kalerkantho

চমকে দিল পাবনার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা

দৃষ্টিহীন, এতিম, অসহায়দের ঠিকানা পাবনার মানবকল্যাণ ট্রাস্ট। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়ও ভালো ফল করে সবাইকে অবাক করেছে ট্রাস্টের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আহমেদ উল হক রানা

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চমকে দিল পাবনার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা

হারুনার রশিদ, আব্দুল মতিন, মাহমুদুল হাসান, মাহবুব জামান, আরিফুল ইসলাম, আব্দুস সবুর, আনোয়ারুল ইসলাম, নাদিম হোসেন, ভোলানাথ সুতার, চন্দন কুমার ধর ও কাওসার হোসেন—সবাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। কেউ জন্ম থেকে, কেউ বা শৈশবে কোনো অসুস্থতায় দৃষ্টি হারিয়ে বড় হয়েছে। বৈরী পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠা এই ১১ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এদের মধ্যে হারুনার রশিদ জিপিএ ৫ এবং অন্যরা এ গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানের এসব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর একটি বিষয়ে দারুণ মিল, সবাই পাবনার মানবকল্যাণ ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। শ্রুতি লেখককের সহায়তায় এরা পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ এবং শহীদ এম মনসুর আলী কলেজ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দেয়। এদের মতো আরো অনেক প্রতিবন্ধী, এতিম, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোর মানবকল্যাণ ট্রাস্টে অবস্থান করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকে পড়াশোনা শেষে চাকরিও করছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের ট্রাস্টে এনে সন্তানের স্নেহে বড় করেন ট্রাস্ট চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল হোসেনসহ অন্যরা।

অধ্যাপক আবুল হোসেন

পাবনা শহরতলির সিংগা বাইপাস রোডসংলগ্ন এলাকায় ১৯৯৪ সালে কয়েক বন্ধুর সহযোগিতায় মানবকল্যাণ ট্রাস্ট গড়ে তোলেন আবুল হোসেন। এই ট্রাস্টে এখন পাবনাসহ দেশের ২৩ জেলার ১৪৫ জন প্রতিবন্ধী, এতিম, শিশু-কিশোর-যুবকের ঠাঁই মিলেছে। বিনা খরচে তারা ট্রাস্টে বেড়ে উঠছে। এদের মধ্যে ৬৫ জনই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।

সমাজের বিত্তবানদের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয় এই ট্রাস্ট। শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতকসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা পড়াশোনা করছে ব্রেইলপদ্ধতিতে। এই ১১ জনের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হলো। সবাই ভারি খুশি। অসহায়ত্বকে জয় করে একদিন জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়ে নিজেদের মতো অসহায়দের কল্যাণে কাজ করতে চায়।

জিপিএ ৫ পাওয়া হারুনার রশিদ বলে, ‘শুধু অন্ধ হওয়ার কারণে নিজেকে পরিবারের কাছেও একটা পর্যায়ে বোঝা মনে হতো। আত্মীয়-স্বজন দূরে ঠেলে দিয়েছিল। সবাই অবহেলা করত। এমন সময় আমাকে আশ্রয় দেন আবুল হোসেন স্যার। আমার থাকা-খাওয়া আর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন। অন্ধরা যাতে পরিবারের বোঝা না হয়ে সহায়ক হতে পারে সে জন্য উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চাই। তা ছাড়া আমার ইচ্ছা বড় চাকরি করে মা-বাবার সেবা করা।’

মানবকল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল হোসেনের কাছ থেকে জানতে পারলাম অনেক কিছু। মানবতার সেবা করার ইচ্ছা থেকেই তাঁর এত কিছু করা। যেখানেই অসহায় কোনো শিশু-কিশোর বা প্রতিবন্ধীর খোঁজ পান, তাদের নিজের কাছে নিয়ে আসেন।

এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা সবাই অতি দরিদ্র ঘরের সন্তান। অন্ধরা লেখাপড়া করে ব্রেইলপদ্ধতিতে। অথচ দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সুযোগ নেই। এদিকে দৃষ্টিহীনরা পরীক্ষা দেয় শ্রুতি লেখকের সাহায্যে, কিন্তু একেকজন শ্রুতি লেখককে সম্মানী দিতে হয় আট থেকে দশ হাজার টাকা। দরিদ্র এসব অন্ধের শ্রুতি লেখকের সম্মানী তো দূরের কথা, লেখাপড়া করার ন্যূনতম আর্থিক ব্যয় নির্বাহ করারও সংগতি নেই। তার পরও তাঁদের আপ্রাণ চেষ্টায় থেমে যায়নি এসব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর শিক্ষাজীবন। তিনি আরো জানালেন, সাম্প্রতিককালে গণমাধ্যমে প্রচারের ফলে এই প্রতিষ্ঠানের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবন্ধী ছাত্রের সংখ্যাও বাড়ছে। ছাত্রদের আবাসনজনিত সংকটের কারণে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। এটি সম্পন্ন করা, ফ্রি চিকিত্সা কেন্দ্র স্থাপন এবং অসহায় প্রবীণদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করাই এই মুহূর্তে তাঁর ইচ্ছা।

সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে প্রতিবন্ধী ও পথশিশুদের জন্য ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আরো বৃহৎ কোনো উদ্যোগ হাতে নেওয়া সম্ভব। তবে শহরের অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এখন। কেউ কেউ মা-বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর সময় এখানে সাহায্য করেন। কখনো খাবারদাবার পাঠিয়ে দেন। ট্রাস্টের শিক্ষার্থীদের জন্য এখন একটি কোরআন জাদুঘর আর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। কোরআন জাদুঘরে কোরআনের নানা আয়াত হাতে লিখে রাখা হয়েছে। আবার গুরুত্বপূর্ণ আয়াতগুলো কখন নাজিল হয়েছে তা উল্লেখ আছে। এদিকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত নানা ছবি ও দলিল।

মন্তব্য