বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতগুলো সামরিক কৌশলের চিরচেনা রূপ বদলে দিয়েছে। আধুনিক যুদ্ধে রণক্ষেত্রের আধিপত্য এখন আর কেবল দামি যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক বা ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং ড্রোন এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে ভারত এখন দেশীয় ড্রোন উৎপাদন, ড্রোন-প্রতিরোধী (অ্যান্টি-ড্রোন) প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় ব্যাপক গতি এনেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা গেছে, সামান্য খরচে তৈরি ‘ফার্স্ট পারসন ভিউ’ ড্রোনগুলো লাখ লাখ ডলার মূল্যের ভারী সাঁজোয়া যান ধ্বংস করে দিচ্ছে। একইভাবে, ইরানের তৈরি ‘শাহেদ’ অ্যাটাক ড্রোনের ঝাঁক অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ককে অনায়াসেই ফাঁকি দিচ্ছে। বিশ্বরাজনীতির এই নতুন সমীকরণ এবং পূর্ব লাদাখে চীনের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা, জম্মু বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা ও অতি সম্প্রতিক ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পরবর্তী ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মতো নিজস্ব নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো নয়াদিল্লিকে আত্মনির্ভরশীল ড্রোন প্রযুক্তির দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।
প্রতিরক্ষা খাতকে শক্তিশালী করতে ভারত এখন দুই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সর্ববৃহৎ সামরিক ড্রোন কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের এই বিশাল উদ্যোগের ফলে আদানি গ্রুপ, টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, আইডিয়াফোর্জ ও অ্যাস্টেরিয়া অ্যারোস্পেসের মতো ভারতের নিজস্ব ড্রোন নির্মাতারা বড় ধরনের সুবিধা পাবে।
এই নতুন ড্রোন বহরটি ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সীমান্ত নজরদারি, নিখুঁত হামলা ও রসদ সরবরাহে দারুণভাবে সহায়তা করবে। এটি আমেরিকার তৈরি বিখ্যাত ‘এমকিউ-নাইন বি প্রিডেটর’ ড্রোনের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া সরকারের ‘ড্রোন শক্তি মিশন’ প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব একটি শক্তিশালী ড্রোন ইকোসিস্টেম তৈরি করছে।
ড্রোনের শক্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি শত্রুপক্ষের ড্রোন থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করাও এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই লক্ষ্যে ভারতের সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে যৌথভাবে কাজ করছে ‘পেলোরাস টেকনোলজিস’ -এর মতো শীর্ষস্থানীয় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই সংস্থাটি এমন কিছু অত্যাধুনিক সিস্টেম তৈরি করছে, যা শত্রুপক্ষের ড্রোনকে অনেক দূর থেকেই শনাক্ত, ট্র্যাক এবং নিষ্ক্রিয় (জ্যাম) করে দিতে সক্ষম। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি ‘পুলিশ এক্সপো’-তে পেলোরাস টেকনোলজিস তাদের এই ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে, যা দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকৌশলের এই দ্রুত পরিবর্তন মূলত একটি নতুন যুগের সংকেত দিচ্ছে। দেশীয় ড্রোন ও সাইবার নিরাপত্তায় ভারতের এই বিশাল বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে, আগামী দিনের সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ট্যাঙ্কের গোলার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন।




