kalerkantho

সহযোদ্ধাকে পুড়িয়ে মারার দৃশ্য দেখতে হয়েছে লুকিয়ে

ভূবন রায় নিখিল, নীলফামারী   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সহযোদ্ধাকে পুড়িয়ে মারার দৃশ্য দেখতে হয়েছে লুকিয়ে

“মুজাহিদ বাহিনীতে ছিলাম। হঠাৎ থানা থেকে বাঙালি দারোগা সাহেবের ডাক এলো। থানায় গেলাম, আমার মতো আরো কয়েকজন সেখানে উপস্থিত।

তিনি আমাদের বললেন, ‘অস্ত্র নাও, সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণে যেতে হবে।’ সকলেই অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়লাম।” ১৯৭১ সালে প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার বর্ণনা এভাবেই দিলেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার মিরজাগঞ্জ গ্রামের ৭২ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর। সে সময় মা-বাবা আর স্ত্রী-সন্তান রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ৯ মাস পর ফিরেছিলেন বীরের বেশে।

লেখাপড়া না জানলেও ১৬ বছর বয়সে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দিয়ে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন গফুর। এরপর ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে ডাক পড়েছিল তাঁর। অস্ত্র চালানোর সেই দক্ষতা কাজে লেগেছে মুক্তিযুদ্ধে।

গফুর জানান, সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করলেও পাকিস্তানি সেনাদের ভারী অস্ত্রের আক্রমণে সেদিন পিছু হটতে হয়েছিল তাঁদের। তবে সেখান থেকেই এলাকার ১০ বন্ধু মিলে চলে গিয়েছিলেন ভারত সীমান্তের মানিকগঞ্জ বিএসএফ ক্যাম্পে। তাঁরা ১০ জনই ছিলেন মুজাহিদ বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

আব্দুল গফুর বলেন, ‘ওই বিএসএফ ক্যাম্পে আমরা ছিলাম দুই দিন। সেখানে থেকে ভারত সীমান্তের দেওয়ানগঞ্জের হুদুমডাঙ্গা নামক স্থানে অবস্থান নিয়ে শুরু করি অপারেশন। প্রথম অপারেশন রাত ২টার দিকে দেশের নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার সীমান্তের ছাতনাই কলোনিতে। ওই রাতে প্রতাপশালী এক রাজাকারকে হত্যার পর কয়েকটি অস্ত্র উদ্ধার করে ক্যাম্পে ফিরি আমরা।’ তিনি বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে এভাবে চলতে থাকে অপারেশন। রাজাকার নিধন এবং তাদের কাছে রক্ষিত অস্ত্র উদ্ধার চলছিল সমানতালে। এরই মধ্যে মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যদের দক্ষতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুললে ২৮ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি মেটলি ক্যাম্পে (মুজিবনগর ক্যাম্প)। প্রশিক্ষণ শেষে পুনরায় যুদ্ধে নামি ডিমলা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে।’

স্মৃতি হাতড়ে আব্দুল গফুর বলেন, ‘ডিমলা উপজেলার বাইশপুর গ্রামে টানা ১৬ দিন অবস্থান নিয়ে সেখানে নিজেদের বোমার বিস্ফোরণে আহত হই ১৩ জন। আহত অবস্থায় স্থান পরিবর্তন করে চলে আসি কাকড়া গ্রামে। সেখানে থেকে ১৪ দিন যুদ্ধের পর চলে আসি জলঢাকা উপজেলায়। যুদ্ধে বিজয়ের তিন দিন আগে পৌঁছি কিশোরগঞ্জ উপজেলায়। পরে সেখানে থানায় অস্ত্র জমা দিয়ে চলে আসি নীলফামারী শহরের নটখানা নামক স্থানে। ১৬ ডিসেম্বরের পর সেখান থেকে ৯ মাস পর ফিরি পরিবারের কাছে।’ তিনি বলেন, ‘একদিন ডিমলার সুটিবাড়ি গ্রামে অপারেশনে নামলে চারদিক ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সেনারা। কিছুক্ষণ সম্মুখযুদ্ধের পর দলের সকলে এদিক-সেদিক আত্মগোপনে চলে গেলেও হানাদারের হাতে ধরা পড়েন দুই সহযোদ্ধা। তাঁদের মধ্যে একজন কৌশলে পালাতে সক্ষম হন আর অমানুষিক নির্যাতনে প্রাণ হারাতে হয় অপরজনকে। ওই সহযোদ্ধাকে হাত-পা বেঁধে আগুনের কুণ্ডলীর মধ্যে ফেলে পুড়িয়ে মেরে ফেলে তারা। আড়ালে লুকিয়ে থেকে এমন বীভৎস দৃশ্য দেখতে হয়েছে চোখে। সেটি আজও নাড়া দেয় স্মৃতিতে।’

গফুর জানান, ওই অপারেশনে আত্মগোপন করে হানাদারদের গতিবিধি লক্ষ করছিলেন তাঁরা। এরই এক ফাঁকে পাশের জোরজিগা গ্রামের এক বৃদ্ধার বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানে তিন দিন অনাহারে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা—এমনটি শুনে ওই বৃদ্ধা খড়কুটো দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে থাকতে সহযোগিতা করেছিলেন তাঁকে।

বয়সের ভারে অনেকটাই ক্লান্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর জানান, ১৯৭১ সালে তিনি যুদ্ধ করেছিলেন ৬ নম্বর সেক্টরে রওশন কম্পানির সদস্য হিসেবে।

 

মন্তব্য