kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

রাজনীতিতে নারী এবং নারীর রাজনীতি

‘প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের নামে আজকের বিশ্বে বেশির ভাগ দেশেই যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা হলো পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্র।’

কানিজ ফাতেমা   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রাজনীতিতে নারী এবং নারীর রাজনীতি

যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয়, সে রাজনীতি কিভাবে নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করবে?

গত সংখ্যার পর

আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাম্যের নীতি ও নারী উন্নয়নে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ সমতার নীতিগুলোকে সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত করতে হয়। নারী ও পুরুষের পরিচয় সামাজিকভাবে নির্মিত হয় এবং সমাজ, অর্থনীতি আর রাজনীতিই নির্ধারণ করে নারী আর পুরুষের ভূমিকা। আবার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র লিঙ্গের পরিচয়ে নয়, বরং মানুষ হিসেবেই রাজনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। রাষ্ট্রের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা কারো জন্য সীমিত করা সংবিধান পরিপন্থী। অতএব, নারীর অধিকার সীমিত করা বা তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার রাষ্ট্রের থাকে না। অবশ্য আন্তোনিও গ্রামসির মতে, ‘প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের নামে আজকের বিশ্বে বেশির ভাগ দেশেই যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা হলো পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্র।’

বাংলাদেশের সংসদে বছরের পর বছর নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রেখে দেওয়া হচ্ছে। সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করতে হয়; কারণ নির্বাচন হওয়ার পূর্বে এসব সদস্যের সঙ্গে জনগণের কোনো ধরনের যোগাযোগ স্থাপিত হয় না। ফলে নির্বাচনের পরও জনগণের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করার দায় বা প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় না। এ সদস্যরা মূলত কোনো বিত্তবান বা প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ পুরুষ সদস্যের পরিচয়ের ভিত্তিতে বৃহৎ দলের মনোনীত ব্যক্তি। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা শুধুই ব্যবহৃত হন কোনো বিল পাসের ভোটার হিসেবে। ফলে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য নির্বাচন পদ্ধতি নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সব সাধারণ সদস্য ও জনগণের কাছে নারী সদস্যের কম মর্যাদাসম্পন্ন করে ফেলে।

অথচ দেশের সংবিধান অনুযায়ী সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য এবং সাধারণ আসনের সংসদ সদস্যদের অধিকার ও মর্যাদা এক; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আবার লৈঙ্গিক পার্থক্যের পাশাপাশি রয়েছে শ্রেণিবৈষম্য। বর্তমানের সংসদীয় রাজনীতিতে নারীর নির্বাচনের আন্দোলন মূলত উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত নারীর নেতৃতে পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী নারীর কোনো প্রতিনিধি দূরে থাক, তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এমন কাউকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজ বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতিফলন এবং শ্রেণি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয়, সে রাজনীতি কিভাবে নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করবে? তাই প্রতিটি সংসদীয় সরকারের আমলেই দেখা যাবে নারী উন্নয়ন নীতিমালায় নারীকে অসহায়, নির্যাতিত, এসিডদগ্ধ, দুস্থ, রাজনৈতিক দলে মাতা, কন্যা ও স্ত্রী হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ধারাবাহিকভাবে এটাই নির্বাচিত সংসদ আর তার সদস্যদের নারীদের জন্য দেওয়া উপহার। সহজ ভাষায় বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এখনো পর্যন্ত নারীর জন্য রাজনীতি মর্মে মর্মে লৈঙ্গিক, সাম্প্রদায়িক, পশ্চাৎপদ, গণতন্ত্রবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল থেকে গেছে। আর এখানেই লড়াইয়ের প্রশ্ন।

 

রাজনৈতিক দলে নারী

বস্তুত রাজনীতিকে ‘পুরুষের বিশ্ব’ বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস এই যে রাজনীতি করতে হলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নেতৃত্বদানের বলিষ্ঠতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব, কর্তৃত্ব, আগ্রাসী চরিত্র ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। আর বিদ্যমান জেন্ডার ধারণায় এসব বৈশিষ্ট্য পুরুষের একচেটিয়া এবং এসবের বেশির ভাগ নারীর মধ্যে অনুপস্থিত বলে মনে করা হয়; এমনকি যদি কোনো নারীর মধ্যে এসবের উপস্থিতি ও সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাকে পুরুষালী মেয়ে বলে ব্যঙ্গ করা হয়। আর এমনতর হাজারটা পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নারীকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কোণঠাসা করে রেখেছে। যদিও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব প্রদান ও মৌলিক অবদান নির্ভর করে দলের গঠনতন্ত্র, ঘোষণাপত্র ও সমাজের সর্বস্তরের নারীর সমঅংশীদারি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর। এ রকম নির্মিত ধারণা ও বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, রাজনৈতিক দলের ঘোষণাপত্র বা গঠনতন্ত্রে কোথাও নারী অধিকারের পরিপ্রেক্ষিত বা সমতার বিষয়টি যথাযথভাবে স্থান পায়নি।  কারো কারো গঠনতন্ত্রে নারী শাখার উল্লেখ থাকলেও মূল দল পরিচালনায় নারী অংশীদারির কোনো উল্লেখ নেই। অন্যদিকে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রেও আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে নারী সংগঠন গড়ে তোলার উল্লেখ কমই পাওয়া যায়। এটা হয়তো এমন ভাবনা থেকে যে বিপ্লব হলে এমনিতেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, সে ক্ষেত্রে আলাদা করে কেন নারীর ইস্যু কিংবা নারী সংগঠন করার প্রয়োজন কী? গণপ্রতিনিধি অধ্যাদেশের নিয়ম মানতে কাগুজে প্রমাণ হিসেবে মূলধারার সব রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বিশ্লেষণে, দলীয় রাজনীতির বিভিন্ন ফোরামে কিংবা পার্টির ইশতেহারে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু একমাত্র সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বাচনে কোটা পদ্ধতি ইত্যাদির মধ্যে আটকে আছে এসব দলের তৎপরতা। 

 

নির্বাচনী সংস্কৃতি নারী

বাংলাদেশের ‘তথাকথিত’ সংসদীয় গণতন্ত্রের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত নির্বাচনের প্রাক্কালে মনোনয়ন দেওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারণা, ভোট প্রদান ইত্যাদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে এককথায় ভয়াবহ নির্বাচনী সংস্কৃতি দৃষ্টিগোচর হয়। একটু খেয়াল করলে এ নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নারীর অবস্থান গৌণ এবং প্রান্তিকেই লক্ষ করব। যেমন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নির্বাচনে বর্তমানে টাকার ভূমিকা সব থেকে বেশি। যার কোটি কোটি টাকা খরচের সামর্থ্য নেই, তার পক্ষে নির্বাচনে জয়লাভও প্রায় অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ কিংবা সম্পদে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাহীন নারীর পক্ষে স্বাধীনভাবে নির্বাচনী এই স্রোতে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। আবার প্রচারণার সময়টিও খেয়াল করার মতো। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মোটরসাইকেলের বহর বা মাস্তান পরিবেষ্টিত হয়ে মিছিলের প্রচারণার ধরনে বাংলার নারী একেবারেই বেমানান; অন্যদিকে ক্ষমতা বা ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা বিভিন্ন অংশের দ্বারাই দেশের সব প্রচারমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত। ফলে দুর্বল অবস্থানে থাকা নারীর জন্য প্রচারণার দ্বার অনেকটাই রুদ্ধ থাকে। সর্বোপরি পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক-পারিবারিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোতে আটকে থাকার জন্য নারী সদস্যরা এখনো রাজনৈতিক ক্ষমতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

 

ভোটে নারী, নারীর ভোট

স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট, নারীদের বেশির ভাগের নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ মানে হচ্ছে ভোট প্রদান। ভোটদানের মতো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে নির্বাচন শেষে নারীর প্রাপ্তি কী? এ ক্ষেত্রে আমরা নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটু নিরীক্ষা করে দেখতে চাই, যা বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে খ্যাত। এ নির্বাচনে প্রাথমিক হিসাবে ৮৭.১৬ শতাংশ ভোট পড়ে, যা বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল আট কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮। এর মধ্যে নারী ভোটার চার কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৯ আর পুরুষ ভোটার তিন কোটি ৯৮ লাখ ২২ হাজার ৫৪৯ জন। অর্থাৎ পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার ১৪ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ বেশি। শতকরা হিসেবে যা দাঁড়ায় পৌনে ২ শতাংশ বেশি। এ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ এগিয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এবারই প্রথম শুধু ভোটার হিসেবে নয়, প্রার্থী হিসেবে নারীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এই নির্বাচন। কী সেই ইতিহাস, নির্বাচনের মনোনয়নপত্র পেশ ও যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্তভাবে মোট ৫৮ জন নারী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মোট ১৯ জন নারী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। মোট সংসদ সদস্যের যা মাত্র ৭ শতাংশ, ৫ জন নারী মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। একটি বিষয় খেয়াল করা জরুরি, নির্বাচনে নারীর উল্লেখযোগ্য অর্জন মানে কতগুলো সংখ্যার উপস্থিতি, কত শতাংশ ভোট পড়েছে, তার মধ্যে নারী কত শতাংশ ভোট দিয়েছে, মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা কত, সংসদ সদস্যদের মধ্যে নারী কতজন কিংবা মন্ত্রিসভায় নারীর সংখ্যা কত? কিন্তু এখানে আমরা বলতে চাই, রাজনীতিতে নারী কিংবা নারীর রাজনীতি শুধু কতগুলো সংখ্যার বিষয় নয়। আর এ সংখ্যার মাধ্যমে কোনো শ্রেণি বা গোষ্ঠীর গুণগত পরিবর্তনও পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। শ্রেণি বা গোষ্ঠীর অবস্থান নির্ণয়ে সংখ্যাবাচক সূচক নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু একই সঙ্গে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ গুণগত সূচক, যা কি না ক্ষমতা, অধিকার, মর্যাদা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ইত্যাদির ক্ষেত্রে পার্থক্য রচনা করে কিংবা তা মোচন করে। অথচ আমরা দেখব, ভোটের রাজনীতিতে বারবার ফলাও করে বলা হয়—এবার নারী ভোটার সংখ্যায় বেশি কিংবা নারী ভোটার হিসেবে এবার নির্বাচনে নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে, যার অন্তরালের মানে দাঁড়ায়, নারী তুমি অন্যের ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করো, কিন্তু ক্ষমতার অংশী তুমি নও। বাংলাদেশে ক্ষমতার রাজনীতি কিংবা নির্বাচনের রাজনীতির ৪৭ বছরের ইতিহাসে নারীর রাজনীতি কিংবা তার বৃহত্তর অংশের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এমন রাজনীতির কোনো চিহ্ন এখনো স্পষ্ট নয়। অথচ নারীর রাজনীতির গুণগত মান নির্ভর করছে নারী ও পুরুষের মধ্যকার বিদ্যমান অসমতা বা বৈষম্য দূর করার রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দর্শনের ওপর। নারী হিসাবে এখন আমাদের ভাবনা, ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আর কত দিন আমরা অন্যের আনন্দের বাদ্য বাজাব?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা