kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

আচমকা গুলির মুখে সেনারা নদীতে পড়ে যেতে থাকে

অমিতাভ দাশ হিমুন, গাইবান্ধা   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আচমকা গুলির মুখে সেনারা নদীতে পড়ে যেতে থাকে

সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া দীর্ঘদেহী ওয়াসিকার মো. ইকবাল মাজু একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে গোপনে প্রতিবাদী মিছিল-সমাবেশে যোগ দিতেন। গাইবান্ধা শহরের পূর্বপাড়ায় তাঁদের বাসা। সেখানে টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাশে সন্ধ্যার পর অগ্রজপ্রতিম নজরুল (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ), বন্ধু শাহজাদা, সেনা সদস্য টুকুসহ অন্যদের সঙ্গে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর গোপন আলাপ চলত। ৭ই মার্চের পর বন্ধুদের সঙ্গে মাজুও গাইবান্ধা সরকারি কলেজ মাঠে ডামি রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। একদিন প্যারেড করার সময় পাশে একজনকে দেখে মাজু চমকে ওঠেন। তিনিও প্যারেড করছিলেন। সন্ধ্যার আবছা আলোয় প্রথমে তাঁকে চিনতে না পারলেও প্যারেড শেষে লোকটি মাথায় হাত রাখতেই মাজু আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি আর কেউ নন, তাঁরই বাবা আবদুর রশিদ।

একাত্তরের ১৭ এপ্রিল ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হানাদার বাহিনী গাইবান্ধায় ঢোকে। তাদের একটি দল পূর্বপাড়ায় মাজু ও তাঁর বন্ধুদের খোঁজে গেলে

সেখানে থাকা নিরাপদ নয় মনে করে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে ভারতের পথে রওনা দেন তাঁরা। মাজু ও তাঁর বন্ধুরা পথে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন আনসার সদস্যদের ফেলে যাওয়া চারটি রাইফেল আর কিছু গুলি। ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়ায় গিয়ে দেখা হয় অনেকের সঙ্গে। রসুলপুর ঘাট থেকে যাত্রা শুরু হয় নৌকায়। শহরের দুটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবার তাঁদের সহযাত্রী হয়। কামারজানী বন্দরের কাছে পাকিস্তানি দালাল সালু তাঁদের পথ রোধ করে হিন্দু পরিবার দুটিকে নামিয়ে রাখতে চাইলে প্রথমবারের মতো গুলি করেছিলেন মাজু। রক্ষা করেছিলেন পরিবার দুটিকে। তারপর আবার যাত্রা শুরু করেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মাইনকার চরের উদ্দেশে। তখনো মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজ তেমনভাবে শুরু হয়নি। কিন্তু মাজুর মাথায় তখন শত্রু দমনের নেশা চেপে বসেছিল। বন্ধুদের নিয়ে এক রাতে পরিকল্পনা ছাড়াই সামান্য অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে বসেন রৌমারী থানা। কিন্তু অবাঙালি পুলিশ বিপুল অস্ত্রে সজ্জিত থাকায় ব্যর্থ হলো সেই আক্রমণ। মাজুর তিন সহযোদ্ধা ধরাও পড়লেন। ফিরে এসে বিএসএফ ক্যাম্পের সেনা কর্মকর্তার কাছে পরিস্থিতি জানালে তাঁরা সাহায্য করতে রাজি হলেন। পরের রাতে বিএসএফের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে আবার আক্রমণ করে উদ্ধার করেন বন্ধুদের। আটক ১২ পুলিশ সদস্যকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন তাঁরা।

এরপর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ট্রেনিং নিতে প্রথমে যান বড়াইবাড়ী, কাঁকরিপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ২১৩ জনের একটি দলের সঙ্গে মাজুও যান তুরায়। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এক মাসের কঠিন প্রশিক্ষণ নেন। গাইবান্ধার মাহবুব এলাহী রঞ্জুর নেতৃত্বাধীন কম্পানিতে জুনিয়র লিডার হিসেবে যুক্ত হন মাজু। তাঁর আগ্রহে সাড়া দিয়েই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিস্ফোরক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়। দ্রুত তিনি শিখে ফেলেন ব্রিজ, ভবন ও ট্যাংক ধ্বংস করার কৌশল। রঞ্জু কম্পানি ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধে নামে। গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধ করার পাশাপাশি মাজু চারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন।

ওয়াসিকার মো. ইকবাল মাজু বলেন, ‘প্রতিদিন যুদ্ধে জড়াতে হয়েছে। ফুলছড়ির কালাসোনার চরে ছিল আমাদের ক্যাম্প। প্রায়ই ব্রহ্মপুত্রের ওপার থেকে চালানো হতো ভারী অস্ত্রের আক্রমণ। হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ফেলা হতো। শত্রুরা গানবোট নিয়েও আক্রমণ চালাত। আমরাও পাল্টা জবাব দিতাম। তবে প্রথম ভয়াবহ যুদ্ধের কথা মনে পড়লে এখনো শরীরে শিহরণ জাগে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালী সড়ক সেতু কৌশলগত কারণে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেটি তিনবারের চেষ্টায় উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। তবে এই সেতু উড়াতে গিয়ে আমাদের জড়িয়ে পড়তে হয় সম্মুখযুদ্ধে। জুন মাসে কমান্ডার মাহবুব এলাহী রঞ্জুর নির্দেশনায় রিজার্ভ ক্যাম্প থেকে ৩৩ জন রওনা হই নৌপথে। উড়িয়ার আতিক উল্যা চেয়ারম্যানের বাড়িতে গভীর রাতে আশ্রয় নেই। পরদিন দুপুরে এলাকার লোকজন জানায়, স্থানীয় নৌঘাটে পাকিস্তানিদের সহযোগী মুজাহিদ বাহিনীর ৬০ সদস্য লুটপাট ও নির্যাতন শুরু করেছে। তিন দিক থেকে আক্রমণ করে যুদ্ধের পর আমরা ৫২ জন মুজাহিদকে অস্ত্রসহ ধরে ফেলি। তাদের বেঁধে রিজার্ভ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মূল সমস্যাটি শুরু হয় পরের দিন। মুজাহিদদের পরিণতির খবর পেয়ে পাকিস্তানি সেনা ও বিপুলসংখ্যক রাজাকার উড়িয়া গ্রামের দিকে আসতে শুরু করে। আমরা চরের মধ্যে অবস্থান নেই। কিন্তু পাকিস্তানিরা বাঁধের ওপরে থাকায় তাদের ওপর আক্রমণ করা সম্ভব হয়নি। বিনা বাধায় উড়িয়া গ্রামে ঢুকে দুই ঘণ্টা ধরে লুটপাট, হত্যাযজ্ঞ, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ করে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীরা। নারীদের আর্তচিৎকারে মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। সহযোদ্ধাদের নিয়ে হাতে হাত রেখে শপথ নেই, আজ হয় পাকিস্তানিরা মরবে না হলে আমরা যুদ্ধ করে জীবন বিসর্জন দেবে। পাকিস্তানি সেনা ও সহযোগীরা নৌকা ও গানবোটে ওঠার জন্য জমির আইল দিয়ে আসছিল। পজিশনের দিক থেকে আমরা অনেকটাই খারাপ অবস্থায় ছিলাম। কিন্তু নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভুলে পাকিস্তানিরা নৌকায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেনেড, রাইফেল, এলএমজি দিয়ে আক্রমণ করি। আচমকা গুলির মুখে পাকিস্তানি সেনারা নদীতে পড়ে যেতে থাকে। নিজের বিপদের কথা না ভেবে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করি কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাকে। সেদিন সন্ধ্যায় পাশের একটি চরে ২৪ পাকিস্তানি সেনার লাশ ভেসে ওঠে।’

মাজু জানান, এর মধ্যে কেটে যায় আরো কিছুদিন। ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতার কথা তত দিনে ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় শিবিরেও। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে তাঁকে ক্যাম্পে ডেকে নেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর বিন্দ্রে সিং ও ক্যাপ্টেন রামানাথ। তাঁরা বলেন, গাইবান্ধা শহরের সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ থানার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। এ জন্য যোগাযোগ সড়কের ওপর দারিয়াপুর সেতু ধ্বংস করা প্রয়োজন। মাজুকে এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। মাজু সম্মতি জানিয়ে ফিরে আসেন। কম্পানি কমান্ডার রঞ্জুর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে (শবেবরাত) ওই আক্রমণ চালানো হয়। তিনি বলেন, ‘আগের দিন মুক্তিযোদ্ধাদের ১৩০ জনের একটি দলসহ আশ্রয় নেই পাশের কামারজানীর চেংমারী স্কুলে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে পরে সরে যাই একটি জেলেপাড়ায়। পরের দিন সন্ধ্যায় কামারজানী ঘাট থেকে ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে ঢুকে দারিয়াপুর ব্রিজে অবস্থানরত রাজাকার, রেঞ্জার ও পুলিশদের ওপর তিন দিক থেকে আক্রমণ শুরু করি। কিছুক্ষণ পাল্টা জবাব দিলেও একসময় পিছু হটে রাজাকাররা। আমি পুরু কংক্রিটের ব্রিজটি উড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নেই। এক্সপ্লোসিভ বসাতে বসাতে মধ্যরাত হয়ে যায়। সহযোদ্ধাদের নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলে ডেটোনেটর লাগিয়ে তার নিয়ে সরে যাই ২০০ ফুট দূরে। ফিউজ ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরানোর পর পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে আলোর ঝলকানি দেখা যায়। ব্রিজ ধসে পরে নদীর বুকে।’

ডিসেম্বরে ব্রহ্মপুত্রের কালাসোনার চরে রঞ্জু কম্পানির ক্যাম্পে শক্তি বাড়ানো হয়। সেখান থেকে গাইবান্ধার চারপাশে প্রায় প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। ফলিয়া, হাতিয়া, অনন্তপুর, ঘুঘুমারিসহ বেশ কিছু যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখেন মাজু। পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ওই চরগুলোতে বোমা ফেলত। বাংকার থেকে মাজু ও অন্য মুক্তিযোদ্ধারা বিমান লক্ষ্য করে এলএমজি দিয়ে গুলি ছুড়তেন। মাজু জানান, যুদ্ধ করতে করতেই তাঁরা ৭ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত করে গাইবান্ধার মাটিতে পা রাখেন। ৫ ডিসেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত গাইবান্ধা শহরের উপকণ্ঠে ফলিয়া ব্রিজে পাকিস্তানিদের সঙ্গে তাঁদের তুমুল যুদ্ধ হয়। হাতাহাতি যুদ্ধে ২১ রাজাকারকে আহত অবস্থায় বন্দি করেন তাঁরা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা