kalerkantho

শনিবার । ২০ আষাঢ় ১৪২৭। ৪ জুলাই ২০২০। ১২ জিলকদ  ১৪৪১

পিছিয়ে নেই মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত হয় স্টুডেন্টস উইং। দেশজুড়ে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই সংগঠন। তাদের নানা কাজের বিবরণ তুলে ধরেছেন মুনতাসির সিয়াম

৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পিছিয়ে নেই মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজমুল রাফি কিছুদিন আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। অন্যান্য আক্রান্ত মানুষের মতোই তার মনেও ছিল মৃত্যুর ভয়। পর্যাপ্ত চিকিত্সা ও আইসিইউর অভাবে যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের কথা লিখে ফেসবুকে একটি পোস্টও দেন। হূদয়বিদারক পোস্টটি চোখে পড়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত ডক্টরস ফাউন্ডেশনের মডারেটর আব্দুল্লাহ ইব্রাহিমের। সঙ্গে সঙ্গে রাফি ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাহস দেন। ফাউন্ডেশনের ডক্টরস জোনের মাধ্যমে ছেলেটার চিকিত্সায়ও সাহায্য করা হয়। রাফি এখন তাঁকে নিজের ভাইয়ের চোখেই দেখে। এমন ভালোবাসা পেয়ে কাজ করার আগ্রহটা আরো বেড়ে গেছে, জানালেন ইব্রাহিম।

বর্তমানে এই জোনের সদস্যসংখ্যা ২০০ জনের মতো। যাদের প্রত্যেকের পরিচয় মডারেটর। মডারেটররা কাজ করে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক এলাকায়। এদের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজের চিকিত্সক ডাক্তার আশরাফুল ইসলাম তাজিন।

স্টুডেন্টস উইং জোনটি কাজ করে মূলত মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে। তাদের বিভিন্ন সমস্যায় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়াই এই জোনের মূল লক্ষ্য। নিজ উদ্যোগেও সদস্যরা বিভিন্ন কাজে অংশ নেয়। করোনা মহামারিতেও ব্যতিক্রম হয়নি। দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার তথ্যগুলো জোগাড় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্টুডেন্টস উইং।  এর ওপর ভিত্তি করেই ডক্টরস জোন প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেতন-ভাতা ঠিকভাবে প্রদানের ব্যাপারে চিঠি পাঠিয়েছে।

নওগাঁ মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী হুমায়রা জাহানের বাবার ব্রেন টিউমারের খবর জেনে তাদের সহযোগিতার কাজেও এগিয়ে এসেছে স্টুডেন্টস উইং জোনের সদস্যরা। চিকিত্সা খরচের জন্য ডক্টরস জোনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থ সংগ্রহও করছে। বিডিএফের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হুমায়রা বলেন, ‘বাবার ব্রেন টিউমারের চিকিত্সা খরচ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না আমাদের পক্ষে। ব্যাপারটা জেনে চিকিত্সার পুরো খরচটাই সংগ্রহ করে দেওয়ার ভরসা দিয়েছে বিডিএফ। প্রয়োজনীয় দুই লাখ টাকার মধ্যে এক লাখ টাকা সংগ্রহও করেছেন তাঁরা। সে জন্যই মনের সাহস ফিরে পেয়েছি আবার।’

নানা ধরনের কাজই করছে তারা। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী মডারেটর আল ইমরান জানালেন তাঁর অভিজ্ঞতা। গত শীতে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অসহায় মানুষের জন্য পুরনো শীতবস্ত্র সংগ্রহ করতে শুরু করেন ইমরান ও তাঁর টিম। এক রাতে সংগ্রহ করা শীতবস্ত্রগুলো তিনটি সিএনজিতে ভর্তি করে নিয়ে যান রেলওয়ে স্টেশনে। উত্তরবঙ্গে এমনিই শীতের মাত্রাটা বেশি। যেখানে ভারী ভারী শীতের জামাকাপড়ও রক্ষা করতে পারে না মানুষের কাঁপুনি সেখানে অসহায় মানুষগুলো সামান্য ছেঁড়া-ফাঁড়া কাপড় গায়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। কেউবা আবার বসে বসে কাঁপছে। তাদের হাতে এক এক করে তুলে দেওয়া হয় শীতবস্ত্রগুলো। সামান্য শীতের কাপড় পেয়ে মানুষগুলো এত সুন্দর করে হেসেছিল সেদিন! তখনই ইমরানের মনে হয়েছিল আরো বেশি বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। এখনো সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস। করোনাদুর্গত মানুষের মুখেও হাসি ফোটাচ্ছেন তাঁরা। 

তবে মানুষের জন্য কাজ করা অনেক সময় কঠিনও হয়ে যায়। তেমনই একটা ঘটনা ঘটেছিল গত বছর নভেম্বর মাসে, জানালেন রেজওয়ানা সুলতানা পূর্ণতা। পূর্ণতা রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ডেন্টাল ইউনিটের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। ঘটনার সূত্রপাত ২৫ তারিখ সন্ধ্যায় ওয়ার্ডে রোগী দেখার সময়। একজন সিনিয়র নার্স ইনজেকশন দিচ্ছিলেন। নার্সের অসাবধানতায় ইনজেকশন এমপুলের ওষুধ গিয়ে ছিটকে পড়ে রোগীর চোখে। উপস্থিত দুজন নারী ইন্টার্ন চিকিত্সক তাকে সাবধানে ওষুধ দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু বয়সে ছোট ও জুনিয়র চিকিত্সকের সেই কথাগুলো গায়ে লেগে যায় নার্সের। এতে অপ্রীতিকর এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অ্যাসোসিয়েশনে গিয়েও অভিযোগ করেন নার্স। এরপর চিকিত্সক, নার্স এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে সমাধান হয় ঘটনার। তবে স্থানীয় নার্স সমাধানে খুশি না হয়ে অনেক লোকজন নিয়ে এসে হুমকি দেন। ঘটনা জানতে পেরে বিডিএফ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন পূর্ণতা। ফাউন্ডেশনের ডক্টরস জোনের সদস্যদের উদ্যোগে শেষাবধি ভুল স্বীকার করে ক্ষমাও চান নার্স। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে দুই ইন্টার্ন চিকিত্সকের নিরাপত্তার দিকটিও নিশ্চিত করা হয়। নার্সের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তির প্রভাব থাকায় বিডিএফের কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। তবু কাজটা তারা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে।    

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে স্টুডেন্টস উইং নিজ উদ্যোগেও বিভিন্ন কাজ করছে, জানালেন মডারেটর আব্দুল্লাহ ইব্রাহিম। গেল রমজানে তিনজন মডারেটরের উদ্যোগে কিশোরগঞ্জ ও ফরিদপুরের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ১৬০ জন অসহায়ের মধ্যে খাদ্য ও ইফতারি বিতরণ করা হয়েছে। রোগীদের জরুরি অবস্থায় ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যথাসাধ্য ব্যবস্থা করা হচ্ছে আইসিইউর। জরুরি হেল্প লাইনে যোগাযোগ করে অসহায় রোগীদের চিকিত্সায় সহযোগিতাও করছেন স্টুডেন্টস উইংয়ের সদস্যরা। কোনো শিক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের চিকিত্সা নিশ্চিত করার দায়িত্বও পালন করে আসছে।

অন্যান্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো এখন ক্লাস হচ্ছে না মেডিক্যাল কলেজগুলোতেও। এর পরও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে বেতনের বোঝা।  এটা মওকুফের জন্যও কাজ করছে স্টুডেন্টস উইং। 

ঈদে বিভিন্ন ক্যামপাস মডারেটররা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন। অনলাইন কার্যক্রমেও পিছিয়ে নেই। করোনার বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও আক্রান্ত ডাক্তারদের তালিকা পোস্টার আকারে প্রচার করে চলেছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে।

স্টুডেন্টস উইংয়ের সাহায্য পেয়েছেন কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী আকরাম উল্লাহ। মায়ের করোনাভাইরাস টেস্ট পজিটিভ আসায় ভর্তি করিয়েছিলেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে। কিন্তু কোনো আইসিইউ খালি না থাকায় পর্যাপ্ত চিকিত্সা পাচ্ছিলেন না আকরামের মা। আকরাম বললেন, ‘আইসোলেশন অবস্থায় মায়ের অবস্থার অবনতি ঘটছিল ক্রমশ। তখন আমি স্টুডেন্টস উইংয়ের গ্রুপে সাহায্যের জন্য পোস্ট দিই। এরপর আইসিইউ খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার মডারেটরদের মাধ্যমে ব্যবস্থা করে দেয় বিডিএফ। তবে মাকে বাঁচানো যায়নি। কিন্তু নিরুপায় সেই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় সব সাহায্য পেয়েছি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে।’

মন্তব্য