kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

‘দাড়ি-গোঁফই ওঠে নাই, তোমাকে দিয়ে হবে?’

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও আইয়ুব খানের ঘনিষ্ঠভাজন ছিলেন মোনেম খাঁ। ছয় ও ১১ দফা দাবির ঘোর বিরোধী ছিলেন। এই পাকিস্তানের দোসরকে মারার পর হানাদাররা নতুন বার্তা পায়, বাঙালিকে সহজে দাবানো যাবে না। আর মোনেম খাঁকে মারতে দুঃসাহসী হামলাটি করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক মোজাম্মেল হক। স্টেনগান হাতে যখন গুলি করেন, ওই সময় তাঁর বয়স ছিল মোটে চৌদ্দ। মোনেম বধের পুরো গল্পটা শোনা যাক তাঁর মুখেই

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



‘দাড়ি-গোঁফই ওঠে নাই, তোমাকে দিয়ে হবে?’

“১৯৭০ সাল। আমি ক্লাস নাইনে। শাহীন স্কুলের পাশে স্ট্যাম্প ওয়েলফেয়ার হাই স্কুলে পড়তাম। চার ভাই তিন বোনের মধ্যে আমিই বড়। ভাটারা ইউনিয়ন তখন পুরোদস্তুর গ্রাম। এখানেই আমার জন্ম। একান্নবর্তী পরিবার। বাবা-চাচারা সাত ভাই। আমার বাবা কৃষিকাজ করতেন। হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করে লেখাপড়ার টাকা জোগাড় করতেন মা। ওই সময় দেখেছি, আমাদের এখানে কাগজের দিস্তা চৌদ্দ আনা, পশ্চিম পাকিস্তানে আট আনা। আমরা বিআরটিসি বাসে স্কুলে যেতাম। বাসের কনডাক্টর-হেলপার ছিল অবাঙালি। দেখতাম, একটা কম বয়সী অবাঙালিও যদি বাসে উঠত, তারা বাঙালিকে সরিয়ে তার বসার ব্যবস্থা করে দিত। বয়স্ক বাঙালি উঠলেও বসার জায়গা দিত না। এটা আমার কাছে খুব খারাপ লাগত। তখনই জানা হয়ে গেল, যুদ্ধ ছাড়া এ দেশ স্বাধীন হবে না। তাই বাড়ির বড় ছেলে হয়েও যুদ্ধে যাব ঠিক করি।

প্রথমে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম কমান্ডার রহিম উদ্দিনের সঙ্গে। কিন্তু ধরা পড়ে যাই। বাবা বললেন, ছেলে-পেলেরা যদি পালিয়ে যুদ্ধে যেতে চায়, তাহলে আটকে রাখা যাবে না। বলে-কয়ে যাওয়াই ভালো। সাহস পেলাম। বললাম, ‘হ্যাঁ বাবা, আমি ইন্ডিয়ায় গিয়ে ট্রেনিং নেব।’

এরপর টানা পনেরো দিন আমার যখন যা খেতে ইচ্ছা করেছে, বাবা এনে দিয়েছেন। রীতিমতো আনুষ্ঠানিকভাবে আমার বাবা আমাকে যুদ্ধে পাঠান। ভারতে গিয়ে পড়ি সমস্যায়। দাড়ি-গোঁফ গজায়নি তখনো। বয়স কম। হ্যাংলা হওয়ায় আমাকে ট্রেনিংয়ে নিতেই চায়নি। আমরা উঠি কলেজটিলায়। সেখান থেকে ক্যাম্পে পাঠানো হয়। ক্যাম্পে দেখলাম, সবাই অসুস্থ। ভাবলাম, এখানে থাকা যাবে না। চলে আসি বাড়িতে। কিছুদিন পর সেই রহিম উদ্দিন কমান্ডার আসেন। তাঁকে বললাম, আমি আবার ট্রেনিং নিতে ইন্ডিয়া যেতে চাই। তিনি বললেন, ‘একটা পরীক্ষা দিতে হবে। যদি সফলভাবে গ্রেনেড চার্জ করতে পারো, তবে ইন্ডিয়া নিয়ে যাব।’ রাজি হলাম।

আমাকে দিয়ে গ্রেনেড চার্জ করাতে নিয়ে গেলেন গুলশানে। গুলশান এক নম্বর মার্কেট থেকে মহাখালী যাওয়ার পথে একটা বিল্ডিংয়ের মধ্যে অবাঙালিরা বাইরে সোফা বিছিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। রহিম উদ্দিন বললেন, ‘এই বাসায় গ্রেনেড চার্জ করো।’ বেবিট্যাক্সি দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেটির রেলিং ধরে দাঁড়িয়েই ওই বাড়ির বাউন্ডারির ভেতর মারলাম হ্যান্ডগ্রেনেড। বিকট শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে মার্কেটের সবাই বাইরে। চিত্কার চেঁচামেচির মাঝে দ্রুত কেটে পড়ি। পরীক্ষায় পাস। ইন্ডিয়া যাওয়ার সুযোগ পাই আবার।

আমাকে মেলাঘরে নিয়ে মেজর হায়দার সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন রহিম উদ্দিন। হায়দার সাহেব আমাকে দেখে বললেন, ‘দাড়ি-গোঁফই ওঠে নাই, তোমাকে দিয়ে হবে?’ আমি বললাম, ‘স্যার, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের পাশে আমাদের বাড়ি। ছোটবেলা থেকে মিলিটারির কাজকর্ম দেখে আসছি। যুদ্ধ করতে পারব।’ তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। ট্রেনিং করালেন।

আমাদের এক্সক্লুসিভ ট্রেনিং হয়েছিল। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের ১৩ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এর মধ্যে এম এ লতিফ ছিলেন কমান্ডার, রহিম উদ্দিন সেকেন্ড ইন কমান্ড। আমরা ঢাকায় এসে নদীর ওপারে ইছাপুরা গেলাম। ঢাকার এখন যেখানে কড়াইল বস্তি, সেখান থেকে তখন সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওরাই ইছাপুরা বাজারের কাছে ওঠে। সেখানকার একটি বাড়িতে মেঝে খুঁড়ে অস্ত্র রেখে সবাই যার যার বাড়িতে চলে আসি। বাড়িতে এসে আমার ভাই সার্জেন্ট রশিদকে বললাম, ‘মেজর হায়দার আমাদের মোনেম খাঁ অপারেশনে যেতে বলেছেন। দ্রুত সারতে হবে।’ আমার এক চাচা মোনেম খাঁর বাড়ির গাইয়ের দুধ দোহাতেন। চাচাকে বললাম মোনেম খাঁর বাড়িতে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিতে। চাচা বললেন, ‘আমি পারব না। ওই বাড়িতে যে গরু রাখে, সে-ই পারবে। আমি দূর থেকে দেখিয়ে দিতে পারব, কিন্তু সঙ্গে যেতে পারব না। বেলুচ রেজিমেন্টের এক প্লাটুন মিলিটারি বাংকার করে রেখেছে সেখানে। সবাইকে চেক করেই ঢোকায়, চেক করে ছাড়ে। একমাত্র পেছনের গেট দিয়ে গরু ঢোকানো হয়, সেটি চেক করা হয় না। ওখান দিয়েই যেতে পারবে।’ বললাম, ‘তাহলে এ কাজ যে করে, তার সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দিন।’

তারপর একদিন আব্দুর রশিদ ভাই ও চাচার সঙ্গে যাই মোনেমের কর্মচারীর সঙ্গে পরিচিত হতে। এখন বনানী কবরস্থান যেটা, সেটা তখন খালি। এবড়োখেবড়ো ও উঁচুনিচু গর্তে ভরা জায়গা। মোনেম খাঁর ওই কর্মচারী সাতটা গাভিকে ঘাস খাওয়াচ্ছে। চাচা দূর থেকে দেখিয়ে দিলেন লোকটাকে। আমরা কাছে গিয়ে গল্প জুড়ে দিলাম। জানতে চাইলাম গাভিগুলো কার, তোমার বেতন কত ইত্যাদি। লোকটা জানাল, ‘বেতন তো দূরের কথা, পালাইয়া গেলে ধইরা নিয়া আসে।’ তারপর ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘কত জায়গায় কত মুক্তিবাহিনীর কথা শুনি, আমার লগে কোনো মুক্তিযোদ্ধার দেখা হয় না।’ শুনে খুশি হলাম। সাহস জাগল। বললাম, ‘গরু বাড়িতে রেখে গুলশান দুই নম্বরে আসেন। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।’

কাজ শেষ করে গুলশানে এলো ওই কর্মচারী। সঙ্গে আরেকজন। তাদের ভালো করে খাওয়ালাম। একটু কথা বলে ঘুরেটুরে বললাম, আজকে তো কেউ এলো না, আরেক দিন আসেন। এভাবে একে একে তিন দিন তাঁদের ঘুরিয়েছি। তাঁরা সত্যিই মোনেম খাঁকে মারতে সহায়তা করবে কি না সেটা যাচাই করলাম। আমার পরীক্ষায় এরা পাস করল। বললাম, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের যখন পেলাম না, আমরাই একটা ব্যবস্থা করব। আপনারা আর এদিকে আসবেন না। যেখানে গরু চরান সেখানে থাকলেই হবে।’

পরের দিন আমি একা একটা স্টেনগান আর সঙ্গে দুটি ম্যাগাজিন নিয়ে গেলাম। একটা ম্যাগাজিন লাগানো, আরেকটা খোলা। সঙ্গে একটা থার্টিসিক্স রাইফেল আর ফসফরাস বোমা বাজারের ব্যাগে ভরে ওপরে কিছু পুঁইশাকের আঁটি রাখলাম। এগুলো নিয়ে যাই সেই মাঠে। সেখানে একটা গির্জা আছে। সেটার ভেতর অনেক ইট রাখা। সেখানে অস্ত্রগুলো লুকিয়ে মোনেম খাঁর কর্মচারীদের কাছে এলাম। তারা জানতে চাইল, ‘কোথায় মুক্তিযোদ্ধা?’ বললাম, ‘মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে আপনাদের কাজ নেই। আমার কাছে যন্ত্রপাতি আছে। আমাকে ভেতরে নিয়ে চলেন।’ লোকটা অবাক। বলল, ‘ও, আপনিই মুক্তিবাহিনী, আগে তো বুঝি নাই।’ গরু ঢোকানোর সময় আমাকে ভেতরে নিয়ে কয়েকটা কলাগাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে বলল। গরু রেখে এসে বলল, ‘আমি দেখে আসি মোনেম খাঁ কোথায় আছে।’ একটু পর এসে জানাল, ‘আজকে অপারেশন সম্ভব না। মোনেম খাঁ শুয়ে পড়েছে। বেডরুমে গিয়ে তাকে মারা সম্ভব না। তার ছেলে-মেয়ের রুম ডিঙিয়ে যেতে হবে।’

প্রথম দিন হলো না। আবার গির্জায় গিয়ে অস্ত্র লুকিয়ে চলে এলাম। পরের দিন আবার গরুর সঙ্গে ঢুকলাম। গিয়ে দেখি, গেটের ভেতর একটা ২০০ ওয়াটের বাতি। ওটা থাকলে আমাকে দেখা যাবে। লাইটটা ভেঙে কলাবাগান আসতেই পড়লাম বিপদে। বাড়ির কর্মীরা চিত্কার করতে লাগল, ‘গরু ঢোকানোর গেটে লাইট নাই, চোর ঢুকেছে!’ সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির লোকজন টর্চলাইট নিয়ে চোর খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি দৌড়ে নেভাল হেডকোয়ার্টারের পাশ দিয়ে নেমে পালিয়ে এলাম।

রশীদ ভাইকে বললাম, ‘মোনেম খাঁর বাড়ির কলাবাগানে চোর খোঁজা হয়েছে।’ উনি বললেন, ‘এমনও হতে পারে, ওই কর্মচারীরা তোমাকে ধরিয়ে দিয়ে পুরস্কার নিতে চায়। এ ভয়ানক পথে পা দিয়ো না।’ আমি তখন অপারেশনের চিন্তা বাদ দিলাম। এক দিন যায়, দুই দিন যায়। তিন দিনের দিন ভাটারা কালী মন্দিরের দিকে একদিন এলাম যখন, তখন পেছন থেকে ‘মোজাম্মেল ভাই!’ বলে কে যেন ডাক দিল। এই এলাকায় আমাকে কেউ মোজাম্মেল নামে চেনে না। পেছনে তাকিয়ে দেখি মোনেম খাঁর ওই কর্মচারীরা। তারা বলল, ‘আপনি তিন দিন ধরে যান না। ভয় পেয়েছেন?’ বললাম থাক, ‘চোর ঢুকেছে বলে আমাকে খোঁজা হয়েছে। এই অপারেশন থাক।’ ওদের একজন বলল, ‘খোদার কসম! আমরা কিছু বলিনি। আপনি লাইট ভেঙেছেন দেখেই সবাই ভেবেছে চোর ঢুকেছে।’

তাদের কথায় বিশ্বাস হলো। সহায়তাই করতে চায়। বললাম, ‘আপনারা রেডি থাকেন। আমি আরেকজন লোক খুঁজছি। তাকে পেলে আজই মোনেম খাঁ মরবে, না হয় আমি মরব।’ গেলাম হাশেম মেম্বারের ছেলে গিয়াস উদ্দিনের কাছে। তার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। গিয়ে দেখি, গিয়াস উদ্দিন নেই। আনোয়ার আছে। আনোয়ারকে বললাম, ‘চলেন আজ মোনেম খাঁর অপারেশনে যাব।’ ও বলল, ‘আমি তো তার বাড়ি চিনি না।’ বললাম, ‘মোনেম খাঁর কতগুলো ঘর আছে, কতগুলো রুম আছে, কতগুলো দরজা আছে—সব আমি জানি। চলেন, অসুবিধা নেই।’ আনোয়ার রাজি হলো।

১৩ অক্টোবর সন্ধ্যার পর গরুর সঙ্গে মোনেম খাঁর বাড়িতে ঢুকে দুজনে কলাবাগানের আড়ালে বসে আছি। গরুর রাখাল শাহজাহান বলল, ‘আপনারা বসেন, আমি দেইখা আসি।’ একটু পর ফিরে এসে বলল, আজকে ড্রয়িংরুমে আছে। ওদের দুজনকে বললাম, ‘আপনারা অল্প কাপড়চোপড় নিয়ে চলে যান। আপনারা বের হলে আমরা ঢুকব।’ ওরা দেয়াল টপকে বের হতেই আমরা দুজন রওনা দিলাম। ঘরের কাছে যেতেই রাস্তায় একজন লোক পড়ে গেল। আমরা দুজন রাস্তার দুপাশে চট করে শুয়ে পড়ি। মোনেম খাঁর কর্মচারী আমাদের দেখল না। সোজা হেঁটে চলে গেল। এরপর উঠে গিয়ে ড্রয়িংরুমের দরজায় দিই লাথি।

লাথি মারতেই খুলে গেল মোনেম খাঁর ড্রয়িংরুমের দরজা। দেখি তিনজন বসে আলাপ করছে। একপাশে মোনেম খাঁর মেয়ের জামাই। আরেকজন ওই সময়ের শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন। মোনেম খাঁ মাঝখানে। আমি মোনেম খাঁর দিকে স্টেনগান তাক করে ট্রিগারে চাপ দিই। ছুটে যায় গুলি। মোনেম খাঁ ‘ও মাগো’ বলে তলপেট ধরে সোফা থেকে পড়ে গেল। বাকিরা ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিত্কার শুরু করল। সবাই লুকাতে ব্যস্ত। আমি আবার গুলি করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু স্টেনগান থেকে আর গুলি বের হচ্ছে না। হ্যান্ডগ্রেনেড বের করলাম। সেফটি পিন খুলে মারলাম ওদের ওপর। সেটিও ফাটল না। পাশে তাকিয়ে দেখি আনোয়ারও নেই। দেয়াল টপকে কবরস্থানে গিয়ে পড়লাম। তারপর দৌড়। মোনেম খাঁর বাড়ি থেকে বৃষ্টির মতো গুলি আসছে। ততক্ষণে আমি নিরাপদে। পরদিন শুনি সে মারা গেছে।”

শ্রুতলিখন ও ছবি মোহাম্মদ আসাদ

রাজধানীর ভাটারায় বীরপ্রতীক মোজাম্মেল খানের ভাস্কর্য

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা