kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

অপ্রতিরোধ্য স্বাধিকার সংগ্রাম

আজাদুর রহমান চন্দন   

১১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অপ্রতিরোধ্য স্বাধিকার সংগ্রাম

‘জনগণের স্বাধিকার আন্দোলন এমন একপর্যায়ে পৌঁছিয়াছে, যেখান হইতে আর প্রত্যাবর্তন নাই। তাহারা আগাইয়া চলিবেই এবং গণ-আজাদী ও অধিকার ছিনাইয়া আনিবেই। সংকল্পবদ্ধ এই সংগ্রামী জনতাকে স্তব্ধ করিয়া দিবার ক্ষমতা পৃথিবীতে কাহারও নাই, যদি না...কোন ভ্রান্ত পদক্ষেপ দ্বারা আমরা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ করিয়া বসি।’ ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের ১১ তারিখে এমন মন্তব্য করা হয়েছিল তখনকার অন্যতম প্রধান দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় কলামে। এর শিরোনাম ছিল ‘স্বাধিকার সংগ্রাম ও দায়িত্ব’।

ঢাকার তখনকার আরেক প্রধান দৈনিক ‘সংবাদ’ যেসব শিরোনাম করেছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘পুলিশের সহিত গুলিবিনিময়ে ২৯ জন আহত : ১ জন নিহত : নারায়ণগঞ্জে জেল ভাঙ্গিয়া ৪০ জন কয়েদীর পলায়ন’ এবং ‘স্বাধিকার আদায় সংগ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের পথসভা ও গণসঙ্গীত স্কোয়াড’।

১৯৭১ সালের এই দিনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, জনতার আন্দোলন অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। এটা সম্ভব হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জারি করা সকল নির্দেশনা প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ বলয়ের মধ্য থেকে ধারণ ও পালন করাকে পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে। করাচি থেকে প্রকাশিত দৈনিক ডন ওই বিবৃতিটি প্রকাশ করেছিল ‘বাংলাদেশের নামে অর্থনীতিকে পুরোপুরি সচল রাখুন : তাজউদ্দীন’ শিরোনামে।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সমরাস্ত্র বোঝাই একটি জাহাজ আগের দিন (১০ মার্চ) নোঙর করেছিল চট্টগ্রাম বন্দরে। ওই সমরাস্ত্র আনার প্রতিবাদ জানিয়ে ১১ মার্চ ‘স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’-এর চার ছাত্রনেতা জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই দিন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি কে উলফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর কাছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সমরসজ্জায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওই দিন দৈনিক ইত্তেফাক প্রধান শিরোনাম করেছিল ‘জাতিসংঘ সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বের ওখানেই শেষ নয়...’। নিচে ছোট টাইপে ছিল ‘বাংলার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে শেখ মুজিব’।

স্বাধীন বাংলার দাবিতে অবিচল সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে সব ধরনের অসহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। হাইকোর্টের বিচারপতি ও প্রশাসনের সচিবসহ সারা বাংলার সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ দিন অফিস বর্জন করেন। সচিবালয়, মুখ্য সচিবের বাসভবন, প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ সব সরকারি-আধাসরকারি ভবন ও বাসাবাড়িতে উড়েছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা। ন্যাপ (ওয়ালী) পূর্ববাংলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পাঞ্জাব আওয়ামী লীগ সভাপতি এম খুরশীদ, কাউন্সিল মুসলিম লীগপ্রধান মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানার বিশেষ দূত পীর সাইফুদ্দিন এবং ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি কে উলফ এ দিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ধানমণ্ডিতে তাঁর বাসভবনে আলাদা বৈঠকে মিলিত হন।

একাত্তরের এই দিনে সংগ্রামী জনতা সেনাবাহিনীর রসদ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর স্বাভাবিক সরবরাহের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। রংপুর, যশোর ও সিলেটে রেশন নেওয়ার সময় সেনাবাহিনীর কনভয়কে বাধা দেওয়া হয়। রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ ১১৪ নম্বর সামরিক আদেশ জারি করে।

একাত্তরের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির এক সভায় মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন দেওয়ার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আবেদন জানানো হয়েছিল। গণ-আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাঁদের এক দিনের বেতন আওয়ামী লীগের ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যদিকে গণহত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তান সরকারের এক চিত্রপ্রদর্শনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর। এমনকি তিনি দেশের চিত্রশিল্পীদেরও যোগদানে বিরত থাকার আহ্বান জানান। পরদিনের পত্রপত্রিকার পাতা ছিল ওই সব সংবাদে ঠাসা।

মন্তব্য