kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নারায়ণগঞ্জের ইউএনওকে ওএসডি

তদন্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সংসদে ক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তদন্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সংসদে ক্ষোভ

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসনে আরা বেগমকে ওএসডি করার ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার সকালে জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহম্মদকে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে হোসনে আরা বেগমকে ওএসডির কারণে প্রিম্যাচিউর সন্তান জন্মদান নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকারি দলের দুজন সিনিয়র সংসদ সদস্য। তাঁরা ওই নারী ইউএনওর ওএসডির কারণ জানতে চেয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন এবং তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি ইউএনও হোসনে আরা বেগমকে ওএসডি করা হলে ৮ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি নিয়ে তিনি তাঁর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। যা নিয়ে বর্তমানে তোলপাড় চলছে। ফেসবুকে তিনি লেখেন—৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চিকিৎসার পরও সন্তান লাভ করতে পারেননি তিনি। এ অবস্থায় পাঁচ মাস আগে জানতে পারেন; তিনি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নির্বাচনের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেন। এর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাধুবাদও পেয়েছেন তিনি। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে যখন এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন একজন বিশেষ কর্মকর্তা বিভিন্ন মহলে পাঁয়তারা করছিলেন তাঁকে বদলি করার জন্য। এরই মধ্যে আগামী ২০ এপ্রিল তাঁর সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ডাক্তারি পরীক্ষার সময় একজন ব্যাচমেটের মাধ্যমে জানতে পারেন তাঁকে ওএসডি করা হয়েছে। তাঁর অপরাধ, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। খবরটি শুনে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিক কমে যায়। ফলে গর্ভের সন্তানের অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে গর্ভের সন্তান নড়াচড়া বন্ধ করে দিলে ডাক্তার ও পরিবারের সিদ্ধান্তে ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রিম্যাচিউর শিশুটিকে সিজার করে বের করে আনা হয়। বর্তমানে সেই শিশুটি ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিইউতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

নির্বাহী কর্মকর্তা হোসনে আরা বেগম তাঁর স্ট্যাটাসে আরো উল্লেখ করেন, ‘আমার অপরাধ হলো আমি সন্তানসম্ভবা, আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার ওপরের মহল কর্তৃক তদবির।’ তবে বিশেষ কর্মকর্তার পরিচয় উল্লেখ করেননি তিনি।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদে ইউএনও হিসেবে কাজে যোগ দেন হোসনে আরা বেগম। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত কমিশনার (সার্বিক) তারিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয় সদর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদা বারিককে ইউএনও করা হয়েছে। তবে এখনো নাহিদা বারিককে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি হোসনে আরা বেগম।

স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন সন্তানের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘শনিবার খুব খারাপ ছিল। আজ (গতকাল সোমবার) আগের দুই দিনের চেয়ে ভালো আছে। কবে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারব সেটা বলতে পারছি না। ডাক্তার নির্দিষ্টভাবে কিছুই বলেননি। তা ছাড়া অপারেশন ও মানসিক চাপে আমি এখনো অসুস্থ। আমাকেও ডাক্তার রিলিজ দেননি।’

ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করা ওই বিশেষ কর্মকর্তার নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পেশাগত কারণে নাম বলা যাচ্ছে না।’

বিষয়টি নিয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজাউল বারী বলেন, ‘বেবি হওয়ার কারণে তিনি (হোসনে আরা বেগম) ছুটি পাবেন। কিন্তু তা না করে তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। তিনি সুস্থ হওয়ার পর সেখানে যোগদান করবেন। আর ফেসবুকে অভিযোগ ওনার ব্যক্তিগত। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

সংসদে ক্ষোভ, তদন্ত দাবি

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ইউএনও হোসনে আরা বেগমকে ওএসডি করার কারণে প্রিম্যাচিউর সন্তান জন্মদান নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকারি দলের দুজন সিনিয়র সংসদ সদস্য। তাঁরা ওই নারী ইউএনওর ওএসডির কারণ জানতে চেয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন এবং তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে এসংক্রান্ত আলোচনা উত্থাপন করেন সাবেক নারী ও শিশু প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। পরে তাঁর সেই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে কথা বলেন নারায়ণগঞ্জ সদর আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত এসংক্রান্ত সংবাদের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ওই ইউএনও আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়ে লিখেছেন মা হওয়াটাই অপরাধ। সেই নারী ইউএনও দীর্ঘ ৯ বছর পর মা হতে যাচ্ছিলেন। সেই নারী গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘হোসনে আরা বেগমের সন্তান প্রসব করার সময় ছিল আগামী এপ্রিল মাসে। কিন্তু তিনি যখন ডাক্তার দেখাতে গেছেন, তখন তিনি আকস্মিক জানতে পারেন তাঁকে ওএসডি করা হয়েছে। খবরটি শুনে তাত্ক্ষণিক মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অকালপক্ব সন্তান প্রসব করায় বাচ্চাটা এখন মৃত্যুপথযাত্রী। আমার প্রশ্ন, ওই সরকারি কর্মকর্তা যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলে একজন সন্তানসম্ভবা নারীকে কেন ওএসডি করা হলো? এ ঘটনায় আমি বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।’

পরে ফ্লোর নিয়ে শামীম ওসমান বলেন, ‘বিষয়টিতে আমি লজ্জিত, কেননা ঘটনাটি আমার নির্বাচনী এলাকায়। তিনি আমার এলাকার সদরের ইউএনও। আমি জানতে চাই কার নির্দেশে তাঁকে ওএসডি করা হলো। বদলি করলেও একটা কথা ছিল। ওএসডি করার পর বাচ্চা প্রসব করল। সেই বাচ্চাটির যে অবস্থা তাতে আমি শঙ্কিত, বাচ্চাটি বাঁচবে কি না?’ তদন্ত করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা