kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘মণি মা’ জাহানারা

চুয়াডাঙ্গা শহরের পলাশপাড়ার জাহানারা খাতুন সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করান। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করানো হয়, দেওয়া হয় নাশতা। আবার স্কুল-কলেজে পড়া অনেক ছাত্র-ছাত্রীর পড়ালেখার খরচও জোগান জাহানারা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মানিক আকবর

৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘মণি মা’ জাহানারা

যেভাবে শুরু

জাহানারা তখন বেশ ছোট। ৮-৯ বছর বয়স। মা-বাবার সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনে আসেন। ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখতে পান, একজন ফেরি করে শিঙাড়া বিক্রি করছে। পাশেই এক শিশু তাকিয়ে আছে শিঙাড়ার দিকে, মাঝেমধ্যে হাত দিচ্ছে পকেটে। এ পকেট, সে পকেট—কোনো পকেটেই টাকা নেই, তা পরিষ্কার। কিন্তু বারবার শিঙাড়ার দিকে চোখ চলে যাচ্ছে শিশুটির। জাহানারার ইচ্ছা করে শিশুটিকে শিঙাড়া কিনে দিতে। কিন্তু ভয়ে তা মা-বাবাকে বলা হলো না। এমন সময় ট্রেন চলে এলো। জাহানারা মা-বাবার সঙ্গে ট্রেনে চড়ে বসলেন।

তারপর কেটে গেল বেশ কয়েকটি বছর। ছোটবেলার সেই ছেলেটির কথা তিনি ভোলেননি। ঘুরে-ফিরে মনে পড়ে তার কথা। একসময় ভাবেন, সেই ছেলেটির মতো ছেলে এবং মেয়েদের খুঁজতে হবে। যারা স্কুলে যেতে পারে না। যাদের লেখাপড়ার নিশ্চয়তা নেই।

২০০৭ সালে জাহানারা যখন নবম শ্রেণির ছাত্রী, চুয়াডাঙ্গা স্টেশন এলাকায় দেখা পান জাহিদ নামের বছর দশেকের এক শিশুর। সে লেখাপড়া করত না। তাকে অ আ ক খ শেখানো শুরু করেন জাহানারা। এরপর একদিন যশোর স্টেশনে দেখা হয় মনিরুল নামের এক ছেলের সঙ্গে। তার পরিবার হতদরিদ্র। কিন্তু সে লেখাপড়া শিখতে চায়। খাতা-কলম কেনার জন্য তাকে এক হাজার টাকা দেন জাহানারা। সেই মনিরুল এখন রংপুর মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এখনো মনিরুলের লেখাপড়ার জন্য সাধ্যমতো আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন জাহানারা।

তার পর থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খুঁজে তাদের পড়ালেখা করানো শুরু করেন জাহানারা। এখন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৪৫ জন। প্রতিদিন চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনের পাশে একটি ফাঁকা স্থানে এবং কাছের বেলগাছি গ্রামের মুসলিমপাড়া—এই দুটি জায়গায় শিশুদের পড়িয়ে থাকেন। ওদের রুটি, কলা, কখনো বা মিষ্টি কোনো খাবার খেতে দেন। বই সংগ্রহ করেন। কিনে দেন খাতা-কলম। এসব করতে জাহানারার যা খরচ হয়, তার জন্য কারো কাছে হাত পাতেননি।

জাহানারার বিয়ে হয় ২০১৪ সালে। ওই সময় বাবা জাহানারাকে নগদ তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ওই টাকা জাহানারা ব্যাংকে রাখেন। পিতা ও স্বামীর পরিবারের দিক থেকে সোনার গয়না পেয়েছিলেন প্রায় ২০ ভরি। অসহায় শিশুদের পেছনে খরচ করতে করতে ব্যাংকে থাকা তিন লাখ টাকা শেষ হয়ে গেছে। প্রায় ২০ ভরি সোনার গয়নাও বিক্রি করেছেন। তার পরও শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

জাহানারা জানান, ২০০৮ সালে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০১০ সালে এইচএসসি। রাজশাহী থেকে প্যাথলজিতে প্যারামেডিক্যাল পড়েন। প্যাথলজিস্ট হিসেবে চুয়াডাঙ্গার কয়েকটি ক্লিনিকে চাকরিও করেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে শিশুদের নিয়ে তাঁর কাজ এগিয়ে চলে। যেসব ক্লিনিকে চাকরি করতেন, তাদের কাছ থেকে এক ঘণ্টার ছুটি নিয়ে শিশুদের পড়াতে যেতেন। চাকরি করে যা টাকা পেতেন, তা-ও খরচ করতেন পথশিশুদের জন্য। ক্লিনিক মালিকরা তাঁর কাজে খুশি ছিলেন না। এক ঘণ্টার জন্য ছুটি নিয়ে তিনি কখনো কখনো দুই-আড়াই ঘণ্টা পর ফিরে আসতেন। একসময় জাহানারা বুঝলেন, শিশুদের দেখতে হলে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হবে। তা-ই করলেন।

তাঁর স্কুল দুটিতে শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি শরীরচর্চা করানো হয়, খেলাধুলা শেখানো হয়। তাদের নিয়ে মাঝেমধ্যে ক্রীড়া প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। কোনো শিশু পড়তে না এলে জাহানারা তার বাড়িতে গিয়ে তাকে কোলে করে পাঠকেন্দ্রে নিয়ে আসেন। আদর-ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়ে পড়ার প্রতি মনোযোগী করে তোলেন শিশুদের। তাঁর শিক্ষার্থীরা তাঁকে মণি মা বলে ডাকে।

 

একদিন বিপদ এলো

২০১০ সালের ঘটনা। চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় কয়েকজন শিশুকে একটি ফাঁকা স্থানে পড়াচ্ছেন জাহানারা। এলাকার কয়েকজন ছেলে ছেলেধরা কিংবা শিশুপাচারকারী বলে প্রচারণা চালিয়ে জাহানারাকে মারধর শুরু করে। তাঁর মাথার একদিকের চুল কেটে দেয়। মাথায় ঢেলে দেওয়া হয় গরুর মলমূত্র। তাতেও জাহানারা দমে যাননি। পরের দিনই একই স্থানে গিয়ে শিশুদের নিয়ে আবার পড়িয়েছেন।

এভাবেই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকতে হয়েছে। তাঁকে পাগল বলেছেন অনেকে। জাহানারার মস্তিষ্ক বিকৃত মনে করে তাঁর কাছে শিশু পাঠানো বন্ধ করে দেন অনেক অভিভাবক। তার পরও থামেননি জাহানারা। সব বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর কাজ চালিয়ে গেছেন।

 

জাহানারা আরো যা করেন

পথশিশু ও হতদরিদ্র ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি জাহানারা আরো বেশ কিছু দরিদ্র শিশুকে লেখাপড়ার খরচ দেন। এ রকম দুজন অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পড়া শিক্ষার্থী রয়েছে। মেডিক্যালে পড়া এক ছাত্রকে তো নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছেনই। এ ছাড়া জাহানারা নিজে বিভিন্ন হাতের কাজে পারদর্শী। সেসব বিনা খরচে শেখান দরিদ্র মেয়েদের। যখনই খবর পান, কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থী শিক্ষার খরচ বহন করতে অসুবিধায় পড়েছে, জাহানারা ছুটে যান তার কাছে, সহযোগিতা করেন। বাইরে হাতের কাজ করে তিনি যা আয় করেন, তার সবটা খরচ করেন দরিদ্র কিছু শিক্ষার্থীর জন্য। মাঝেমধ্যে স্বামীর কাছ থেকেও আর্থিক সহযোগিতা নেন।

জেলার উপজেলা শহরগুলোতেও জাহানারা ছুটে যান। সেখানে থাকা বস্তি এলাকায় গিয়ে খোঁজখবর নেন। একবার জাহানারা খবর পান, আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের পাশের এক বস্তিতে থাকা ছেলে-মেয়ের মধ্যে ১২ জন শিশু লেখাপড়া করে না। সেখানে ছুটে গিয়ে তাদের অভিভাবকদের উৎসাহিত করেন। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

 

শিশুরা ভারি খুশি

গেল শনিবার বিকেলে মুসলিমপাড়ায় জাহানারার বিদ্যাপীঠে গিয়ে দেখা গেল ক্লাস শুরু হয়েছে। গোল হয়ে বসে লেখাপাড়ায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। একটু দূরে একজন অভিভাবক এক শিশুকে নিয়ে বসে আছেন। ওই অভিভাবকের নাম আমেনা খাতুন। তিনি তাঁর নাতি হাবিবকে এখানে এনেছেন ভর্তির করানোর জন্য। আমেনা খাতুন বলেন, ‘শুনেছি এখানে অনেক ভালো লেখাপড়া হয়। কোনো টাকাও লাগে না। আমি আমার নাতিকে এখানে ভর্তি করানোর জন্য এসেছি।’

গোল হয়ে বসে অনেকের সঙ্গে লেখাপড়া করা সাব্বির জানাল, ‘দুই মাস হলো সে এখানে পড়তে এসেছে। ম্যাডাম তাকে খুব আদর করেন। ’

আরেক শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান খোকন জানাল, সে বেলগাছি গ্রামের মাদরাসার ছাত্র। বিকেলে এখানে পড়তে আসে। সব পড়া এখান থেকে মুখস্থ করার পর বাড়ি যায়। এখানে এসে পড়তে তার খুব ভালো লাগে।

এদিকে খুদে মীম বলল, বাড়ির কাছে হওয়ায় তার জন্য এখানে পড়তে আসা বেশ সুবিধা। মীম খাতায় লিখতে লিখতে বলল, আমি অ আ ক খ, এ বি সি ডি লিখতে পারি। ক্লাস চত্বর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার পর দেখা হলো বেলগাছি গ্রামের মিজানুর রহমানের সঙ্গে। বললেন, ‘কোনো টাকা লাগে না বলে দরিদ্র মানুষের সন্তানরা এখানে পড়ার সুযোগ পায়। জাহানারা আপা নিজেও খুবই ভালো। গ্রামের মানুষ আপাকে খুব ভালোবাসে।’ 

 

স্কুল ঘরের স্বপ্ন

জাহানারার কাছে যারা পড়ে, তাদের কেউ কেউ এখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। তাদের মা-বাবা একেবারে হতদরিদ্র। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন, বাবা দিনমজুর—এমন পরিবারের শিশুরাই বেশি আসে। তারা লেখাপড়া শেখে। জাহানারা তাদের কিনে দেন খাতা-কলম। পড়ার পর নাশতা দেন প্রতিদিন।

কাজ করে আসছিলেন নীরবে-নিভৃতে। তবে এখন অনেকেই জানে এটা। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন তাঁকে সামাজিক উন্নয়ন বিভাগে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত করে। ২০১৮ সালের ৯ ডিসেম্বর তাঁকে শ্রেষ্ঠ জয়িতার ক্রেস্ট দেওয়া হয়।

হতদরিদ্র ও পথশিশুরা ছাড়াও বিভিন্ন স্কুলে পড়া শিশুদেরও জাহানারা পড়িয়ে থাকেন বিনা খরচে। আর্থিক কারণে অনেক শিশু প্রাইভেট পড়তে পারে না। তারা জাহানারার কাছে এসে পড়ে। যে দুটি স্থানে জাহানারা শিশুদের নিয়ে পড়ান, সে স্থান দুটি এরই মধ্যে জেলা, উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দেখে এসেছেন। দুটি স্থানের কোথাও কোনো শ্রেণিকক্ষ না থাকায় চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রশাসন থেকে জাহানারাকে দেওয়া হয়েছে ৪০টি ঢেউটিন। বাঁশ ও কিছু নগদ টাকা সংগ্রহ হয়েছে। বেলগাছি গ্রামের লেভেলক্রসিংয়ের পাশে তৈরি করা হবে পথশিশুদের স্কুল। গোছানোর প্রস্তুতি চলছে। এখনো অনেক কিছু দরকার। তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্কুলকক্ষের কাজ শুরু করতে চান জাহানারা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা