kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

‘জাহাজবাড়ি’ নিয়ে পুরান ঢাকার মানুষের আফসোস

ধ্বংসস্তূপও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে

ওমর ফারুক   

১১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘জাহাজবাড়ি’ নিয়ে পুরান ঢাকার মানুষের আফসোস

১৮৭০ সালের দিকে নির্মাণ করা হয় ‘জাহাজবাড়ি’ ভবন। জাহাজের মতো দেখতে হওয়ায় ভবনটি জাহাজবাড়ি নামে পরিচিতি পায়। ঈদের রাতে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ভবনটি। জায়গাটি এখন খালি। ছবি : কালের কণ্ঠ

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘জাহাজবাড়ি’ ভেঙে ফেলায় সাধারণ মানুষ আফসোস করছে। শত বছরের এ ভবনটি ইতিহাস-ঐতিহ্যর ধারক-বাহক হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। সেই বাড়িটি গত ঈদের রাতে গোপনে ভেঙে ফেলা হয়েছে! রাতে ভাঙার কারণে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এ বাড়িটি।

গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে পুরান ঢাকার ওই জায়গাটি এখন খালি। সেখানে পড়ে আছে কয়েকটি বাঁশ। বাড়ি ভাঙার পর ধ্বংসস্তূপও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আগেই। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে বেশির ভাগকেই বাড়িটির জন্য আফসোস করতে দেখা গেছে। তবে কেউ কেউ বাড়ি ভেঙে নতুন ভবন বানানোর প্রস্তুতিতে খুশির কথাও জানিয়েছে।

জানা গেছে, তিন তলা জাহাজবাড়ির দোতলায় নকশা করা রেলিং, ছাদওয়ালা টানা বারান্দা ছিল। আর বাইরের দিকে ছিল নানা ধরনের কারুকাজ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, ১৮৭০ সালের দিকে জাহাজের মতো নকশা করে ‘জাহাজবাড়ি’ ভবনটি তৈরি করা হয়। ভবনের মালিক বদু হাজি নামে এক ব্যক্তির কাছে ১৯২০ সালে ওয়াক্ফ সম্পত্তি করে দিয়ে যান। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলে ফেকু হাজি ভবনটির দায়িত্বে ছিলেন। ফেকু হাজির মৃত্যুর পর তাঁর বড়  ছেলে হাজি আবদুল হক ভবনটির তত্ত্বাবধান করছিলেন। তারা আরো জানায়, ভবনটি তৈরির পর থেকেই এলাকায় সেটিকে জাহাজের মতো দেখতে হওয়ায় জাহাজবাড়ি নামে পরিচিতি পায়। সেই বাড়িটি রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে প্রকাশ্যে তারা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায় না।

এলাকার এক মুরব্বি জানান, তিনি জন্মের পর থেকে জাহাজের মতো করে তৈরি করা ভবনটি দেখে এসেছেন। ভাঙার পর তাঁরা জানতে পেরেছেন জমিটি সংসদ সদস্য হাজি সেলিম কিনে নিয়েছেন এবং তিনি সেখানে অত্যাধুনিক ভবন করবেন। তাঁর প্রশ্ন—যদি তিনি কিনেই নিয়ে থাকেন তাহলে রাতের আঁধারে এটা ভাঙার দরকার কি? এটা তো দিনের আলোতেই ভাঙা যেত। তিনি আরো জানান, জাহাজবাড়িটি রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলার কারণে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

জাহাজবাড়ির বিপরীত দিকের দোকানি অপু জানান, জাহাজবাড়ি ভেঙে ফেলায় তাঁরা খুশি। তাঁর বক্তব্য ‘বাড়িটিতে ফাটল ধরেছিল। যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা বলে। কিন্তু ভেঙে পড়ে মানুষ মারা গেলে তখন কি হতো। এই ভবনটির নিচতলা ও দোতলায় নানা ধরনের দোকান ছিল। এগুলো কেউ কেউ দখল করে দোকান চালাত। এসব নিয়ে কোন্দল ছিল। ভবনটি হাজি সেলিম কিনে নিয়ে ভেঙে ফেলার কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারাই আজ বিরোধিতা করছে।’

চকবাজার থানার ওসি শামীম আল রশীদ জানান, এই ভবনটি ভাঙার পর থানায় একটি জিডি করা হয়েছে। জিডির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দুই পক্ষকেই নোটিশ দিয়েছি বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে সুরাহা করার জন্য। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৭ সালে সরকারি একটি গেজেট হয়েছে। সেখানে রাজধানীতে ৭৫টি হেরিটেজের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে চকবাজার এলাকায় রয়েছে হোসেনি দালান ও ঢাকেশ্বরী মন্দির। জাহাজবাড়ির নাম নেই। এর পরও যেহেতু বাড়িটি নিয়ে জিডি করা হয়েছে সে ক্ষেত্রে আমরা আদালতের মাধ্যমে মীমাংসা করার জন্য দুই পক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছি।

গত বধুবার ঈদের রাতে জাহাজবাড়ি ভাঙার ঘটনার পর বৃহস্পতিবার চকবাজার থানায় একটি জিডি করেন ঢাকার হেরিটেজ সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলনরত সংগঠন আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তইমুর ইসলাম। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, আরবান স্টাডি গ্রুপের পক্ষ থেকে করা এক রিট আবেদনে হাইকোর্ট ২০১৭ সালে পুরান ঢাকার ২২০০ ঐতিহ্যবাহী ভবন ও স্থাপনার ধ্বংস, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী ভবনটি গত মার্চ মাস থেকে ভাঙার চেষ্টা চলছিল। তখন জিডি করে থানার সাহায্যে ভাঙা বন্ধ করা হয়। এবার এমন একটা সময় এমনভাবে করা হলো, যেন বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে। ঈদের ছুটিতে গোপনে কাজটি করা হয়েছে।

তিনি জানান, গত সাত-আট মাসে আরবান স্টাডি গ্রুপের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রচেষ্টায় কিছু ভবন ভাঙার চেষ্টা ঠেকানো গেলেও ইতিমধ্যে পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ভবন ভাঙা হয়েছে। সে তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন এ বাড়ি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা