kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৯ জুলাই ২০২১। ১৮ জিলহজ ১৪৪২

ভাব-সম্প্রসারণ

অষ্টম শ্রেণি-বাংলা

আতাউর রহমান সায়েম, সহকারী শিক্ষক, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা

২১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অষ্টম শ্রেণি-বাংলা

ভাব-সম্প্রসারণ

১.   এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরিভূরি রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।

ভাব-সম্প্রসারণ

বিত্তবানদের সম্পদের তৃষ্ণা অত্যন্ত প্রবল। তারা যত পায়, ততই চায়। গরিবের ধন কুক্ষিগত করে তারা আরো সম্পদশালী হতে চায়।

ধন-সম্পদ উপার্জনের অদ্ভুত রকমের তৃষ্ণা মানুষকে ক্রমাগত তাড়িত করে। মানুষ স্বভাবতই যত পায়, তত চায়। তার চাওয়ার শেষ নেই। এ জগতে যার যত বেশি আছে, সে তত বেশি চায়। যে লাখ টাকার মালিক, সে কোটিপতি হতে চায়। যার কোটি টাকা আছে, সে হাজার কোটি টাকা পেতে চায়। রাজার বিপুল সম্পদ আছে, তবু তার রাজ্য জয়ের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। কেননা তার আরো সম্পদ চাই। আরো ভোগ, আরো বিলাসিতা প্রয়োজন তার। এই আরো পাওয়ার ইচ্ছা মানুষকে অমানুষ করে তোলে। নিজের মানবতাকে বিসর্জন দিয়ে, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তারা গরিবের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। তারা তাদের ভোগ-লালসা মেটাতে গরিবের সামান্য সম্পদ আত্মসাৎ করে নিজেরা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। ধনীদের এই লোভে সমাজের দীনহীন গরিব মানুষগুলো প্রতিনিয়ত হচ্ছে প্রতারিত; সহায়-সম্বলহীন পথের ফকির। এতে ধনীদের মনে সামান্যতম করুণাও হয় না। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় দেখা যায়, জমিদারের অনেক সম্পত্তি আছে, তবু সে উপেনের মাত্র দুই বিঘা জমিও জোর করে কেড়ে নেয়। আবু ইসহাকের ‘জোঁক’ গল্পে দেখা যায়, অর্থশালী ওয়াজেদ চৌধুরী ও তার ছেলে ইউসুফ দুজনে মিলে ওসমান ও করিম গাজীর মতো অনেক গরিব অসহায় নিরক্ষর কৃষকের সঙ্গে চালাকি করে ঠকিয়েছে। আবুল মনসুর আহমদের ‘ফুড-কনফারেন্স’ গল্পেও দেখা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য সরকারিভাবে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ হলে গ্রামের মাতব্বর, চেয়ারম্যান, মেম্বার সাধারণ মানুষকে সামান্য ত্রাণসামগ্রী দিয়ে নিজেরাই অনেক বেশি ভাগবাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করে নিয়েছে।   

     পুঁজিবাদী ধনিক শ্রেণির শোষণভিত্তিক এ সমাজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গ্রাস করছে অনাহারী, নিপীড়িত দরিদ্র মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদ। সমাজের বিত্তবান এসব অতৃপ্ত মানুষের সর্বগ্রাসী আকাঙ্ক্ষা সামাজিক বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলছে বহুগুণে। তাই এ ক্ষেত্রে সমাজে শান্তি ফিরে আনার জন্য অবৈধ ধনিক শ্রেণির মানুষের লোলুপ চাহিদা পরিহার করে ধর্মীয় অনুশাসনে মানবিক হওয়া, যাতে তারা গরিব শ্রেণির মানুষের ওপর আর যেন জুলুম না করে।

২.   করিতে পারি না কাজ সদা ভয়, সদা লাজ সংশয়ে সংকল্প সদা টলে পাছে লোকে কিছু বলে।

ভাব-সম্প্রসারণ

কোনো কাজ করতে গেলে কেউ কেউ অনেক সময় দ্বিধাগ্রস্ত হয়। কে কী মনে করবে, কে কী সমালোচনা করবে—এই ভেবে তারা বসে থাকে। কিন্তু যাঁরা সমাজে অবদান রাখতে চান, তাঁদের দ্বিধা করলে চলবে না।

 মানুষের জীবন কর্মমুখর। কাজের মাধ্যমেই মানবজীবনের সফলতা আসে। কাজ করতে গেলে ভুল হয় এবং ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষ তার জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এ পৃথিবীতে সবাই কর্মী নয়। কিছু অলস-অকর্মণ্য মানুষ আছে, যারা সব সময় অন্যের পেছনে লেগে থাকে। তাদের কাজের খুঁত ধরে, অন্যায় সমালোচনা করে। ফলে অনেক সময় কোনো কাজ করতে গেলে কেউ কেউ দ্বিধাগ্রস্ত হয়। কে কী মনে করবে, কে কী সমালোচনা করবে—এসব ভেবে তারা বসে থাকে। যার জন্য কাজ এগোয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ উপন্যাসে দেখা যায়, যুবক আক্কাস আলী গ্রামের ছেলে-মেয়েদের অজ্ঞতা, কুসংস্কার থেকে দূরে থাকার জন্য আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভণ্ড মজিদ মাজারকেন্দ্রিক পীরের ব্যবসা ক্ষতি হবে ভেবে আক্কাস আলীর মুখে দাড়ি নেই বলে অপমান করে এবং মাতব্বর খালেক ব্যাপারীকে হাত করে আক্কাস আলীর স্কুল প্রতিষ্ঠা বানচাল করে দেয়। ফলে আক্কাস আলী অন্যের সমালোচনার কারণে পরে আর স্কুল প্রতিষ্ঠায় কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। তাই যাঁরা সমাজে অবদান রাখতে চান, তাঁদের দ্বিধা করলে চলবে না। দৃঢ় মনোবল নিয়ে লোকলজ্জা ও সমালোচককে উপেক্ষা করতে হবে। মানুষের কল্যাণে মহৎ কাজ করতে হলে ভয়ভীতি, সংকোচকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা জানি যে গোঁড়া হিন্দুদের তুমুল সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। তিনি আইনের যুক্তির লড়াইয়ের মাধ্যমে ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা সমাজে বন্ধ করে দেন। সমাজসংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগরও হিন্দুদের বিধবা বিবাহ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের ছেলেকে ১৮৫৬ সালে এক বিধবা মহিলার সঙ্গে নিকাহ দেন। মুসলিম সমাজেও অনেক সমালোচনা লক্ষ করা যায়। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যে সময়ে লেখালেখি করছিলেন, সে সময় সমাজে মুসলিম পরিবারে নারীদের শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে অনেক বাধা ছিল। সমাজে অনেক সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আর বর্তমানে সমাজে কত লোকের সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী সাংবাদিকতা, পুলিশ, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীসহ বিভিন্ন পেশায় যোগ্যতার সঙ্গে পুরুষের পাশাপাশি অবদান রাখছেন।

সমাজে কিছু মানুষ সমালোচনা করলেও কাজ ফেলে বসে থাকা যাবে না; বরং দৃঢ় মনোবল দিয়ে লোকলজ্জা ও সমালোচনাকে উপেক্ষা করতে হবে। মানুষের কল্যাণে মহৎ কাজ করতে হলে ভয়ভীতি, সংকোচ উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব এবং উন্নয়ন করতে পারব।