kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

মেসি আর আর্জেন্টিনার মিশন ফাইনালের সামনে ডাচরা

নোমান মোহাম্মদ    

৯ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেসি আর আর্জেন্টিনার মিশন ফাইনালের সামনে ডাচরা

গত বিশ্বকাপের আবহে আলোচনাটা ছিল খুব করে। বার্সেলোনার জার্সি গায়ে ৫৩ ম্যাচে ৪৭ গোলের মৌসুম সদ্য শেষ করে এসেছিলেন বলেই হয়তো। ফুটবল মাঠে অতীন্দ্রিয় কারিকুরির অগুনতি প্রমাণ তাঁর, অত্যাশ্চর্য কীর্তির সংখ্যাও অসংখ্য। তো সেই লিওনেল মেসি কেবল বিশ্বকাপ জিতলেই হয়! সমকালীন শ্রেষ্ঠত্ব তাতে যেমন নিঃসংশয় হবে, সর্বকালের সেরায়ও তেমনি পেলে-ডিয়েগোর সঙ্গে একই নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করতে হবে তাঁর নাম।
আশ্চর্য হলেও সত্য যে চার বছর পরের আবহে সেই আলোচনা আর আগের মতো মুখর ছিল না। ৫৫ ম্যাচে ৫৩, ৬০ ম্যাচে ৭৩ ও ৫০ ম্যাচে ৬০ গোলের অবিশ্বাস্য তিন ক্লাব-মৌসুমের পর সর্বশেষটিতে ইনজুরিতে ক্ষতবিক্ষত থাকার কারণেই হয়তোবা। তবে তাতেও কিন্তু ৪৬ ম্যাচে ৪১ গোল মেসির! ইনজুরির অনিশ্চয়তায় প্রত্যাশা কিছুটা কমে গেলে কী হবে, মেসি ঠিকই আছেন প্রায়শ্চিত্তের প্রতিজ্ঞায়। সঙ্গে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের আক্ষেপ দূর করার ব্যাপারও তো বর্তমান!
প্রতিজ্ঞাপূরণ, আক্ষেপ দূর কিংবা কিংবা অমরত্বের পেয়ালায় চুমুক দেওয়া থেকে এখন মাত্র দুই ম্যাচ দূরত্বে আর্জেন্টাইন খুদে জাদুকর। আজ সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডস, এরপর মারাকানার ফাইনালে ব্রাজিল-জার্মানির যেকোনো এক দলকে হারাতে পারলেই হয়। এই দুটি ম্যাচে ৯০ দুগুণে ১৮০ মিনিট কিংবা ১২০ দুগুণে ২৪০ মিনিট অথবা আরেকটু এগিয়ে টাইব্রেকার- যেভাবে হোক, বিজয়ী হলেই চলবে মেসির! তাহলেই সমকাল ছাড়িয়ে সর্বকালের সেরার দাবিদার হবেন তিনি! পারবেন?
ফাইনালের এক পক্ষ নির্ধারিত হয়ে গেছে এরই মধ্যে। তবে ব্রাজিল কিংবা জার্মানির বিপক্ষে মারাকানার সেই মহারণের আগে মেসি ও আর্জেন্টিনাকে পেরোতে হবে নেদারল্যান্ডসের বাধা। চাট্টিখানি ব্যাপার নয় কিন্তু। চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত যেসব প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে তারা, এর চেয়ে ডাচরা ধারে-ভারে, ইতিহাস-ঐতিহ্যে অনেক এগিয়ে। আর তাদের নিজস্ব এক অভিযানও তো রয়েছে। সেটিও ২০১০-এর প্রায়শ্চিত্ত। ‘আলবিসেলেস্তে’ এবং ‘এল ফ্লি’র কাজটি তাই সহজ হবে না মোটেও।
মেসি দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন বিশ্বজয়ের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে। আরিয়েন রবেন, রবিন ফন পার্সি, ওয়েসলি স্নেইডারদের মতো ডাচ তারকাদের স্বপ্নের আকাশ অত বড় ছিল না। অথচ অবিশ্বাস্য সেই অর্জনের কত কাছাকাছিই না পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁরা! একে একে সব বাধা পেরিয়ে একেবারে ফাইনাল পর্যন্ত! সেখানে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে স্পেনের সঙ্গে সাম্যাবস্থার পর অতিরিক্ত সময়ের শেষ সময়ে গিয়ে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলে অবশেষে মানতে হয় হার। ১৯৭৪, ১৯৭৮-এর টোটাল ফুটবলের সেই সোনালি সময়ের পর তৃতীয়বারের মতো রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস। ভাবা যায়!
দুঃখের ওই অনন্ত সাগর সাঁতরে এবার সুখের মহাসাগরে অবগাহনের স্বপ্ন দেখছে ডাচরা। আজ আর্জেন্টিনার বাধা টপকালেই তো আবার ফাইনাল। ইতিহাসের দায়শোধের আরেকটি সুযোগ। সেটি কি আর হাতছাড়া করতে চাইবে নেদারল্যান্ডস? বিশেষত আরিয়েন রবেন! গত ফাইনালে সহজতম সুযোগ মিসের প্রায়শ্চিত্তের জন্য প্রতিশোধে মত্ত সিংহের মতো তেতে আছেন যিনি!
আজ আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস মহারণ তাই এক অর্থে মেসির অমরত্বে উত্তরণ ও রবেনের প্রায়শ্চিত্তের মিশনও!
১৯৯০ বিশ্বকাপের পর এবার আবার সেমিফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। তবে এটি কিন্তু মোটেও চমক জাগানিয়া না। গ্রুপ পর্বে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, ইরান ও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্টে তারা আসে দ্বিতীয় রাউন্ডে। সেখানে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়েছে অতিরিক্ত সময়ে দেওয়া আনহেল দি মারিয়ার গোলে। আর কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়ে একমাত্র গোল গনসালো হিগুয়েইনের। আলেসান্দ্রো সাবেইয়ার দলের পাঁচ প্রতিপক্ষের নামেই স্পষ্ট, সেখানে জয়গুলো প্রত্যাশিত ছিল তাঁদের।
নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রে তা আবার তত জোর দিয়ে বলা যায় না। বরং স্পেন-চিলি-অস্ট্রেলিয়া গ্রুপসঙ্গী হওয়ায় ডাচদের নকআউট পর্বে না যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল জোরালো। কিন্তু সেটি কী জাদুবলেই না অদৃশ্য করে দিল লুই ফন হালের দল! প্রথম ম্যাচে গত ফাইনালে হারের প্রতিশোধ নিয়ে স্পেনকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়াতে ছিল নেদারল্যান্ডসের সামর্থ্যরে সদম্ভ উচ্চারণ। অস্ট্রেলিয়া-চিলির বিপক্ষে জয়ে আর্জেন্টিনার মতো গ্রুপ পর্বে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট তাদের। এরপর নকআউট পর্বেও ধুঁকতে হয়েছে ‘আলবিসেলেস্তে’দের মতো। মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ সময়ের দুই গোলে হারতে হারতে জয় আর কোস্টারিকার বিপক্ষে টাইব্রেকার-জুয়ার জেতা- এই তো ডাচদের এবড়োখেবড়ো পথে চলা। যাদের ঘিরে আশঙ্কা ছিল প্রথম পর্বে বিদায়ের, শেষ চারে উত্তরণ তো তাদের ক্ষেত্রে অনেক বড় অর্জন। তাহলে আরেক ধাপ এগিয়ে গতবারের প্রায়শ্চিত্তের মঞ্চে কেন পৌঁছতে চাইবে না ডাচরা!
ম্যাচের আগে আর্জেন্টাইন ক্যাম্পে আশা-হতাশার যুগল খবর। ইনজুরির কারণে আনহেল দি মারিয়ার খেলা হচ্ছে না। কিন্তু ইনজুরি থেকে সেরে ওঠায় সের্হিয়ো আগুয়েরো ফিরছেন হয়তো। মেসির পাশাপাশি অন্য সতীর্থরা জ্বলে ওঠায় জয়ের সম্ভাবনার পারদ বাড়ছে চড়চড় করে। ওদিকে ডাচ ক্যাম্পে খানিকটা অনিশ্চয়তা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার রন ফ্লারকে নিয়ে। আর আগে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার ঘোষণা দিলেও অবিশ্বাস্যভাবে সেরে ওঠায় নিজেল দি ইয়ং নাকি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আজ একাদশে ফিরতে পারেন।
তবে যাঁরাই খেলুন, আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডসের মহারণ শেষ পর্যন্ত পরিণত হতে পারে ব্রাজিল বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আলো ছড়ানো দুই জাদুকরের দ্বৈরথে। লিওনেল মেসির সঙ্গে আরিয়েন রবেনের। একজনের সামনে অমরত্বের হাতছানি, অন্যজনের প্রায়শ্চিত্তের উপলক্ষ।

আর আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস? ২৮ বছরের ট্রফির হাহাকার ঘোচানোর শেষ ধাপে পৌঁছার মিশন ‘আলবিসেলেস্তে’দের। ‘অরেঞ্জ’দের সেখানে পৌঁছার ধারাবাহিকতায় অনন্ত আক্ষেপ দূর করার অভিযান। কখনোই যে বিশ্বকাপ জেতা হয়নি তাদের!

মন্তব্য