ক্রিকেট ছিল ধ্যানজ্ঞান। নিজেকে সেভাবেই গড়ে তুলছিলেন। পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের ফলে সাফল্যও ধরা দেয়। ২০০৯ সালে বগুড়া লিগে খেলার পরের বছরই ডাক পান ঢাকা মোহামেডানে। এরপর বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলে। ২০১২ সালে হংকংয়ের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা করে নেওয়া মিশু চৌধুরীর এরপরের গল্পগুলো হওয়ার কথা ছিল-ব্যাটিং পরিসংখ্যান, শতক-অর্ধশতক, অ্যাভারেজ কিংবা স্ট্রাইক রেট নিয়ে। কিন্তু হংকংয়ের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে আবাহনী মাঠে অনুশীলনের সময় দুর্ভাগ্যবশত পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। আর এখানেই থেমে যায় তাঁর ক্রিকেট মাঠের গল্প। এরপর দর্শক মাঠের মিশুকে দেখল টেলিভিশনে। এসএমসি'র (সোশ্যাল মার্কেটিং কম্পানি) জনস্বাস্থ্য ও সচেতনতাবিষয়ক একটি বিজ্ঞাপনে-'আমার নাম রেশমি, একসময় সুন্দরী ছিলাম...।' এক বিমর্ষ মা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন, চোখের কোন বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে-এমন দৃশ্যে। নির্মাতা গাজী শুভ্রর এ বিজ্ঞাপনটি দিয়েই বেশ পরিচিতি পেয়ে যান মিশু। শুভ্র বলেন, 'মিশু অসাধারণ অভিনয় করেছেন। শুধু মডেল হিসেবে নয়, মিশু এই বিজ্ঞাপনে একজন গুণী অভিনয়শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন।' রেড ডট মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের ব্যানারে নির্মিত বিজ্ঞাপনটির শুটিং হয় মানিকগঞ্জে। মিশুর প্রথম দিকের এই বিজ্ঞাপনে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল মিশ্র। ভোর ৪টা থেকে শুটিং। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় এক বিষণ্ন কিশোরী মায়ের ছলছল চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য ধারণ করতে হবে। আলো এসে জানালা দিয়ে প্রবেশ করে, চোখ দিয়ে জলও গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পারফেক্ট শুট আসছিল না। পর পর চারবার ব্যর্থ চেষ্টার পরে মিশুর চোখে আর জল আসে না। দেওয়া হয় গ্লিসারিন। কিন্তু না, তাতেও হচ্ছে না। ডিওপি (ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি) লিংকন পেঁয়াজ নিয়ে আসেন। সেটাই মিশুর চোখের সামনে কচলানো হয়। এবার কাজ হলো, পাওয়া গেল পারফেক্ট দৃশ্য। ক্রিকেটার হলেও অভিনয়ের হাতেখড়িটা ছোটবেলায়ই। বগুড়ায় স্কুল থেকেই থিয়েটার করতেন। ছোটদের সেই থিয়েটারের নাম ছিল 'লিটল থিয়েটার'। এরপরই যোগ দেন বগুড়া থিয়েটারে। এই থিয়েটারের ব্যাপক জনপ্রিয় প্রযোজনা 'কোর্ট মার্শাল' ও 'নূরলদিনের সারা জীবন' এ অভিনয় করেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। মিশু এখন পুরোদস্তুর পর্দার অভিনেত্রী। সেই সঙ্গে আলোচিত বিজ্ঞাপন মডেল। মিশু চৌধুরী বলেন, 'আমি একজন ভালো অভিনেত্রী হতে চাই, হতে চাই একজন ভালো মডেল, যাতে দেশের মানুষ আমাকে যেমন ক্রিকেটার হিসেবে চিনতে শুরু করেছিল, তেমনি একজন ভালো অভিনয়শিল্পী ও ভালো মডেল হিসেবে চেনে।' মিশুর মনের আশা পূরণ হয়েছে। দেশের মানুষের কাছে এখন বেশ পরিচিত তিনি। সম্প্রতি গ্রামীণফোনের 'এবার কোনো কথাই আর হারিয়ে যাবে না' বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফের আলোচনায় চলে এসেছেন। অমিতাভ রেজার নির্দেশনায় এই বিজ্ঞাপনে টিভি খুললেই তাঁকে দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনটিতে মেয়ে মায়ের সঙ্গে বাবার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলে। কিন্তু মেয়ের এত কথা শোনার সময় নেই। তাই মা মেয়েকে কথা জমিয়ে রাখতে বলে। মায়ের কথা শুনে মেয়েও আচারের কৌটায় তার বাবার জন্য কথা জমিয়ে রাখে। এই বিজ্ঞাপনে মায়ের ভূমিকায় দেখা যায় মিশু চৌধুরীকে। বগুড়ার নন্দীগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে নির্মিত এই বিজ্ঞাপনে মিশুর কণ্ঠে 'তোর আব্বা এই সপ্তাহেও আইবো না, কাজ পইড়া গেছে'-সংলাপটি এখন মানুষের মুখে মুখে। মিশু বলেন, 'বগুড়া আমার গ্রামের বাড়ি হওয়ায় বিজ্ঞাপনটির শুটিংস্পটে লোকজনের চোখে-মুখে ছিল বাড়তি আনন্দ। শত হলেও এলাকার মেয়ে বলে কথা! এ বিজ্ঞাপন আমার আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।'