kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

অষ্টম শ্রেণি : বিজ্ঞান

সরল কথায় মাইটোসিস

অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ে জীবের বৃদ্ধি ও বংশগতি অধ্যায়ে কোষ বিভাজনের মাইটোসিস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করেছেন ফয়সল আবদুল্লাহ

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সরল কথায় মাইটোসিস

মডেল : দিশা ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

শুরুর কথা

তুমি ছিলে এইটুকুন, এখন হয়ে গেলে ইয়া বড়। ছোট ছোট হাত-পাগুলো বড় আর শক্তিশালী হচ্ছে প্রতিনিয়ত। লম্বাও হচ্ছো দিনকে দিন। কিভাবে ঘটছে এটা? ত্বকের কথাই ধরো, ওটা কি রাবারের মতো, নাকি যে টানতে টানতে কেউ লম্বা বানিয়ে দিচ্ছে? মোটেই না! ত্বকের মতো বাকি সব দিনে দিনে বড় হচ্ছে একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। তোমার মতো আরো অনেক প্রাণীও কিন্তু একইভাবে বড় হচ্ছে। জন্মের পর থেকে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এই যে বেড়ে ওঠা, এ প্রক্রিয়ার নামই মাইটোসিস। উন্নত প্রাণী (অ্যামিবা বা ব্যাকটেরিয়া নয়) ও উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার পেছনে এই মাইটোসিসই ভূমিকা রাখে।

একটা কোষ থেকে দুটো হয়, দুটো থেকে চারটা। এভাবে ভাগ হতে হতে বাড়তে থাকে সব; যাকে বলে কোষ বিভাজন। একটা কোষ ভাগ হয়ে হুবহু দুটো হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা ভাগ হওয়ার পর যে দুটো কোষ হয়, বিজ্ঞানীরা সেগুলোকে বলেন ‘সন্তান কোষ’। তোমার পাঠ্য বইতে যাকে ‘অপত্য কোষ’ বলা হয়েছে।

এখন কথা হলো, মাইটোসিস যদি হতেই থাকে তবে কী ঘটবে? ২টা থেকে ৪টা, ৪টা থেকে ৮টা—এভাবে চলতে থাকলে তো অল্প কদিনেই তোমার সাইজ হয়ে যাওয়ার কথা পাহাড়ের মতো; কিন্তু সেটা হচ্ছে না। আবার ধরো, এ প্রক্রিয়া যদি আমাদের মগজের কোষে চলতেই থাকত? তা হলে আমাদের মগজ হয়ে যেত বিশাল বড় আর আমরা হয়ে যেতাম এখনকার চেয়েও আরো বুদ্ধিমান; কিন্তু সেটাও হচ্ছে না। সুতরাং প্রাণীর সব কোষেই যে মাইটোসিস হবে এমন কথা নেই। এটারও কিছু সীমারেখা আছে। যেমন—আমাদের স্নায়ুকোষ, পরিণত লোহিত রক্তকণিকা, অনুচক্রিকা, উদ্ভিদের স্থায়ী টিস্যু—এসব কোষে মাইটোসিস হয় না।

একটা কোষ ধীরে ধীরে দুটো হওয়ার যে প্রক্রিয়া, ওটাকে রীতিমতো একটা বুদ্ধিমান যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যে যন্ত্র নিজেই জানে কী করে সহজে নিজেকে সমান দুই ভাগে ভাগ করে নিতে হবে। প্রক্রিয়াটা ঘটে ধাপে ধাপে। একটি ধাপ সম্পন্ন হলেই পরের ধাপ শুরু। পুরো প্রক্রিয়াটাকে প্রাথমিকভাবে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়—ক্যারিওকাইনেসিস ও সাইটোকাইনেসিস। ভাগাভাগির খুঁটিনাটি কাজগুলো হয় ক্যারিওকাইনেসিস ধাপেই। এ ধাপের প্রথম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার নাম প্রফেজ। এরপর প্রো-মেটাফেজ, মেটাফেজ, অ্যানাফেজ ও টেলোফেজ।

 

কোষের ভেতর

ধাপগুলো বোঝার আগে কোষের ভেতর একটু তাকানো যাক। কোষ হলো প্রাণীর শরীরের একক। মানে কোটি কোটি কোষ মিলে হয় প্রাণী। আর এই কোষের ঠিক মাঝে থাকে নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসেই থাকে কোষের যাবতীয় ফর্মুলা। এর চারপাশে থাকে একটা বেষ্টনী, যাকে বলে কোষের পর্দা। নিউক্লিয়াসের ভেতর থাকে জীবের মূল সূত্র। মানে প্রাণীটা মানুষ হবে, নাকি গরু হবে, নাকি বানর হবে—সেটা ঠিক করে দেয় ওটা। ওর ভেতর ফর্মুলাটা লেখা থাকে অতি সূক্ষ্ম দড়ির মতো (যাকে বলে তন্তু) একটা বস্তুতে। ওটার নাম ক্রমোজম। ক্রমোজমকে কল্পনা করতে পারো সূক্ষ্ম চুলের মতো, যার মধ্যে থাকে ডিএনএ। এই ডিএনএ হলো প্রাণীর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য নির্ধারণকারী বস্তু। এ বিষয়ে পরে আরো বিস্তারিত জানতে পারবে। আপাতত জেনে রাখো, পরিণত কোষের কেন্দ্রে ক্রমোজমটি থাকে জোড়ায় জোড়ায়। বেণির মতো করে দুটি ক্রমোজম একে অন্যকে ধরে রাখে। এদের প্রত্যেককে আলাদা করে বলে ক্রোমাটিড। বিজ্ঞানীরা বলেন, ক্রোমাটিডরা একে অন্যের বোনের মতো। এই দুই বোন হাত ধরাধরি করে ইংরেজি ‘এক্স’ অক্ষরের মতো থাকে। ওই ‘হাত’টাকে বলে সেন্ট্রোমিয়ার। কোষ ভাগের সময় এই সেন্ট্রোমিয়ারটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করে।

প্রাণীর কোষের নিউক্লিয়াসের বাইরে আরেকটা বস্তু থাকে। ওটাকে বলে সেন্ট্রোসোম। মাইটোসিস প্রক্রিয়ার একটা বড় চাবি হলো এই সেন্ট্রোসোম। পরিণত কোষে সেন্ট্রোসোম থাকে দুটি। তবে উদ্ভিদ কোষে এটা থাকে না। এই সেন্ট্রোসোম কী কাজে আসে, তা জানবে একটু পরই।

 

প্রো-মেটাফেজ ও মেটাফেজ

এতক্ষণ কোষের যে বর্ণনাটা শুনলে ওটা হলো প্রফেজ ধাপ। মানে এ ধাপে একটি কোষ ভাগ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এরপর প্রো-মেটাফেজ ও মেটাফেজ ধাপ। প্রো-মেটাফেজ ধাপে কোষের ভেতরের নিউক্লিয়াসের চারপাশে যে আবরণ থাকে ওটা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ক্রমোজমগুলোও ছাড়া ছাড়া হয়ে আসে। মানে জট পাকানো সুতার জট খুলে জোড়ায় জোড়ায় আলাদা হয়ে আসে ক্রোমাটিড বোনেরা।

কোষের ওপরের অংশ আর নিচের অংশকে আমরা দুটি মেরু হিসেবে ধরতে পারি। প্রো-মেটাফেজ ধাপে এই দুই মেরুতে চলে যায় দুটি সেন্ট্রোসোম। আর কোষের মাঝ বরাবর এসে সারি বেঁধে দাঁড়ায় ক্রমোজমের দল। এরপর মেটাফেজ ধাপের শুরু। এর মাঝেই একটা মজার কাণ্ড ঘটে। সেন্ট্রোসোম দুটি স্পাইডারম্যানের মতো আঠাল সুতা ছুড়ে দিতে থাকে ক্রমোজমের দিকে। সুতার মতো তন্তুগুলো গিয়ে বেঁধে যায় সেন্ট্রোমিয়ারে (ক্রমোজমের হাতের বাঁধন)। দুটি সেন্ট্রোসোমই একসঙ্গে স্পাইডারম্যানের মতো ধরতে থাকে ক্রমোজমগুলোকে। দেখে মনে হবে যেন ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। এ অবস্থায় কোষের ভেতরটাকে দেখতে ঢোলের মতো লাগে। তাই এর নাম রাখা হয়েছে স্পিন্ডল। বইতে যাকে বলা হয়েছে স্পিন্ডল যন্ত্র।

 

ক্রমোজমের ভাগ-বাটোয়ারা

মেটাফেজ ধাপের ঠিক পর পর আরেকটা মজার কাণ্ড ঘটে। কাণ্ডটার নাম স্পিন্ডল চেকপয়েন্ট। সেন্ট্রোসোমগুলো নিজেরাই চেক করে দুজনের ভাগে সমান সমান ক্রমোজম পড়েছে কি না। উনিশ-বিশ হলে হবে না। যতক্ষণ না দুই সেন্ট্রোসোমে সমান সংখ্যক ক্রমোজম ধরা না পড়ছে, ততক্ষণ চলবে সুতা ছোড়াছুড়ি।

 

অ্যানাফেজ

স্পিন্ডলের সুতায় টান পড়তেই সেন্ট্রোমিয়ার বরাবর দুই ভাগ হয়ে যায় ক্রমোজমগুলো। এ পর্যায়ের নাম অ্যানাফেজ। এ ধাপে ক্রোমাটিডগুলো একে অন্যের হাত ছেড়ে দেয়। এরপর সুতার টানে অর্ধেক ক্রমোজম ওপরের দিকে, বাকি অর্ধেক নিচের দিকে আসতে থাকে। এই ফাঁকে একটা তথ্য জানিয়ে রাখি—ক্রমোজমগুলোকে এভাবে টেনে ওপরে আর নিচে যারা নামায়, তারা হলো মোটর প্রোটিন। বাস-ট্রাকের মতো কোষের ক্রমোজম টানাটানির কাজ করে বলেই এমন নাম।

 

টেলোফেজ

ক্রমোজম ভাগাভাগি করে দুই পাশে নেওয়ার পর সেন্ট্রোসোমের কাজ শেষ। বিলুপ্ত হয়ে যায় সুতাগুলোও। গায়েব হয়ে যায় স্পিন্ডল। বলতে গেলে টেলোফেজ ধাপে একটা কোষের দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার বেশির ভাগ প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়ে যায়। তবে এ ধাপে নতুন করে দুই ভাগে তৈরি হয় নিউক্লিয়ার আবরণ। সেটার ভেতর আবার আগের মতো নিউক্লিওলাস নামের আরেকটি বস্তুও তৈরি হয়ে যায়। ক্রমোজমগুলোও আবার ছড়িয়ে গিয়ে সুতার মতো পেঁচানো শুরু করে। বুঝতেই পারছ, একটা কোষের ভেতর আসলে দুটি কোষ তৈরির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেল এ ধাপে। আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় ক্যারিওকাইনেসিস নামের প্রথম বড় ধাপটি।

 

সাইটোকাইনেসিস

এ ধাপে কঠিন কোনো কাজ নেই। প্রথম যে কোষ (মাতৃকোষ) ওটা দুই ভাগ হলেই কাজ সারা। উদ্ভিদের বেলায় কোষটা দুই ভাগ হয় দুটি চার কোনা প্লেটের মতো করে। প্রাণীকোষের বেলায় ভাগটা হয় কোষের বাইরের আবরণের ঠিক মাঝ বরাবর একটা খাঁজের মতো তৈরি হয়ে। আর এভাবেই সম্পন্ন হয় মাইটোসিস প্রক্রিয়া।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা