ঠিক নয়। তিন আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় আদালত তিনজনকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দিয়েছেন। অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তাঁরা খালাস পেয়েছেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় লালন ভক্ত ড. শফিউল ইসলাম লিলনকে। মুক্তমনা ও প্রগতিশীল আদর্শের অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত ছিলেন তিনি। এ ঘটনায় পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মুহাম্মদ এন্তাজুল হক বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মতিহার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

ড. শফিউল খুনের পাঁচ ঘণ্টার মাথায় ফেসবুকে দায় স্বীকার করে ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ নামে একটি জঙ্গি সংগঠন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাসরিন আখতার রেশমার সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয় বলে র‌্যাব দাবি করে। এর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ওই বছরের ২৩ নভেম্বর প্রথমে রেশমার স্বামী ও রাবি ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি আবদুস সামাদ পিন্টুসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এ ছাড়া রাজশাহী জেলা যুবদলের তৎকালীন আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলের নামও উঠে আসে তদন্তে। পরে রেশমাকেও গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে রেশমা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এক বছর পর তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজশাহী মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তৎকালীন পরিদর্শক রেজাউস সাদিক আদালতে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর মামলাটি বিচারের জন্য রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়। গত ১৩ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

মন্তব্য