kalerkantho

শুক্রবার । ১১ আষাঢ় ১৪২৮। ২৫ জুন ২০২১। ১৩ জিলকদ ১৪৪২

পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কুগেলম্যানের পরামর্শ

বিরোধীদের প্রতি সংযমী হতে চাপ দিন ঢাকাকে

মেহেদী হাসান   

৫ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিরোধীদের প্রতি সংযমী হতে চাপ দিন ঢাকাকে

যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে তাঁর নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রভাবশালী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট মাইকেল কুগেলম্যান। আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে উইলসন সেন্টার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া নীতি বিষয়ক এক প্রকাশনায় কুগেলম্যানের ওই পরামর্শ স্থান পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার, সন্ত্রাস দমন ইস্যুতে বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সরকারকে সংযমী হতে চাপ প্রয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন কুগেলম্যান। তাঁর অভিযোগ, সন্ত্রাস দমনের নামে বাংলাদেশ সরকারের আক্রোশের শিকার হচ্ছে বিরোধীরা।

উল্লেখ্য, উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস, সংক্ষেপে উইলসন সেন্টার বিশ্বের প্রভাবশালী ১০টি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস প্রণীত একটি আইনের আওতায় প্রতিষ্ঠিত উইলসন সেন্টারের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মনোনয়ন দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।

উইলসন সেন্টারের গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান গত সেপ্টেম্বর মাসে কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলে ওবামা সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদারে উদ্যোগ নেবেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলে কী হবে তা কেউ জানে না। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার কথা বলেছেন।

সম্প্রতি উইলসন সেন্টার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া নীতি বিষয়ক প্রকাশনায় গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র হিমশিম খেয়েছে। এর অন্যতম কারণ এ অঞ্চলের বিশালতা ও জটিলতা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টেকসই ও বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে দক্ষিণ এশিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় তিনটি বিষয় ভূমিকা রাখবে। এগুলো হলো—এ অঞ্চল থেকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য সৃষ্ট ঝুঁকি, দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক কৌশলগত গুরুত্ব ও ভূরাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিবর্তন। এসব পরিবর্তনের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিন্যাস তরান্বিতকরণ এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসীচক্রের বিস্তার রোধ ও দমন।

তবে একই সঙ্গে টেকসই সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নীতিগত চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা কুগেলম্যানের। এগুলো হলো কৌশলগত সম্পর্ক বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য নিরসন, বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত নীতি প্রণয়ন এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের স্থিতিশীলতায় সহায়ক উপায় খুঁজে বের করা।

কুগেলম্যান ভারত প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্য নীতিগত পরামর্শে বলেন, নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের উচ্চ পর্যায়ের সফর বিনিময় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে অস্পষ্টতা দূর করা প্রয়োজন। গত জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওয়াশিংটন সফর ছিল দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন লক্ষ্য ও মূল্যবোধের প্রদর্শনী।

কুগেলম্যানের মতে, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে দিল্লি এখন ব্যাপক দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা পাচ্ছে। তবে ভারতীয় কর্মীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য আলোচনায় ভারতের অবস্থান, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এবং এ ধরনের উত্তেজনাকর আরো বেশ কিছু ইস্যুর চেয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রকৃতিগত সংজ্ঞা নিয়ে মতপার্থক্য দূর করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কাজ করা উচিত।

কুগেলম্যান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—উভয়েই পারস্পরিক কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হলেও এর সংজ্ঞা নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। ওয়াশিংটনের কাছে কৌশলগত অংশীদারি হলো নিবিড় নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং তা যৌথ অভিযানের সুযোগসহ। তবে ভারত অন্তত এখন এ ধরনের সহযোগিতায় আগ্রহী নয়। এ বছরই দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল হ্যারি হ্যারিস যখন দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত যৌথ ‘প্যাট্রলিং’য়ের প্রস্তাব দেন, তখন ভারতীয় কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেন, তাঁরা একে স্বাগত জানাবেন না। ভারতের কাছে কৌশলগত অংশীদারি হলো উচ্চ পর্যায়ের প্রযুক্তি হস্তান্তর ও অস্ত্র চুক্তি। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কাছে এটি আরো বড় প্যাকেজের অংশ। এই মতপার্থক্য দূর করা না গেলে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা সীমিত হয়ে আসবে এবং সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককেও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন মাইকেল কুগেলম্যান। তাঁর মতে, এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অনেক সহযোগিতা দিলেও ওয়াশিংটনের দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে বাংলাদেশ পেছনের দিকে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ক্ষেত্রে হুমকি ছিল না। তবে এখন বাংলাদেশকে গুরুত্ব না দেওয়ার আর কোনো কারণ নেই। কারণ বাংলাদেশ ইসলামের নামধারী সন্ত্রাসীদের সহিংস উগ্রবাদের শিকার হচ্ছে।

মাইকেল কুগেলম্যানের দাবি, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরো সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। স্থানীয় উগ্রবাদীদের চিহ্নিতকরণ ও আল-কায়েদা ও আইএসের মতো বৈশ্বিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা তদন্তে সন্ত্রাস দমন খাতে ওয়াশিংটন সহযোগিতা জোরদার করে। তবে বাংলাদেশ সরকার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে প্রায়ই সন্ত্রাস দমন কৌশলকে ব্যবহার করে বলে মনে করেন মাইকেল কুগেলম্যান। তাই ওয়াশিংটন যদি নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা, বিশেষ করে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার কৌশলকেই বেছে নেয় তবে তাদের নিশ্চিত করা উচিত যে এই অর্থ ঢাকায় সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে ব্যবহৃত হবে না।

কুগেলম্যান মনে করেন, ‘শুধু মানবাধিকার সুরক্ষাই নয়, সন্ত্রাসের উত্থান ঠেকাতেও বিরোধীদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে সংযত হতে ঢাকার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের চাপ সৃষ্টি করা উচিত।’

কুগেলম্যানের যুক্তি, রাজনৈতিক বিরোধীদের ধরপাকড়, ক্ষোভ প্রকাশের শান্তিপূর্ণ উপায়গুলো বন্ধ করে দিলে কট্টরপন্থার সম্ভাবনাই বাড়ে। বিশেষ করে কট্টর মতাদর্শ ধারণকারী জামায়াতের মতো দলগুলোর ক্ষেত্রে এটি আরো প্রকট হয়।

মাইকেল কুগেলম্যান যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে সামরিক ও বেসামরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি পরিমাণে কম হলেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এটি আফগান সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে সাহস জোগাবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান—উভয়ের জন্যই সরাসরি হুমকি আইএস, আল-কায়েদাসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দমনে পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করে তা বাস্তবায়নেরও পরামর্শ দিয়েছেন কুগেলম্যান। তাঁর মতে, পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্রে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহযোগিতা কমানো উচিত হবে না।

কুগেলম্যান আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নেও কার্যকর প্রচেষ্টা চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ওই দুই দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তে স্থিতিশীলতা আনতে এবং আন্তসীমান্ত সহিংসতা ও সন্ত্রাস কমাতে ভূমিকা রাখবে।

এ ছাড়া তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন এবং মধ্য এশিয়া-দক্ষিণ এশিয়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বাণিজ্য প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত রাখাসহ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক), হার্ট অব এশিয়া-ইস্তাম্বুলের মতো আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর সুবিধা লাগাতেও নতুন প্রেসিডেন্টকে সুপারিশ করেছেন।