kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

মামলায় সিলিন্ডার সুবিধায় আসামি

এস এম আজাদ   

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মামলায় সিলিন্ডার সুবিধায় আসামি

রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার ‘দুর্বলতার’ সুযোগ নিচ্ছেন অভিযুক্তরা। গত সোমবার মামলার এজাহারনামীয় আসামি ওয়াহিদ ম্যানশনের মালিক মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদ হাইকোর্ট থেকে তিন সপ্তাহের জামিন পেয়েছেন। কিছুদিন পলাতক থেকে এই জামিন পাওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, মামলার এজাহারে ঘটনাস্থল হিসেবে ওয়াহিদ ম্যানশনের কথা উল্লেখ করা হয়নি। আর অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয় উল্লেখ করে আসামিপক্ষের আইনজীবীর করা আবেদন আমলে নিয়েছেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। জানতে চাইলে মামলার বাদী (একজন নিহতের সন্তান) মো. আসিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। কিভাবে হয়েছে তাও আমি দেখিনি। যে যা বলছে, তাই শুনেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশ একটা এজাহার লিখে দিছে। আমি সাইন (স্বাক্ষর) করে দিয়েছি।’

নিহতদের স্বজনরা বলছে, পরিকল্পিতভাবে মামলায় ওয়াহিদ ম্যানশনের রাসায়নিক ও সুগন্ধী গুদাম থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আড়াল করা হয়েছে। এখন তদন্তেও রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে বলে সন্দেহ করছে তারা।

গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস, শিল্প মন্ত্রণালয় ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ওয়াহিদ ম্যানশন থেকে আগুনের সূত্রপাতের কথা উল্লেখ করেছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তদন্তেও মিলেছে একই ধরনের আলামত।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, দায়ের করা মামলায় ক্ষয়ক্ষতির আলামতের বর্ণনা দেওয়া হয়নি। রয়েছে অনেক ভুল তথ্য। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটির দ্বিতীয় তলায় ‘পার্ল ইন্টারন্যাশনাল’ নামে যে সুগন্ধী প্রতিষ্ঠানের গুদাম ছিল, সেখান থেকেই অগ্নিকাণ্ডের বিস্তার ঘটে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটির কাউকে মামলায় আসামি করা হয়নি।

এজাহারে দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক)/৪৩৬/৪২৭/৩৪ ধারায় অভিযোগ করা হয়, ‘দাহ্য পদার্থ এবং কেমিক্যাল দ্বারা আগুনের সাথে সংমিশ্রণ ঘটাইয়া মানুষের জানমালের ক্ষতি হইতে পারে জানিয়াও আসামিরা অধিক লাভের জন্য বসবাসরত বাসাগুলিতে গোডাউন হিসেবে ভাড়া দিয়া ৬৭ জন ব্যক্তির  মৃত্যু ঘটাইয়াছে।’ তবে এজাহারে অসংগতির কারণে গুরুতর এই অভিযোগের পরও আসামিরা জামিন পেয়েছেন বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।

পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার ইব্রাহিম খান বলেন, ‘তদন্ত চলছে। ভবনের মালিকের ভূমিকা এবং কারা কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া নিয়েছিল, সবার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’

মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের আইজীবী, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট জাহিদ সারওয়ার কাজল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এফআইআর-এ বলা আছে, রাস্তায় সিলিন্ডারে আগুন লেগেছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী এই বিষয়টি উল্লেখ করে আবেদন করেন, যা বিজ্ঞ আদালত বিবেচনায় নিয়েছেন। আমি বিরোধিতা করেছি। বলেছি, তদন্ত এখনো চলছে। কারণ বের হয়ে আসবে।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ড. মোমতাজউদ্দিন মেহেদী বলেন, ‘এজাহারে প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এবং ৬৫ ও ৬৬ নম্বর ভবনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ওই দুটি নম্বরের কোনো ভবনের মালিক নয় আসামিরা। তারা ৬৪ নম্বর ওয়াহেদ ম্যানশনের স্বত্বাধিকারী।’

মামলার এজাহার এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাদী আসিফের বাবা নিহত জুম্মন (৫২) ছিলেন চকবাজারের ‘বিউটি মসলা’ নামে একটি কারখানার ইনচার্জ। তাঁদের বাসা ওয়াটার ওয়ার্কস রোডে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে জুম্মন ৬৫/৬৬ নন্দকুমার দত্ত রোডের ভবনের নিচে মদিনা ডেকোরেটরে তাঁর বন্ধুর কাছে যান। মামলার এজাহারে এ ভবনটির মালিক মৃত হাজি ওয়াহেদের (সাবেক কমিশনার) দুই ছেলে হাসান ও সোহেল বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোরাদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতে কিভাবে জামিন হয়েছে জানি না। তবে ভবনটির নম্বরটি ভুল হয়েছে, এটি ৬৪ হবে, যা আমরা পরে আদালতকে অবহিত করেছি। গোডাউনের মালিক কারা এবং ভবনটির মালিকপক্ষ কিভাবে জড়িত তাও তদন্ত চলছে। এখানে কাউকে রেহাই দেওয়ার সুযোগ নেই।’

এজাহারে লেখা হয়েছে, ‘২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ২০ মিনিটে চুড়িহাট্টা শাহি জামে মসজিদের সামনে রাস্তায় চলাচলরত একটি প্রাইভেট কারের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে পাশের বিদ্যুতের ট্রান্সমিটারে আগুন লেগে যায়। তত্ক্ষণাৎ পাশে আরেকটি প্রাইভেট কারে আগুন লাগলে সেই গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। ৬৫/৬৬ নন্দকুমার দত্ত রোডের চুড়িহাট্টা বিল্ডিংয়ের সামনে একটি পিকআপে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে রাজমহল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে আগুন লাগে। সেখান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে সমগ্র এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে।’ এই অভিযোগে গোটা এলাকায় আগুন লাগার কথা বলা হলেও ওয়াহেদ ম্যানশনে বিস্ফোরণ ও দেয়াল ধসে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ নেই, যা তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদনে রয়েছে। আবার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে দেখা যায়, রাজমহল হোটেলে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনাই ঘটেনি। এদিকে ডিপিডিসির লালবাগ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী হরিচাঁদ হালদার বলেন, ‘চুড়িহাট্টা মোড়ে বিদ্যুতের কোনো ট্রান্সফরমার ছিল না।’

তদন্তকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে, সামনের রাস্তায় দুটি প্রাইভেট কার ছাড়াও দুটি পিকআপ ভ্যান, তিনটি সিএনজি অটোরিকশা, পাঁচ-ছয়টি মোটরসাইকেল ছিল। এসব গাড়ি আগুনে পুড়ে যায়। তবে ঘটনার পর যে প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন গাড়িটির মালিক আবাসন ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান।

ফায়ার সার্ভিসের লালবাগ জোনের ফায়ার স্টেশনের লিডার সাইদুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়াহেদ ম্যানশনের সিঁড়ির পাশের একটি সরু গলিতেই ২৬টি লাশ পাই।’ অথচ মামলার এজাহারে লাশ উদ্ধারের স্থানগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

পার্ল ইন্টারন্যাশনালের আড়ালে

ওয়াহেদ ম্যানশনে ঘটনাস্থলে আগুনে পুড়ে যাওয়া বিভিন্ন সুগন্ধি ক্যানের সূত্র ধরে জানা যায়, সেগুলো আমদানি করে পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠান। ক্যানে এ প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে পুরান ঢাকার ৬৬ মৌলভীবাজার উল্লেখ থাকলেও সেখানে অফিস পাওয়া যায়নি। হাতিরপুলের ১৩/১ সোনারগাঁও রোড কাশেম সেন্টারের ছয়তলায় একটি কার্যালয় থাকলেও সেটি বর্তমানে বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ বলে জানা গেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা