kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

প্রতিযোগিতা

অন্যরকম পুরস্কার

অদ্ভুত ঘটনার কমতি নেই বইয়ের রাজ্যেও। যেমন এই পুরস্কারগুলো। গল্প শোনাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



অন্যরকম পুরস্কার

এবারের প্রতিযোগিতায় মনোনীত পাঁচটি বই নিয়ে কথার যুদ্ধ চালাচ্ছেন এই পাঁচজন

ডায়াগ্রাম পুরস্কার

বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী বইমেলাটি হয় জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে। জোহান্স গুটেনবার্গ প্রথম ছাপাখানার মেশিনটি বানিয়েছিলেন ফ্রাংকফুর্টের পাশের শহর মেইঞ্জে বসে। তার কিছুদিনের মধ্যেই ১৪৫৪ সালে এখানে প্রথম বইমেলা হয়।

১৯৭৮ সালে এই মেলায়ই এক অদ্ভুত পুরস্কারের প্রচলন করা হয়। ভাবনাটা প্রথম এসেছিল লন্ডনের ‘ডায়াগ্রাম গ্রুপ’ নামের একটি ভিজ্যুয়াল আর্ট ও গ্রাফিকস কম্পানির দুই কর্মীর মাথায়—ব্রুস রবিনসন ও ট্রেভর বওনফোর্ড। মেলায় প্রকাশিত হাজার হাজার বইয়ের মধ্য থেকে সবচেয়ে অদ্ভুত নামের বইটা বেছে নেওয়া হবে। নাম ঠিক করা হলো ‘ডায়াগ্রাম গ্রুপ প্রাইজ ফর দ্য অডেস্ট টাইটেল’। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হলো ব্রিটিশ ম্যাগাজিন ‘দ্য বুকসেলার’। প্রকাশনা জগতের খবরাখবর নিয়েই তাদের কারবার। পুরস্কারের নতুন নাম হলো ‘বুকসেলার/ডায়াগ্রাম প্রাইজ ফর অডেস্ট টাইটেল অব দ্য ইয়ার’। তবে সংক্ষেপে সবাই একে ডায়াগ্রাম পুরস্কার হিসেবেই চেনে।

প্রথমে ঠিক করা হয়েছিল, শুধু মেলায় প্রকাশিত বইগুলোর মধ্য থেকেই বিজয়ী বাছাই করা হবে। কিন্তু পরে সে প্রতিযোগিতা করে দেওয়া হলো উন্মুক্ত। ১৯৮২ সাল থেকে পুরস্কারের দায়িত্ব নিলেন বুকসেলারের ডায়রিস্ট হোরাস বেন্ট। পরে বই প্রস্তাবের অধিকার দেওয়া হলো বুকসেলারের নিয়মিত পাঠকদেরও। তবে শর্ত রইল, লেখক বা প্রকাশক নিজের বইয়ের নাম প্রস্তাব করতে পারবেন না। শুধু তা-ই নয়, অনেকেই ইচ্ছা করে বইয়ের অদ্ভুত নাম রাখে। সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো, সে বইগুলো প্রতিযোগিতার জন্য বিবেচিত হবে না।

২০০০ সালে পুরস্কার প্রদান প্রক্রিয়ায় এলো আরেক দফা বড় পরিবর্তন। বিজয়ী নির্বাচনে শুরু হলো ভোট নেওয়া। আর ২০০৯ সালে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক হয় ডায়াগ্রাম পুরস্কার। তখন থেকে বইয়ের নাম প্রস্তাব করা যায় টুইটারেও। এতে অদ্ভুত নামের বইয়ের খোঁজ মেলে আগের বছরের তিন গুণ।

এই পুরস্কারের অবশ্য তেমন একটা অর্থমূল্য নেই। এমনকি প্রতীকী পুরস্কারটি বইয়ের লেখক বা প্রকাশকের নয়, ওঠে প্রস্তাব করা ব্যক্তির হাতে! তবে লেখক-প্রকাশকের লাভ নিতান্ত কম হয় না। কারণ মেলায় তো বটেই, এর পরেও বইপাড়ায় আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকে পুরস্কারপ্রাপ্ত বই। পুরস্কারটির জনপ্রিয়তা কেমন, তা একটি উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। ২০০৮ সালে ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য ভোট দিয়েছিলেন সাত হাজার ৮০০ জন। আর ডায়াগ্রাম পুরস্কারের জন্য সাড়ে আট হাজার!

এই ‘ভোটার’দের জন্যও আছে কিছু নির্দেশনা। বারবার বলে দেওয়া হয়, ভোট দেওয়ার আগে যেন কেউ বইটা না পড়েন। যাতে নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারেন, কোন নামটা বেশি অদ্ভুত। কারণ এমনিতে কোনো নাম যতই অদ্ভুত শোনাক, বিষয়বস্তু জানলে সেটা আর তেমন অদ্ভুত মনে হয় না। এই যেমন গত বছর এই পুরস্কার জেতা বইয়ের নাম ‘দ্য জয় অব ওয়াটারবয়লিং’। নামটা শুনে যতটা অদ্ভুত লাগছে, বিষয়বস্তু জানার পর আর তেমনটা লাগবে না। বইটা লেখা হয়েছে কেটলিতে রান্নার নানা রেসিপি নিয়ে। এ বছরের বিজয়ী বইয়ের নাম ‘দ্য ডার্ট হোল অ্যান্ড ইটস ভেরিয়েশন’। লেখা হয়েছে শিয়াল, নেকড়ে, বনবিড়াল, রেকুন ইত্যাদি ধরার জন্য গর্ত করে ফাঁদ বানানোর পদ্ধতির ওপর।

 

কানাডা রিডস

এই পুরস্কারটাকে বলা যায় বইয়ের জগতের সঙ্গে রেডিও-টিভির জগতের সফল মেলবন্ধন। ভাবনাটা প্রথম এসেছিল কানাডার জনপ্রিয় সিবিসি রেডিওর প্রযোজক পিটার কাভানাহর মাথায়। তিনি বই নিয়ে একটা আস্ত রেডিও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন। এবং সেটা এ বিষয়ক আর সব অনুষ্ঠানের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। অনেকটা ‘বইয়ের যুদ্ধ’ ধরনের আয়োজন।

২০০১ সালে এ অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করেন তিনি। তবে সেটির কাঠামো দাঁড় করান আরেক প্রযোজক তালিন ভার্তানিয়ান। কানাডা রিডস কর্তৃপক্ষ বইয়ের একটা লম্বা তালিকা প্রস্তুত করে। তারপর নির্ধারণ করা হয় পাঁচজন বিচারক। বইয়ের তালিকা বিচারকদের দেওয়া হয় বিবেচনার জন্য। অবশ্য বিচারক চাইলে এর বাইরের ভালো কোনো বইও বাছাই করতে পারেন। এই আয়োজনের জন্য প্রথমে পাঁচটি বই বাছাই করা হয়। শর্ত হলো, সেগুলো অবশ্যই কানাডার বই হতে হবে। ফিকশন (গল্প-উপন্যাস), কাব্যগ্রন্থ বা নাটকের বই—হতে পারে যে কোনোটাই। এমনকি অনুবাদের বইও বাদ যায় না। এই পাঁচটি বইয়ের পক্ষে লড়ার জন্য বেছে নেওয়া হয় পাঁচজনকে। অনুষ্ঠানের একেক পর্বে একেকজন তাঁদের জন্য বরাদ্দ বই নিয়ে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেন। সেগুলোর ভিত্তিতে বিচারকদের রায়ে প্রতি রাউন্ড শেষে একটি করে বই বাদ পড়ে। এভাবে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা বইটি বিজয়ী হয়।

সে বছরই সিবিসি রেডিওতে প্রচার হয় কানাডা রিডসের প্রথম সিজন। পরের বছর থেকে অনুষ্ঠানটি রেডিওর পাশাপাশি টিভিতেও সম্প্রচার শুরু হয়। ২০০৪ সালে ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি ভাষায়ও শুরু হয় এই প্রতিযোগিতা। নাম রাখা হয় ‘লা কোম্বা দে লিভঁ’। সোজা বাংলায় ‘বইয়ের যুদ্ধ’। গত বছর ফরাসি বইয়ের যুদ্ধে জিতেছে ব্লেস এনদালার ‘সঁ কাপত্ নি কালাশনিকভ’। ওকালতি করেছেন মারি মোদ দনি। আর আসলটায়, মানে কানাডা রিডসে জিতেছে ম্যাক্স আইসেনের ‘বাই চান্স অ্যালোন’। সে বইয়ের পক্ষে লড়েছেন জিয়া তং। এ বছরের ফরাসি লড়াই শুরু হবে আরো মাস দুয়েক পর। তবে কানাডায় লড়াইটা এরই মধ্যে হয়ে গেছে গত মাসেই। এতে বিজয়ী কে হবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী মাস পর্যন্ত।

প্রতিযোগিতাটির মূল উদ্দেশ্য মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানো। প্রতিযোগিতার জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে কানাডা রিডসের সাফল্য। শুধু বই পড়াই নয়, এই প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে বইয়ের বিক্রিও। প্রথম প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার পরের বছর ‘ইন দ্য স্কিন অব আ লায়ন’ বিক্রি হয়েছিল ৮০ হাজার কপি!

 

ওয়েভারটন গুড রিড অ্যাওয়ার্ড

এটিই একমাত্র ব্রিটিশ সাহিত্য পুরস্কার, যেটির বিচারক প্যানেলে কোনো বিশেষজ্ঞ থাকেন না। সাধারণ পাঠকরাই পছন্দ করেন তাঁদের প্রিয় বই। অবশ্য আরেকটা পুরস্কারের সঙ্গে এর মিল আছে। ফ্রান্সের ‘লা প্রি দে লা কাদিয়েঁ’। দেশটির লা কাদিয়েঁ দ’আজুঁ নামের এক গ্রামে দেওয়া হয় পুরস্কারটি। প্রবর্তন করেন ডাক্তার ফ্রাসোঁ দুফোঁ। তিনি খেয়াল করেছিলেন, ভালো বই রোগীদের ওপর ওষুধের মতোই কাজ করে। তাই পরিকল্পনা করেন গ্রামের সবাইকে বই পড়াবেন। সে জন্যই প্রতিযোগিতাটির আয়োজন করা হয়।

ফরাসি সেই গ্রামের জনসংখ্যা চার হাজার। আর ইংল্যান্ডের চেশায়ার কাউন্টির ওয়েভারটন গ্রামের জনসংখ্যা তার অর্ধেকেরও কম। আছে মাত্র একটি করে পোস্ট অফিস আর প্রাইমারি স্কুল। ছোট্ট সেই গ্রামটিতে ছিলেন দুইজন বইপাগল মানুষ। গোয়েন গোঢেও এবং ওয়েন্ডি স্মেডলি। ফরাসি প্রতিযোগিতাটির কথা শুনে তাঁদের ভীষণ পছন্দ হয়। ঠিক করেন, তাঁদের গ্রামেও এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করবেন।

সেই ভাবনা থেকেই তাঁরা ২০০৩ সালে চালু করেন ‘ওয়েভারটন গুড রিড অ্যাওয়ার্ড’। নিয়ম-কানুন ফরাসি প্রতিযোগিতাটির মতোই। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আগের বছরে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত কোনো লেখকের প্রথম বই। যাকে বলে ‘অভিষেক বই’। মনোনীত বইয়ের তালিকা জানিয়ে দেওয়া হয় গ্রামবাসীদের। তাঁরা নিজেদের মতো করে বইগুলো পড়ে ভোট দেন। তার ভিত্তিতে দেওয়া হয় পুরস্কার।

প্রথম বছরেই এই পুরস্কারের জন্য জমা পড়ে ৬৩টি বই! জুলাইয়ের মধ্যে সবাই বাছাই করে ফেলেন তাঁদের সবচেয়ে প্রিয় বই—মার্ক হ্যাডনের ‘দ্য কিউরিয়াস ইনসিডেন্ট অব দ্য ডগ ইন দ্য নাইট টাইম’। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার জন্য গ্রামে এক বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এখন তো এই নৈশভোজ হয়ে উঠেছে চেস্টার সাহিত্য উত্সবের অন্যতম আকর্ষণ। গত বছর সে নৈশভোজে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছিল ম্যারি লিন ব্রাখটের হাতে, তাঁর ‘হোয়াইট ক্রিসেনথিমাম’ বইয়ের জন্য।

 

দ্য লর্ড রুথভেন অ্যাওয়ার্ড

ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো ভৌতিক চরিত্রগুলোর একটি লর্ড রুথভেন। ১৮১৬ সালে প্রকাশিত হয় লেডি ক্যারোলাইন ল্যাম্বের গথিক উপন্যাস ‘গ্লেনারভন’। সেই উপন্যাসেই আবির্ভাব এই ভ্যাম্পায়ার লর্ডের। মজার ব্যাপার হলো, ল্যাম্ব চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন কবি লর্ড বায়রনের ছায়াবলম্বনে! তাঁদের সম্পর্ক যে খুব একটা ভালো ছিল না, তা বলাই বাহুল্য।

এমন একটি ঐতিহাসিক ভ্যাম্পায়ার চরিত্রের নামে যখন পুরস্কারের নাম, তখন বোঝাই যায়—এটা কোন ধরনের সাহিত্যের জন্য দেওয়া হয়। পুরস্কারটি দেয় ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য ফ্যান্টাস্টিক ইন দ্য আর্টস’ নামের একটি সংগঠন। তাদের কাজ-কারবার সায়েন্স ফিকশন, ফ্যান্টাসি ও হরর সাহিত্যকর্ম নিয়ে। তারাই এ পুরস্কার দেওয়ার জন্য কয়েকজন ভ্যাম্পায়ার সাহিত্যবিশারদকে নিয়ে প্রতিবছর একটি কমিটি গঠন করে দেয়। সেটার নাম ‘লর্ড রুথভেন অ্যাসেম্বলি’। তারাই এ পুরস্কারের বিজয়ীদের বাছাই করে।

পুরস্কারটি চালু হয় ১৯৮৯ সালে। তখন শুধু ভ্যাম্পায়ার ফিকশনকেই (গল্প-উপন্যাস) এ পুরস্কার দেওয়া হতো। ১৯৯৪ সালে নন-ফিকশন ক্যাটাগরিতেও পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। ২০০৩ সালে চালু হয়েছে আরেকটি ক্যাটাগরি—মিডিয়া/পপুলার কালচার।

২০১৮ সালে সেরা ফিকশন নির্বাচিত হয়েছে শার্লেইন হ্যারিসের ‘দ্য কমপ্লিট সুকি স্ট্যাকহাউস স্টোরিজ’। সেরা নন-ফিকশন গ্যারি স্মিথের ‘ভ্যাম্পায়ার ফিল্মস অব দ্য নাইনটিন সেভেন্টিজ’। আর মিডিয়া/পপুলার কালচার ক্যাটাগরিতে সেরা হয়েছে মার্কিন টিভি সিরিজ ‘মিডনাইট টেক্সাস’। ২০১৯ সালের পুরস্কার এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

বইয়ের রাজ্যে এমন অদ্ভুত পুরস্কারের উদাহরণ আছে আরো। এই যেমন বুলওয়ার-লিটন ফিকশন কন্টেস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান হোসে স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ এই প্রতিযোগিতার আয়োজক। তাতে পুরস্কার দেওয়া হয় বছরের সবচেয়ে বাজে প্রথম বাক্যের উপন্যাসকে। একে পুরস্কার না বলে তিরস্কার বলাই ভালো। যেন সেটা প্রমাণ করতেই পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় অল্প কিছু টাকা। দেওয়া হচ্ছে ১৯৮৩ সাল থেকে। গত বছর এটি পান ম্যাক্সওয়েল আর্চার। পরে ২০০১ সালে মার্কিন সাহিত্যিক অ্যাডাম ক্যাডার একই রকম আরেকটি পুরস্কারের (না তিরস্কারের?) প্রবর্তন করেন। তাতে বেছে নেওয়া হয় সবচেয়ে ছোট বাজে প্রথম বাক্য। এর নাম ‘লিটল লিটন কনটেস্ট’।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা