kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নবম শ্রেণি ► বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অ্যা সা ই ন মে ন্ট - ১

২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নবম শ্রেণি ► বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

তোমরা নিশ্চয়ই অবগত আছ যে ‘কভিড-১৯’ মহামারির কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কর্তৃক সংক্ষিপ্ত ও পুনর্বিন্যাসকৃত সিলেবাসের আলোকে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই মূল্যায়নের মাধ্যমে তোমাদের অর্জিত শিখনফলের দুর্বলতা চিহ্নিত করে পরবর্তী ক্লাসে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাই নির্দেশিত অ্যাসাইনমেন্টটি ভালো মানের করার জন্য নিচের বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখবে।
                        ♦ বিষয়বস্তুর সঠিকতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
                        ♦ লেখায় তথ্য, তত্ত্ব, সূত্র ও ব্যাখ্যা পাঠ্য বইয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।
                        ♦ নিজস্বতা ও সৃজনশীলতা বজায় রাখবে।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের নমুনা অ্যাসাইনমেন্ট-১ তৈরি করেছেন ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের সহকারী শিক্ষক আফরোজা বেগম

কাজ-১ :

 

পূর্ব বাংলার আন্দোলন জাতীয়তাবাদের উত্থান

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। অপর অংশটি পশ্চিম পাকিস্তান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শুরু থেকেই পাকিস্তানের শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানের ধনিকগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। পূর্ব বাংলার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের করায়ত্ত করতে শুরু করে এবং বৈষম্য সৃষ্টি করে। এর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণ প্রতিবাদ ও আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলে। মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করার জন্য ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী বাঙালি জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়। মাতৃভাষা রক্ষার চেতনা থেকে পূর্ব বাংলার জনগণ ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন—সংগ্রাম ও গণ-অভ্যুত্থান গড়ে তোলে। বাংলা ভাষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতিগত পরিচয়ে জাতীয় ঐক্য গঠিত হয়। এই জাতীয় ঐক্যই বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল।

 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষে ভাষা আন্দোলন

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমেই জানতে হবে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি।

 

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি

পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই এই রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগের দাপ্তরিক ভাষা উর্দু করার প্রস্তাব করলে বাঙালিদের নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এর বিরোধিতা করেন। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তান নামের একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, তখনই বিতর্কটি আবার শুরু হয়।

১৯৪৭ সালের ১৭ মে চৌধুরী খলীকুজ্জামান এবং জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন। তাঁদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার ভাষাবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহাম্মদ এনামুল হকসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী প্রবন্ধ লিখে প্রতিবাদ জানান।

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মিছিল, সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারিসহ সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের ভাষা হিসেবে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের দাবি জানান। তাঁর দাবি অগ্রাহ্য হলে ২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠিত হয়। এ সংগঠন ১১ মার্চ ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ পালনের ঘোষণা দেয়। ওই দিন সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এ কর্মসূচি পালনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানসহ মিছিল ও পিকেটিং করা অবস্থায় শেখ মুজিব, শামসুল হক ও অলি আহাদসহ ৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলা ভাষার জন্য প্রথম রাজবন্দিদের শীর্ষস্থানীয় ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেপ্তার, নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকায় ১৯৪৮ সালের ১২-১৫ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়। বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আট দফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনেও তিনি অনুরূপ ঘোষণা দিলে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে এবং না না বলে তাঁর উক্তির প্রতিবাদ জানায়। একপর্যায়ে পাকিস্তান সরকার আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের উদ্যোগ নিয়েছিল। বাঙালিরা এ অপপ্রয়াসের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই পূর্ব বাংলায় ভাষাকেন্দ্রিক যে আন্দোলন শুরু হয় তা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আস্থার বহিঃপ্রকাশ। মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণ জাতীয়ভাবে নিজেদের বিকাশের গুরুত্ব উপলব্ধি করে।

 

রক্তঝরা ১৯৫২ সাল

১৯৫২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন জিন্নাহর অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার নতুন ঘোষণা প্রদান করেন। এর প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করে। আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ নতুনভাবে গঠিত হয়। নতুনভাবে আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোও যুক্ত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট এবং ওই দিন রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

ভাষার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ঘোষণা করা হয়। কারাবন্দি নেতা শেখ মুজিব ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি পালনে ছাত্র ও আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের ডেকে পরামর্শ দেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য শেখ মুজিব ও সহবন্দি মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে মহিউদ্দিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে শেখ মুজিব রাজবন্দিদের মুক্তি ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করলে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সরকারি এক ঘোষণায় ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। সভা-সমাবেশ, মিছিল এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। আন্দোলনের নেতারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগের পাশে) একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১০ জন করে মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিক থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল এগিয়ে চলে। পুলিশ প্রথমে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে এবং মিছিলে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে আবুল বরকত, জব্বার, রফিক, সালামসহ আরো অনেকে শহীদ হন। অনেকে আহন হন। ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশাল শোকযাত্রা বের করা হয়; কিন্তু সেখানে পুলিশের হামলায় শফিউর রহমান শহীদ হন।

শহীদদের স্মৃতি অমর করে রাখার জন্য ঢাকায় ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতা মেডিক্যাল কলেজের সামনে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে এবং শফিউরের বাবাকে দিয়ে ওই দিনই তা উদ্বোধন করা হয়। ২৪ তারিখ পুলিশ উক্ত শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এ সময় অনেক কবি-সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচনা করেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র  করে পূর্ব বাংলায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি আপামর জনসাধারণ ভাষার দাবিতে আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা পোষণ শুরু করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। ১৯৪৭ সালে সূচিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালে প্রতিবাদ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে রূপ লাভ করে। ফলে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে। পাকিস্তানের প্রতি আগে যে মোহ ছিল তা দ্রুত কেটে যেতে থাকে। নিজস্ব জাতিসত্তা সৃষ্টিতে ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক এবং গুরুত্ব পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে অধিকতর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাঙালি হিসেবে নিজেদের আত্মপরিচয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে থাকে। ভাষাকেন্দ্রিক এই ঐক্যই জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি রচনা করে, যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অ্যাসাইনমেন্ট-১-এর বাকি অংশ (কাজ-২) আগামী সংখ্যায়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা