kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

অন্য কোনোখানে

বুজির জল অরণ্যে

শিমুল খালেদ   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বুজির জল অরণ্যে

জলে ভাসা বনের কথা শুনেছিলাম মাস কয়েক আগে। তখনই ভেবেছিলাম, যাব একদিন। কিন্তু সুযোগ আর সময়ের অভাবে যাওয়া হচ্ছিল না। সেদিন ছিল সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস। অফিস করে বাসায় ফিরে গা এলিয়ে দিয়েছি। এমন সময় ফোন এলো। ওপাশে বন্ধু জিল্লুর কণ্ঠ। আগামীকাল বুজির বন, মানে জলে ভাসা বনে যেতে চায়। জিজ্ঞেস করল সঙ্গী হব কি না। তত্ক্ষণাৎ রাজি হলাম।

পরদিন সিলেট শহরের শাহপরান গেটে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই এসে হাজির। শুধু হারুন নেই। ফোনও ধরছে না। যদিও একমাত্র ওরই বাসা শাহপরান গেটে। সাধে তো আর বলে না রেলস্টেশনের কাছের মানুষ ট্রেন মিস করে বেশি।

অবশেষে হারুন হাজির হলো। অপেক্ষার দরুন দুই লিটার কোক জরিমানা দিল। এরপর ছয়টি মোটরবাইকে রওনা হলাম গন্তব্যের দিকে। নিয়ামুলের বাইকের ব্যাকসিটে বসেছি। সহপাঠী বন্ধুটির সঙ্গে প্রায় অর্ধযুগ পর দেখা। চলতে চলতেই টুকটাক গল্প হলো। সিলেট-তামাবিল হাইওয়ে ধরে বটেশ্বর ছেড়ে এসে পথের দুই পাশজুড়ে সবুজ টিলাশ্রেণি। কোথাও সুনিবিড় চা বাগান। চিকনাগুল ছেড়ে এসে বনগাঁও বাজারে খানিক যাত্রাবিরতি। জিল্লু স্থানীয়     দু-একজনকে জিজ্ঞেস করল বুজির বন কোথায় চেনে কি না। ওখানে কোনো সদুত্তর না পেয়ে ছুটলাম হরিপুরে। জৈন্তিয়া হাওরের এক পাশের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হরিপুর। টিলা-পাহাড়ঘেরা এই অঞ্চলের নাম কমবেশি সবাই জানে। খ্যাতির একটাই কারণ—দেশের প্রথম তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় এখানে। তবে একটা তথ্য অনেকেই জানে না, শ্রীমঙ্গলের মতো ব্যাপক না হলেও এখানে স্বল্প পরিসরে আনারসের চাষ হয়। শ্রীমঙ্গল ও হরিপুরের কাঁটাওয়ালা হানিকুইন জাতের আনারস স্বাদে অমৃত।

হরিপুর বাজারে পৌঁছে একে-ওকে বনের কথা জিজ্ঞেস করি। বুজির বন শব্দ শুনেই হাঁ করে চেয়ে থাকে। কারো অভিমত, কাপনা গাঙের উজান ধরে দালাইড় হাওরে যেতে হবে। কেউ আবার বুজিরকে জুগির ভেবে জৈন্তাপুরও ছাড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। মাঝবয়সী স্থানীয় একজন পরামর্শ দিলেন কাপনা গাঙ ধরে ভাটির দিকে যেতে। নৌকায় তিন-চার কিলোমিটার গেলেই দেখা দেবে বন। বাজারের ঘাটে খোঁঁজ করে কিছু নাও পাওয়া গেল বটে, তবে ওদিকে কেউ যেতে রাজি না। এখানে কোনো ট্যুরিস্ট লঞ্চ বা নৌকা নেই। আছে জেলেদের মাছ শিকারের নাও। তা-ও ওরা মাছ ধরতে যাবে। কিশোর বয়সী একজনকে বলেকয়ে রাজি করানো গেল। তার পরামর্শেই এক কিলোমিটার দূরে করিছ ব্রিজের দিকে ছুটলাম। ব্রিজ পার হয়ে বাইক রেখে কর্দমাক্ত পথ ধরে নদীর পারে গিয়ে থামি। ঘাট বলতে দুই পাশে নলখাগড়ার ঝোপের মাঝে সামান্য দাঁড়ানোর মতো জায়গা। কিছুক্ষণ পর একটা জেলে নৌকা ঘাটে এসে ভিড়ল। নায়ের পাটাতনে খলুইয়ের ভেতর খলবল করছে টেংরা, খলসে, বাইম, গাগট। দু-চারটে রানি মাছও দেখলাম। সুস্বাদু আর বর্ণিল মাছটিকে বউ মাছ নামেও ডাকা হয়। ছোটবেলায় অনেক দেখতাম। এখন কালেভদ্রে মেলে।

সেখান থেকে শরতের ভরা কাপনার গাঙের স্রোত বেয়ে ভাটির পানে চলতে থাকে নৌকা। নদীর পারের শেষ গ্রাম দত্তপাড়া। এক পাশে বেতঝোপের দঙ্গল। আরেক পাশে বড়সড় নলখাগড়ার বন। এমন নিশ্ছিদ্র নলখাগড়ার ঝোপ বুনো কোয়েলের আদর্শ আবাস। নদীর সঙ্গে মিলে যাওয়া খালগুলোর ঢালু পারে সতর্ক নজর রেখেছিলাম। যদি বুনো কোয়েলের দেখা মেলে!

বিস্তৃত নলখাগড়ার বনের ওপর দিয়ে দূর থেকে কালো বিন্দুর মতো কিছু আস্তে আস্তে বড় হতে থাকল। এটাই মনে হয় বুজির বন। কাপনা গাঙ থেকে ছোট্ট চিকন খাল ডান দিকে মোড় নিয়ে ঢুকে গেছে বনের দিকে। নৌকা জল অরণ্যের ভেতর ঢুকে পড়ল। মনে হচ্ছে নৌকা নয়, বনই পেছনে ছুটছে। স্থির পানির ওপর বনের গাছ, পাতা, মেঘ আর আকাশের ঘন নীলের ছায়া। যেন জলের আল্পনা। নৌকার ঢেউয়ের কম্পনে সেই আল্পনা তিরতির করে কাঁপছে।

একটু পর বনের ভেতর কাদায় নৌকা আটকে গেল। নাও আর ভেতরে যাবে না। খালের পারে পা ফেলতেই গোড়ালি অবধি কাদায় ডুবে গেল। বনের ভেতর সফেদ নরম মাটির ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে থাকি। ভেজা মাটির শীতলতা অনুভব করি। মাটির ওপর অচেনা রঙিন ঘাস। ওপরে বনের ডালপালা, পাতার শামিয়ানা। হিজল করচের গাছগুলো বেশ বয়সী। বনের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে কানে আসে পাখিদের কলকাকলি। একঝাঁক শালিক বসে ছিল মাথার ওপর করচের মগডালে। শব্দ পেয়ে ফুড়ুৎ করে অন্যদিকে উড়াল দিল। বন পেরিয়ে অন্য পাশে কিছুটা উঁচু আড়াআড়ি চলে যাওয়া বাঁধ। তার ওপর দাঁড়ালে বুজির বন যেন প্যানোরমিক ভিউতে চোখে ধরা দেয়। বনের এক পাশ ধবধবে সাদা করে রেখেছে ধবল বকের ঝাঁক। বাঁধের ঘাসের ওপর বসে আমরা গল্প জুড়ি। ততক্ষণে আলো নিভে যেতে শুরু করেছে। জৈন্তিয়া হাওর, কাপনা গাঙ আর বুজির বনের ওপর আলোরা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে। আমরা নায়ে ফিরে আসি।

কিভাবে যাবেন

সিলেটের কদমতলী থেকে বাস অথবা বন্দরবাজার থেকে লেগুনায় চড়ে হরিপুর বাজারে নামতে হবে। ভাড়া পড়বে ৫০ টাকার মধ্যেই। সেখান থেকে কাপনা গাঙের ঘাটে নৌকার খোঁজ করতে হবে। মাঝারি আকারের নাওয়ে সাত-আটজন যাওয়া যায়। ভাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা