kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

সামান্য থেকে অসামান্য

অজপাড়াগাঁর ছেলে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ক্যান্সার ন্যানোটেকনোলজিতে ডক্টরাল ডিগ্রি নিয়ে এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কর্মরত। সেখানে রক্তনালি ও শ্বাসনালির ব্লক গলিয়ে ফেলার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। আবিষ্কার আছে ১০টি। প্রায় ৫০টি লেখা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। নুরুন্নবীর গল্প শোনাচ্ছেন মুতাসিম বিল্লাহ নাসির

২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সামান্য থেকে অসামান্য

জন্মেছেন বগুড়ার শিবগঞ্জ থানার খাদাইল নামের অজপাড়াগাঁয়। বাবা আবুবকর সিদ্দিক, মা মনোয়ারা বেগমের এক ছেলে আর এক মেয়ের মধ্যে বড়। বাবা সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী। কৃষিজমিও আছে।

বিজ্ঞাপন

ছোট্ট নুরুন্নবী স্কুল থেকে ফিরে খেয়েদেয়ে চাষিদের জন্য খাবার আর পানি ঘাড়ে নিয়ে চলে যেতেন মাঠে। কোনো দিন তাঁদের সঙ্গে জমিতেও চাষে নেমে পড়তেন। তার পরও লেখাপড়ার প্রতি মমতা তাঁঁর এতটুকুও কমেনি। খাদাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শেষ করে বুড়িগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। বাড়ি থেকে যেতে-আসতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগত। সারা বছর সাইকেলে চলতেন, বর্ষায় কাদামাখা মাটির পথ পানি, ধানক্ষেত মাড়িয়ে, কাদাময় গর্ত ঠেলে যেতে হতো। তার পরও পড়ার প্রতি এতই টান ছিল তাঁর, রাত ১০টায় শরীর খারাপ হবে বলে বাবা আলো নেভাতে বললেও তাঁর পড়তে ইচ্ছা করত। এসএসসি পাসের পর সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হলেন। হোস্টেলে থাকতেন। নতুন পাওয়া স্বাধীনতায় ঠিকভাবে পড়ালেখা করা হয়ে ওঠেনি। ফলাফল ভালো হলো না। ঢাকায় এসে কোচিং করেছেন, কিন্তু ভর্তিপরীক্ষায় ভালো না করায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পছন্দসই বিষয় না পাওয়ায় ভর্তি হতে পারেননি। গ্রামের লোকেরা ‘তোমার জীবন তো শেষ হয়ে গেছে’ বলে তাঁকে হতাশ করে দিল। বাবা ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বললেন, ‘সময় থাকতে ব্যবসা বুঝে নাও। ’ তবে মা আর বুয়েটের ছাত্র ফুফাতো ভাই আশরাফুল আলমের উত্সাহ-সমর্থনে সেই দিনগুলো পাড়ি দিলেন তিনি।   

আরো অনেকের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন বলে ঢাকায় এলেন। ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলন্টারনেটিভের (ইউডা) প্রথম দিনের স্মৃতি আজও জ্বলজ্বলে তাঁর—ভর্তি অফিস তাঁকে ফার্মাসি বিভাগের কোর্স সমন্বয়কারী সাজ্জাদুল বারী স্যারের কাছে পাঠাল। ভেঙে পড়া এই ছাত্রটিকে এত সুন্দর করে তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখালেন যে ভর্তি হতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি। সেই থেকে তিনি তাঁর জীবনের পথপ্রদর্শক। পড়ালেখায় সহযোগিতা থেকে অন্য কোনো কিছু—সব কিছুতেই তাঁর সঙ্গ পেয়েছেন। আরো অনেক শিক্ষকের সহযোগিতার কথা সারা জীবন মনে রাখবেন বলে জানালেন তিনি।

বিফার্ম (ব্যাচেলর অব ফার্মাসি) পাসের পর ২০০৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিতে গেলেন। ২০১০ সালে কোরিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ট্রান্সপোর্টেশন থেকে কেমিক্যাল বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল, ন্যানোপ্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্যান্সার কোষ খুঁজে বের করে সেটি মেরে ফেলা। ফলে সুস্থ-স্বাভাবিক কোষগুলো রক্ষা পায়। ক্যান্সারবিষয়ক এই গবেষণার মাধ্যমে নুরুন্নবীর গবেষকজীবন শুরু হলো। দুই বছর পর পিএইচডি করবেন বলে অনেক বেতনের চাকরিটি ছেড়ে বৃত্তির টাকা সম্বল করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শুরু করলেন। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি হেসে দিলেন, “আমি গবেষণা ছেড়ে চার ভাগের এক ভাগ বেতনে পিএইচডি শুরু করেছিলাম। কারণটি হলো—চ্যালেঞ্জ নিতে সব সময় ভালোবেসেছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম বলে ‘বোকা’ বলত অনেকে। এমনও শুনেছি—‘খারাপ ছাত্র এবং বড়লোক বাবার নষ্ট ছেলেরাই বেসরকারিতে পড়ে। ’ তবে কোনো দিনও কটু বাক্য বা খারাপ সময়কে বাজেভাবে নিইনি, বরং সেটি কাটিয়ে উঠতে এগুলোই আমার চালিকাশক্তি হয়েছে সব সময়। ”

কোরিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ট্রান্সপোর্টেশন ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উটাহ থেকে পিএইচডি করেছেন তিনি। বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং মানে রসায়নবিদ্যা, জীববিদ্যা ও প্রকৌশলবিদ্যার সংমিশ্রণে তাঁর পিএইচডি। এরপর পিএইচডির গবেষণাকেই আরো বিস্তারিতভাবে নিয়ে এলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় কার্বন থেকে ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করে সেটি নিধনের প্রযুক্তি খুঁজে বের করা। বুঝিয়ে বললেন, ‘রাস্তায় যে পিচ ঢালাই করা হয়, সেটি মূলত কার্বনের। সেই পিচ থেকে ন্যানোপ্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্ত করে সেটি নিধনের প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছি। আমার প্রযুক্তির  পেটেন্ট করা আছে। বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহের জন্য কয়েকটি কম্পানি আগ্রহও দেখিয়েছে। ’

 

এরপর তিনি চলে গেলেন পোস্ট ডক্টরাল থিসিস করতে। দক্ষিণ কোরিয়ার চুংনাম ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করে হূদযন্ত্রের রক্তনালির ব্লক খুঁজে বের করার গবেষণা করলেন। এটিই তাঁর পোস্টরাল থিসিস। এই বিষয়ে গত বছর থেকে আরো উচ্চতর গবেষণা করছেন বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলে। এখানে তিনি পোস্টরাল ফেলো। তাঁঁর গবেষণা সফল হলে ন্যানো বা ক্ষদ্রাতিক্ষুদ্র রোবট রক্তে চলাচলের মাধ্যমে রক্তনালির কোথাও রক্ত জমাট বেঁধে আছে কি না তা খুঁজে বেড়াবে। রোবটের মধ্যে এমন কিছু প্রাযুক্তিক সুবিধা যুক্ত করা আছে, যাতে হূদযন্ত্রে কোথায় কয়টি ব্লক আছে, চিহ্নিত করে গলিয়েও ফেলতে পারবে। ফলে ব্লকের জন্য অপারেশন বা রিং পরানো লাগবে না। পাশাপাশি ক্যান্সার রোগীদের নিয়েও গবেষণা করছেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি বললেন, ‘ফুসফুসে বা স্তনে ক্যান্সারের মানে পুরো ফুসফুস বা স্তনে ক্যান্সার নয়। ক্যান্সার প্রথমে কোষকে আক্রান্ত করে। বর্তমান চিকিত্সাব্যবস্থায় ক্যান্সার নিরাময়ের জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো খুবই বিষাক্ত এবং সেটি জানে না কোনটি ক্যান্সার কোষ, কোনটি সুস্থ কোষ। ফলে এই ওষুধ শরীরে প্রবেশ করানো হলে তা ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের পাশাপাশি প্রচুর সুস্থ কোষও মেরে ফেলে, যে কারণে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর ওজন কমে যায়, চুল পড়ে যায়, শ্বাসকষ্ট হয়। এমনকি শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ন্যানোটেকনোলজির মাধ্যমে আমি শুধু আক্রন্ত কোষগুলো শনাক্ত করে সেগুলোকেই ধ্বংসের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। এই গবেষণায় সফলতার পর আমরা ক্যান্সার চিকিত্সার ব্যয় কমাতে পারব। শরীরের বিষক্রিয়া অনেকাংশেই কমিয়ে আনার পাশাপাশি ওষুধের কার্যকারিতাও অনেক বেড়ে যাবে। ’

এই কৃতী গবেষকের অনেক গবেষণা নিবন্ধও আছে। বিখ্যাত সব আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নালে তাঁর প্রায় ৫০টি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোর ছয়টি আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি ও আটটি ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রিতে ছাপা হয়েছে। ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও ভাইরাসজনিত রোগ নির্ণয় ও সেগুলোর চিকিত্সায় তাঁর ১০টি উদ্ভাবনের পেটেন্ট রয়েছে। তিনটি দক্ষিণ কোরিয়ায় ও অন্য কয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলো ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের জন্য বণিজ্যিকভাবে লাইসেন্স করে কিনে নিয়েছে। নুরুন্নবী জানালেন, ‘আমার প্রথম আবিষ্কারটি ছিল ধানের তুষ থেকে ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন রহমত উল্লাহ স্যার এই আবিষ্কারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। আবিষ্কারটি ২০১২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও ২০১৩ সালে সারা বিশ্বে পেটেন্ট করা হয়েছে। ২০১৫ সালে কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানটি এর লাইসেন্স কিনে নিয়েছে, তারা বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদন শুরু করছে। পিচ থেকে ক্যান্সারের কোষ শনাক্তের আবিষ্কারটি ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় পেটেন্ট করা হয়েছে। সে দেশের একটি কম্পানি এর লাইসেন্স নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষেধক তৈরি করছে। ইনসুলিনের মতো জিএলপি-১ (গ্লুকাগন লাইক পেপটাইড) ডায়াবেটিস রোগীদের খুব প্রয়োজনীয় ওষুধ। ইনজেকশনের মতো করে একাধিকবার নিতে হয়। কিভাবে জিএলপি-১ শরীরের বদলে মুখে নেওয়া যায়, সেই প্রযুক্তিটি আবিষ্কারের জন্য ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করে আমি গবেষণা করেছি। গবেষণাগারে দেখেছি, ডায়াবেটিস আক্রান্ত ইঁদুরের মুখে জিএলপি-১ একবার প্রবেশের মাধ্যমেই তার রক্তে সুগারের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে এসেছে। টানা তিন সপ্তাহ এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সফলতা পেয়েছি। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, মানবদেহেও এটি কার্যকর হবে। ’ আরো একটি সাফল্যের খবর শোনালেন তিনি, নেদারল্যান্ডসের বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান, প্রাযুক্তিক ও চিকিত্সার তথ্যদান ও বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘এলসিভিয়ের’ থেকে প্রকাশিত হবে ‘বায়োমেডিক্যাল অ্যাপ্লিকেশন অব গ্রাফিন অ্যান্ড ২ডি ন্যানোম্যাটেরিয়ালস। ’ বইটি সম্পাদনার পাশাপাশি কয়েকটি অধ্যায়ও লিখছেন তিনি।

গবেষণার পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজের সঙ্গেও তিনি যুক্ত আছেন। পাঁচ হাজারেরও বেশি সদস্যের ‘হার্ভার্ড মেডিক্যাল পোস্ট ডক অ্যাসোসিয়েশন’-এর তিনি সেক্রেটারি। ২০১৭-১৮ সালের জন্য সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, প্রতি মাসের সভা আয়োজন ও পরিচালনা করেন। এ ছাড়া ‘ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল’-এর এক হাজার ৫৯৯ সদস্যের পোস্ট ডক্টরাল অ্যাসোসিয়েশনেরও সভাপতি। তাঁরা বিভিন্ন দেশের নতুন গবেষকদের তথ্য সহযোগিতা, কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করা, সেমিনার আয়োজন ও তাঁদের বিভিন্ন অসুবিধা প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেন।



সাতদিনের সেরা