kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

তালপট্টি পড়েছে ভারতে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক    

৯ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তালপট্টি পড়েছে ভারতে

অতীতের সরকারগুলোর নিষ্ক্রিয়তার প্রভাব পড়ল তলিয়ে যাওয়া তালপট্টি দ্বীপ এলাকার সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায়। ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলার ডেপুটি এজেন্ট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমুদ্রবিষয়ক ইউনিটের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম গতকাল মঙ্গলবার বলেন, তালপট্টি দ্বীপকে বাংলাদেশের বলে দাবি করলেও অতীতের কোনো সরকার দেশের মানচিত্রে তা নিজেদের বলে দেখায়নি। ভারতের সঙ্গে মামলা দায়েরের পর বিগত মহাজোট সরকার মানচিত্র সংশোধন করে তালপট্টিকে বাংলাদেশের মধ্যে দেখালেও আদালত তা গ্রহণ করেননি দীর্ঘদিন তা মানচিত্রে অনুপস্থিত থাকার অজুহাতে। হেগের স্থায়ী সালিসি আদালতের দেওয়া রায়ে ওই এলাকা ভারতের অংশে পড়েছে।
খুরশেদ আলম বলেন, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর জেগে ওঠা ওই দ্বীপ ফের ডুবে যায় ১৯৮৫ সালে। এর পর থেকে আর ওই দ্বীপের অস্তিত্ব নেই। তিনি ওই এলাকার ১৯৮৯ সালের ও গত বছরের ২৪ অক্টোবরের উপগ্রহচিত্র সংবাদ ব্রিফিংয়ে দেখান, যেখানে কোনো দ্বীপ ছিল না, শুধু পানি দেখা যায়। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে ভারতের একজন গবেষকও বলেছেন- ‘নিউ মুর (ভারতীয়রা তালপট্টিকে নিউ মুর নামে ডাকে) ইজ নো মোর’ (নিউ মুর আর নেই)।
খুরশেদ আলম আরো বলেন, ভারত বিমান থেকে ইনফ্রা-রে ক্যামেরা দিয়ে বিচারকদের তালপট্টি এলাকাকে দ্বীপ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। সেখানেও কোনো দ্বীপ দেখা যায়নি। এগুলো আদালতের ওয়েবসাইটে তথ্য-উপাত্ত আকারে আছে।
খুরশেদ আলম বলেন, ১৯৪৭ সালের র‌্যাডক্লিফের মানচিত্র অনুযায়ী সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছে, আর তালপট্টি এলাকাটি ভারতের দিকে পড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যত মানচিত্র আমরা প্রকাশ করেছি আশির দশক থেকে, সেগুলোর কোনোটিতেই তালপট্টি আমাদের দেখানো হয়নি।’ তিনি ২০০৯ সাল পর্যন্ত করা বেশ কয়টি রাজনৈতিক মানচিত্র দেখান, যেখানে কোনোটিতেই তালপট্টি ছিল না। সেখানে তালপট্টি এলাকার কাছাকাছি এসে সীমানারেখা বাঁকা হয়ে গেছে। এর ফলে তালপট্টি বরাবরই বাংলাদেশের সীমানার বাইরে দেখানো ছিল। তিনি বলেন, ‘অতীতে আমরা হয়তো দাবি করেছি কিন্তু কেউই খেয়াল করে মানচিত্রে ওই কাজটি (তালপট্টিকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত করা) করিনি।’
এ সময় সাংবাদিকদের একজন মন্তব্য করেন, ‘দ্বীপ হলে আমাদের, আর না হলে তাদের!’
এর প্রতিক্রিয়ায় খুরশেদ আলম বলেন, ‘এটি হেঁয়ালি প্রশ্ন নয়, আইনি প্রশ্ন। ১৯৪৭ সালের র‌্যাডক্লিফের সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে রেখা যেদিকে যাবে, সেটি বাংলাদেশ কেন ভারতেরও না মানার কোনো কারণ নেই। আমাদের দরকার ছিল এসব জিনিস আগে সংশোধন করা। আমরা মানচিত্র সংশোধন করেছি ২০১০ সালে। কিন্তু আদালত তা গ্রহণ করেননি। আদালত বলেছেন দীর্ঘ সময় ধরে এটি মানচিত্রে ছিল না।’
এরপর বাংলাদেশের পক্ষে মামলার এজেন্ট সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা যে প্রশ্নগুলো করছেন, সেগুলো আমাদের মনের মধ্যেও আছে। দেশের আদর্শ একটি মানচিত্র আমাদের ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘১৯৮০ সাল থেকে আমাদের যতগুলো মানচিত্র প্রণীত হয়েছে, যে সংস্থাই করুক, ঠিক কী কারণে তালপট্টি দ্বীপকে ভারতের দিকে দেখিয়েছেন- এ প্রশ্ন তো উঠতেই পারে। আমরা যখন এ দাবি উপস্থাপন করি, মামলা করি, আমরা আমাদের সমস্ত মানচিত্র পর্যালোচনা করে দেখি যে নানা রকম মানচিত্র, কোনো একটি আদর্শ মানচিত্র নেই। একেক প্রতিষ্ঠানের মানচিত্র একেক রকম তথ্য দিচ্ছে। তখন আমরা সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশের একটি আদর্শ মানচিত্র ২০১০ সালে প্রণয়ন করি।’
দীপু মনি আরো বলেন, ‘প্রথম কথা তালপট্টি এখন আর নেই। দ্বিতীয়ত, তালপট্টি যে জায়গায় ছিল সেই ক্ষুদ্র জায়গা সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে ভারতের দিকে পড়লেও নিচের দিকে বিশাল বড় এলাকায় আমরা আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। সার্বিকভাবে আমাদের যে চাওয়া ছিল, তার প্রায় পুরোটাই আমরা পেয়েছি।’
উল্লেখ্য, আশির দশকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়ে বিরোধ হয়েছিল বাংলাদেশ ও ভারতের। উভয় দেশ এই দ্বীপকে নিজের বলে দাবি করেছিল। ওই এলাকার বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা বিভাজক হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মূল স্রোত যেহেতু দ্বীপের পশ্চিম ভাগ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, সেহেতু ‘নদীর মূল স্রোতধারার মধ্যরেখা নীতি’ অনুযায়ী বাংলাদেশ ওই দ্বীপটিকে নিজের দাবি করেছিল। অন্যদিকে ভারতের দাবি ছিল, নদীর মূল স্রোত পরিবর্তনশীল। ভারত ১৯৮১ সালে সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তাদের পতাকা ওড়ায়। বর্তমানে ওই দ্বীপটি কয়েক ফুট পানির নিচে ডুবে আছে।

মন্তব্য