kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

করোনা

কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো

বাংলাদেশের বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে চীনের উহান টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলেন সুমাইয়া সন্ধি। বিশেষ বিমানে উহান ফেরত বাংলাদেশিদের একজন তিনি। আশকোনার হজ ক্যাম্প থেকে আরো ৩১১ জনের সঙ্গে ছাড়া পেয়েছেন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি। ক্যাম্পজীবনের গল্প বলেছিলেন আতিফ আতাউরকে

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো

লাবিবার সঙ্গে

মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি এবং ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসির পাঠ চুকানোর পর উচ্চশিক্ষার জন্য বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতে ভর্তি হই। এখানে পড়াশোনা ভালোই চলছিল। একপর্যায়ে চীনে পড়ালেখার সুযোগ পাই। কারণ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চীনের উহান টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটির একটি চুক্তি করা আছে। প্রতিবছরই বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটির কিছু নির্বাচিত শিক্ষার্থী চীনের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। চীনা সরকার প্রণোদনাভাতাসহ থাকা এবং পড়াশোনার সুযোগ দেয়। এভাবেই চীনে পড়তে গিয়েছিলাম ২০১৮ সালের অক্টোবরে। সেখানে ফ্যাশন ডিজাইনে মাস্টার্স করছিলাম। সামনের জুলাইয়ে দ্বিতীয় বর্ষ শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় উহানে। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে এই ভাইরাস সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি আমরা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওটা মেনে এক ধরনের বন্দিজীবন কাটাচ্ছিলাম। কবে মুক্তি পাব জানা ছিল না। রীতিমতো ভীতিকর এক পরিবেশ ছিল ওটা। পাঁচ-ছয় দিন পর পর খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে যাওয়া হতো আমাদের। ২০ জনের মধ্য থেকে একজনকে প্রতিনিধি করা হয়েছিল। সে গিয়ে ওগুলো নিয়ে আসত। দিনে দুটি করে মাস্ক দিয়ে যাওয়া হতো। ভেতরেও সব সময় পরে রাখতে হতো। এরপর বেইজিং দূতাবাস থেকে যোগাযোগ করে জানানো হয়, দেশে ফিরিয়ে আনা হবে আমাদের। একপর্যায়ে বিশেষ বিমানে চড়ে দেশে ফিরি। জানতাম, দেশে ফিরে ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে কিছুদিন কাটাতে হবে। সেভাবেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। তবে উহানের ভয়ংকর পরিবেশ থেকে নিজ দেশের মাটিতে ফেরার স্বস্তিটা ছিল অনেক বড়। আবার আপনজনদের সঙ্গে দেখা করতে না পারার বেদনাও পোহাতে হয়েছে এই কয়েক দিন। চীনে বেশ ভালোই ছিলাম। থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ডরমিটরি আছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। দুজন করে এক রুমে। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে অনেকে একজন এক রুমও পান। নিজের জন্য বিছানা, টেবিল, চেয়ার, আলমারি, এসি। সঙ্গে অ্যাটাচ বাথরুম, বারান্দা। প্রতি ছয়জনের জন্য একটি করে আলাদা রান্নাঘর। স্বাভাবিকভাবেই আশকোনার হজ ক্যাম্পে এসব আশা করা উচিত নয়। প্রথম দিন যখন ক্যাম্পে আসি তখন অনেকটাই অপরিচ্ছন্ন ছিল জায়গাটা। পরে ধীরে ধীরে পরিবেশের অনেক উন্নতি হয়েছিল। আমরা একেকটা রুমে ২০-২৫ জন থাকতাম। প্রত্যেকের জন্য মাটিতে সিঙ্গেল ফোমের বিছানা, চাদর, কম্বল, মশারি ছিল। আরো ছিল নিজস্ব ব্যবহারের জন্য সাবান, হ্যান্ড ওয়াশ, স্যানিটাইজার, তোয়ালে, পেস্ট, ব্রাশ, স্যান্ডেল, টিস্যু। প্রতিদিন দুই বেলা করে নতুন মাস্কের ব্যবস্থা ছিল। এটার ব্যবহার ছিল আবশ্যকীয়। পাশাপাশি গোসলের জন্য দেওয়া হয় গরম পানি, রুম হিসেবে চারটি করে বালতি, মগ। মশা তাড়ানোর জন্য প্রতিদিন দেওয়া হতো ওষুধ। এ ছাড়া আলাদাভাবে মশা মারার জন্য দেওয়া হয়েছিল ইলেকট্রিক ব্যাট ও অ্যারোসল।

হজ ক্যাম্পের ছাদে

চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও করা হয়। আমাদের জন্য ক্যাম্পে টিভি ছিল। এ ছাড়া ইন্টারনেট সংযোগসহ রাউটার। দিনের অনেকটা সময় লুডু, দাবা, ক্যারম খেলে কাটিয়ে দিতাম। প্রতিদিন সুষম খাবার দেওয়া হতো আমাদের। সকালে নাশতা, মধ্যদুপুরে নাশতা, দুপুরে খাবার, বিকেলে নাশতা আর রাতের খাবার নিয়মিত চলে আসত আমাদের কাছে। শুক্রবার দুপুরে মোরগ-পোলাওয়ের কথা বিশেষভবে বলতে চাই। কখনো কখনো সকালে থাকত খিচুড়ি। অনেক দিন পর পরিচিত খাবার পেয়ে অনেক খুশি ছিল সবাই। মাছ, মুরগি, ডাল, সবজি, ডিমসহ এখানে রান্না করা সব ধরনের খাবারই অনেক সুস্বাদু।

শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিত্সক ভিজিটে আসতেন। কারো কোনো সমস্যা আছে কি না জিজ্ঞেস করতেন। কারো নিজের সমস্যা মনে হলে তখন ডাক্তারকে জানালে পরবর্তী নির্দেশনা বা রোগ নিরীক্ষণ করা হতো। এ জন্য আলাদা মেডিক্যালরুম ছিল।

কারো বিশেষ কোনো কিছু প্রয়োজন হলে তা পরিবারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ারও ব্যবস্থা ছিল ক্যাম্পে। কার জিনিস কে দিচ্ছেন তার বিবরণসহ ক্যাম্পের ভেতর সেটা পৌঁছে দিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত বাহিনী। ক্যাম্পে পরিবেশ সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হচ্ছে—আরো ভালো হতে পারত। কারণ ৩১২ জনকে একটু বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয় বলে আমার মনে হয়েছে।

ক্যাম্পে প্রথম কয়েক দিন কেউ আক্রান্ত আছেন কি না এ নিয়ে ভয়ে ছিলাম সবাই। পাঁচ-ছয় দিন পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এ ছাড়া মশা নিয়ে ভীতি কাজ করেছে। যদিও মশা তাড়াতে অনেক চেষ্টা করেছেন সবাই। তবু মশা যেন ঘিরে ছিল আমাদের।

ক্যাম্পজীবন থেকে এখন মুক্ত জীবনে আমি। ভুলে যেতে চাই—প্রথম দিকের দু-এক দিন যখন নিজেকে কষ্ট করে বোঝাতে হয়েছে, এত অব্যস্থা না থাকলে বাংলাদেশ অনেক সুন্দর হতো। প্রতিটি দিনই ছিল অপেক্ষার। ক্যাম্পের সব কিছুই মনে রাখতে চাই। অপরিচিত কোনো পরিবারের একজন হয়ে ওঠা, ছাদের শারীরিক কসরত, নিজেদের মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা, কখনো কেউ ঘুমিয়ে গেলে তার মশারি টাঙিয়ে দেওয়া, কেউ খাবার সময়মতো না খেলে তাঁর জন্য অপেক্ষা, কারো পড়াশোনার বিষয় শুনে চমকে ওঠা, তারপর সে বিষয়ের খুঁটিনাটি জানতে উত্সুক হওয়া, রাতের হাঁটাহাঁটি, কখনো নিজে না খেয়ে অন্যকে খাইয়ে দেওয়া—এ রকম হাজারো ছোট গল্পের মধ্যে অন্য রকম এ সময়টায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন অনেকেই।

আমাদের সঙ্গে ডরমে ছিল ছোট্ট লাবিবা। ওর বাবা-মা দুজনই উহানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছেন। ওর মুখে আন্টি ডাক শুনে ঘুম ভাঙত আমাদের। অমি, সালমা, সানজিদা, ফয়জুন ও আমি মিলে লুডু খেলতাম। এরা প্রত্যেকেই উহানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স-মাস্টার্স করছে। খেলার সময় হারজিত নিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতাম। কখনো নিজের জন্য, কখনো অন্যের প্ররোচনায়। এ ছাড়া চীনে শিখিয়ে দেওয়া শারীরিক কসরতের প্রতিযোগিতা চলত। ক্যাম্পে বসে তো পত্রিকাই প্রকাশ করে ফেলেছিলেন রনি ভাই। তাঁর পত্রিকার ৬০০ চায়নিজ শব্দ নিমেষেই পড়ে ফেললেন মেহেদী। এই দুজনও উহানে মাস্টার্সে পড়ছেন।

১৪ দিনের সফল কোয়ারেন্টাইন শেষে আমাদের জন্য প্রীতি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি। সবারই আমাদের নিয়ে কৌতূূহল। অনেক প্রশ্ন। তবে কিছু মানুষকে দেখে মনে হয়েছে খুবই আতঙ্কিত, তাঁদের জন্য সমবেদনা। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি—আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই পারে এই ভাইরাস প্রতিহত করতে। বাকি দিনগুলো ভালো কাটবে—এ আশায় দিন গুনছি। এখন অনলাইনে ক্লাস করছে সবাই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের জানাবে। তখন আবার ফিরে যাব পরিচিত ক্যাম্পাসে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা